*
মিশর ও ইরানে মুসলিমরা আধুনিকায়নকারী পাশ্চাত্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন মিশর আক্রমণ করার সময় পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের ভেতর সম্পর্কের এক নতুন পর্যায়ের সূচনা করেছিলেন। স্যুয়েযে একটা ঘাঁটি করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য, যেখান থেকে তিনি ভারতমুখী ব্রিটেনের সাগর পথে হয়রানি সৃষ্টি করতে পারবেন ও সম্ভবত সিরিয়া থেকে অটোমান সাম্রাজ্যে হামলা চালাতে পারবেন। অর্থাৎ, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ভেতর বিশ্বে প্রাধ্যান্য বিস্তারের লড়াইতে মিশর ও প্যালেস্তাইন পরিণত হয়েছিল যুদ্ধের রঙ্গমঞ্চ। ইউরোপিয় ক্ষমতার খেলা ছিল এটা, কিন্তু নিজেকে মিশরিয় জনগণের সামনে প্রগতি ও আলোকনের বাহক হিসাবে তুলে ধরেছিলেন নেপোলিয়ন। ২১শে জুলাই, ১৭৯৮ ব্যাটল অভ পিরামিডে মামলুক অশ্বারোহী বাহিনীকে পরাস্ত করার পর আরবী ভাষায় এক ঘোষণা প্রকাশ করেছিলেন তিনি যেখানে বিদেশী শাসকদের কবল থেকে মিশরকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শত শত বছর ধরে সারকাসিয়া ও জর্জিয়া থেকে আগত মামলুকরা মিশরের জনগণকে শোষণ করে গেছে, এখন সেই স্বেচ্ছাচারের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তিনি কলিকালের ক্রুসেডার নন, উলেমাদের নিশ্চিত করেছেন, এদের স্থানীয় মিশরিয়দের প্রতিনিধি ভেবেছিলেন তিনি। কেউ যদি ভেবে থাকে তিনি তাদের ধর্মকে ধ্বংস করতে এসেছেন, সে নিশ্চিত থাকতে পারে
যে আমিআপনাদেরঅধিকার পুনরুদ্ধার করতে এসেছি, ক্ষমতাদখলকারীরা যার উপর আগ্রাসন চালিয়েছিল-আমি মামলুকদের চেয়ে ঈশ্বরকে বেশি মানি, পয়গম্বর মুহাম্মদ ও মহান কোরানকে শ্রদ্ধা করি। ওদের বলে দিন, ঈশ্বরের চোখে সকল মানুষ সমান-বুদ্ধিমত্তা, গুণ ও বিজ্ঞানই তাদের ভেতর একমাত্র তফাৎ। ৩০
কিন্তু এই মুক্তি ও বিজ্ঞান এসেছিল আধুনিক সেনাবাহিনীর হাত ধরে। মিশরিয়রা কেবল মামলুকদের উপর এই অসাধারণ যুদ্ধ মেশিনকে বিধ্বংসী পরাজয় চাপিয়ে দিতে দেখেছিল; মাত্র দশজন ফরাসি সৈনিক প্রাণ হারিয়েছিল, আহত হয়েছে তিরিশজন, অন্যদিকে মামলুকরা হারিয়েছিল দুই হাজারেরও বেশি মানুষ ও চারশো উট ও পঞ্চাশটি অস্ত্র। এই মুক্তির স্পষ্টতই একটা আগ্রাসী দিক ছিল, যেমন ছিল আধুনিক ইন্সতিতুত দ’ঈজিপ্তের, অঞ্চলের ইতিহাসের যাদের অনুপুঙ্খ গবেষণা নেপোলিয়নকে আরবীতে ঘোষণা দিতে সক্ষম ও ইসলামের আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে পরিচিত করে তুলেছিল। পণ্ডিতি ও বিজ্ঞান মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপিয় স্বার্থ উদ্ধার ও এখানকার জনগণকে ফ্রান্সের শাসনাধীনে আনার একটা উপায়ে পরিণত হয়েছিল।
উলেমাগণ মুগ্ধ হননি। ‘এসব প্রতারণা ও চালিয়াতি ছাড়া আর কিছুই না, ‘ বলেছেন তাঁরা, ‘আমাদের প্রলুব্ধ করার জন্যে। বোনাপার্তে একজন ক্রিশ্চানের সন্তান ক্রিশ্চান ছাড়া আর কিছুই নন।৩২ বিধর্মী শাসনের সম্ভাবনায় বিব্রত বোধ করেছেন তাঁরা। কোরানের শিক্ষা ছিল যতদিন পর্যন্ত নারী-পুরুষ তাদের সমাজকে আল্লাহ’র ইচ্ছানুযায়ী গড়ে তুলবে ততদিন পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হবে না। অথচ এখন ইসলামি বাহিনী বিদেশী শক্তির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয়েছে। আযহার মাদ্রাসার এক শেখ আল-জাবার্তি এই আগ্রাসনকে
প্রধান যুদ্ধ; ভীতিকর ঘটনাপ্রবাহ; দুর্যোগময় ব্যাপার; অশুভের বিস্তার… সময়ের বিঘ্ন; প্রাকৃতিক নিয়মের লঙ্ঘন; মানব রচিত আইন কানুনের উল্টোযাত্রা[৩৩]
হিসাবে বিবেচনা করেছেন। তিনি আধুনিকতার আবির্ভাবের সাথে প্রায়শঃই সম্পর্কিত সেই দুনিয়া উল্টে যাবার অনুভূতি বোধ করছিলেন। অতিরঞ্জিত বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও জাবার্তির ভীতি সম্পূর্ণ অমূলক ছিল না। নেপোলিয়নের আগ্রাসন ছিল মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সূচনা, যেটা আসলেই ছিল পরিস্থিতির সম্পূর্ণ পরিবর্তন, লোকজনকে তাদের সবচেয়ে মৌলিক বিশ্বাস ও প্রত্যাশাসমূহকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করেছে।
নেপোলিয়ন উলেমাদের আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে ঢের বেশি ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তুর্কি ও মামলুকদের বিরুদ্ধে তাদের মিত্র বানাতে চেয়েছেন তিনি, কিন্তু উলেমাগণ তাঁর পছন্দ মতো সাড়া দিতে পারেননি। মিশরিয়রা এত দীর্ঘ সময় তুর্কি ও মামলুকদের অধীনে ছিল যে প্রত্যক্ষ শাসন ছিল সম্পূর্ণ অচেনা একটা ধারণা। কেউ কেউ তাঁর প্রস্তাবিত পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, পরামর্শকের অভ্যস্ত ভূমিকাই বেছে নিয়েছেন। তাঁরা প্রতিরক্ষা বা আইন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, সবচেয়ে ভালো যা জানতেন তাই আঁকড়ে থাকতে চেয়েছেন: ধর্মীয়, আইনি ও ইসলামি ব্যাপারস্যাপার পরিচালনা। অবশ্য অধিকাংশ উলেমাই সহযোগিতা করেছেন; ভিন্ন কোনও উপায় আছে বলে ভাবেননি, শূন্যস্থানে এগিয়ে এসে সরকার ও জনগণের মাঝে মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা পালন করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছেন-যেমনটা সব সময়ই করে এসেছিলেন।৩৪ অল্প কয়েকজন ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে ১৭৯৮ সালের অক্টোবরে ও ১৮০০ সালের মার্চে ব্যর্থ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তবে সেগুলোকে দ্রুত দমন করা হয়েছে।
ফরাসিদের নিয়ে হতবিহ্বল ছিলেন তাঁরা। নেপোলিয়নের মুক্তি ও স্বায়ত্তশাসনের আলোকন আদর্শ বুঝে উঠতে পারেননি। মিশরিয় ও ইউরোপিয়দের মাঝে সাগরসম দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। জাবার্তি ইন্সতিতুত দ’ঈজিপ্তে সফর করার সময় ফ্রান্সের পণ্ডিতি ও উদ্দীপনার তারিফ করেছেন, কিন্তু তাদের পরীক্ষানিরীক্ষার কোনও মানে খুঁজে পাননি। বিশেষ করে হটওয়াটার বেলুন দেখে বিস্মিত হয়ে গেছেন। তাঁর মানসিক জগতে এজাতীয় জিনিসের স্থান ছিল না, একে তিনি ইউারোপিয়দের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারেননি—যাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ বিজ্ঞানের দুই শো বছরের ইতিহাস ছিল। ‘অদ্ভুত সব জিনিসপত্র ছিল ওদের কাছে,’ পরে লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি, ‘সেগুলো এমন কাণ্ডকারখানা দেখিয়েছে যা বোঝার মতো বিদ্যাবুদ্ধি আমাদের নেই।’৩৫
