ইয়েশিভা বিংশ শতাব্দীতে বিকাশ লাভ করা আল্ট্রা-অর্থডক্স মৌলবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এই উদীয়মান ও যুদ্ধংদেহী ধরনের ধার্মিকতার প্রথম প্রকাশ ছিল এটা। আমরা এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারি। মৌলবাদ-ইহুদি, ক্রিশ্চান বা মুসলিম, যাই হোক—বিরল ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে আবির্ভূত হয়ে থাকে (ফোলোঝিনের ক্ষেত্রে এই বাহ্যিক শত্রু হতে পারত জেন্টাইল ইউরোপিয় সংস্কৃতি); কিন্তু তার বদলে সাধারণত এর শুরু হয় অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম হিসাবে যেখানে ঐতিহ্যবাদীরা তাদের বিশ্বাস মোতাবেক সেক্যুলার বিশ্বের কাছে অনেক বেশি আপোসকারী বলে বিশ্বাস করা স্বধর্মীদের সাথে যুদ্ধ করে। মৌলবাদীরা প্রায়শঃই সহজাত প্রবৃত্তির বশে ইয়েশিভার মতো খাঁটি ধর্মবিশ্বাসের ছিটমহল তৈরি করার মাধ্যমে অগ্রসরমান আধুনিকতার প্রতি সাড়া দেবে। এখানে ঈশ্বর বিহীন বিশ্ব থেকে বাহ্যিক পরিবর্তন অগ্রাহ্য করে অস্তিত্বকে নতুন রূপ দেওয়ার জন্যে আত্ম-সন্তুষ্ট সম্প্রদায়ে প্রত্যাহারের ব্যাপার ঘটে। সেকারণে আবিশ্যিকভাবেই এটি একটি আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ। অবশ্য এই পিছু হটার ভেতরেই আগামীর পাল্টা আক্রমণের শক্তি লুকিয়ে থাকে। এই ধরনের ইয়েশিভার ছাত্ররা তাদের সমাজে একই ধরনের প্রশিক্ষণ ও আদর্শবাদী ক্যাডারে পরিণত হতে পারে। এই ধরনের ছিটমহল আধুনিক সমাজের বিকল্প হিসাবে একটি প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ইয়েশিভার প্রধান (রোশ ইয়েশিভা) ছাত্রদের উপর বিপুল আধিপত্য বিস্তারকারী একজন হাসিদিক যাদ্দিকের মতোই হয়ে পড়েন। তিনি ঐতিহ্যের বিভিন্ন নির্দেশনার প্রতি পরম আনুগত্য দাবি করেন, এটা তাদের মৌলিক চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতার ক্ষমতার উপর সীমা আরোপ করে। এভাবে ইয়েশিভা এমন এক ধরনের রীতি তৈরি করে যা প্রত্যক্ষভাবে আধুনিক চেতনা এবং স্বায়ত্তশাসন ও উদ্ভাবনের উপর এর প্রদত্ত গুরুত্বের পরিপন্থী।
অবশ্য ইউরোপের সেক্যুলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের ঐতিহ্যে তরুণদের সিক্ত করে তাদের আত্মাকে পাহারা দেওয়াই ছিল ফোলোঝিন ও এর সহযোগী ইয়েশিভোতের মূল নীতি। কিন্তু এখানেই রয়েছে বৈপরীত্বের অস্তিত্ব যা মৌলবাদের ইতিহাসে অবিরাম পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। রক্ষণশীল চেতনার প্রতি সংশ্লিষ্টতা সত্ত্বেও ফোলোঝিন ও অন্যান্য নতুন ইয়েশিভোত আবিশ্যিকভাবে আধুনিক ও আধুনিকায়নের প্রতিষ্ঠান ছিল। তোরাহ ও তালমুদ পাঠকে কেন্দ্রীভূত করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল তারা। তাদের সৃষ্টি মনোনয়নের সম্ভাবনাও বোঝায়। ঘেটোতে জীবন যাত্রার প্রচলিত ধারা বদলে গিয়েছিল; এর মূল্যবোধ ও রীতিনীতিকে নির্দিষ্ট ও প্রশ্নাতীত হিসাবে অনুভব করা হয়েছে। অন্য কোনও জীবনধারাই ইহুদিদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন একজন ইহুদিকে ফেলোঝিনের মতো প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেকে ঐতিহ্যের সাথে বেঁধে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। ধর্মকে ব্যক্তি পর্যায়ের বিষয়ে পর্যবসিতকারী এক বিশ্বে খোদ ফোলোঝিনই ছিল এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান।২৮ এমনকি মৌলবাদীরা যখন আধুনিকতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, একটা পর্যায় পর্যন্ত তাদের বিশ্বাস আধুনিক ও উদ্ভাবনী হয়ে থাকে।
অন্য ইহুদিরা মধ্যপন্থা বেছে নিতে চেয়েছে। ১৮৫১ সালে বর্তমানে সংস্কারবাদীদের প্রাধান্যবিশিষ্ট ফ্রাংকফুর্ত সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাদী সদস্যরা নিজস্ব ধর্মীয় সমিতি গড়ার জন্যে মিউনিসিপ্যালিটির কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে। স্যামুয়েল রাফায়েল হার্শকে (১৮০৮–৮৮) র্যাবাই হতে আমন্ত্রণ জানায় তারা। অবিলম্বে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন হার্শ, যেখানে রথসচাইল্ড পরিবারের আর্থিক সহায়তায় ইহুদি ও সেক্যুলার দুরকম বিষয়ই পড়ানো হত। হার্শ যেমন উল্লেখ করেছেন, কেবল ঘেটোতেই ইহুদিরা দর্শন, ওষুধবিজ্ঞান ও গণিত পাঠে অবহেলা করেছিল। অতীতে বিশেষ করে ইসলামি বিশ্বে ইহুদি চিন্তাবিদরা অনেক সময় মূলধারার সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঘেটোতে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় বাধ্য হয়েই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পাঠে অবহেলা করেছিল তারা। হার্শ নিশ্চিত ছিলেন, ইহুদিবাদের অন্যান্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ইহুদিদের যত সম্ভব আধুনিক বিকাশকে আলিঙ্গন করা উচিত, তবে সেটা সংস্কারকদের মতো প্রতিমাবিদ্বেষী না হয়ে। ২৯
তরুণ বয়সে হার্শ নাইন্টিন লেটারস অভ বেন উলে প্রকাশ করেছিলেন (১৮৩৬), যেখানে অর্থডক্স পরিপালনের জন্যে মনকে আন্দোলিতকারী আবেদন জানানো হয়, কিন্তু সংস্কার ও ক্রিশ্চান ধর্মে ব্যাপকহারে ধর্মান্তরের জন্যে আধুনিকতাকে বর্জনকারী কট্টর ঐতিহ্যবাদীদের দায়ী করেন তিনি। তিনি তাদের মৌলবাদী আক্ষরবাদও মেনে নেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন ইহুদিদের সযত্ন পাঠ ও গবেষণার ভেতর দিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনার গুপ্ত অন্তস্থঃ অর্থ সন্ধান করা উচিত। কোনও অর্থ প্রকাশ করে না এমন ধরনের আইনগুলো স্মারক হিসাবে কাজ দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, খত্নার বিধি মনকে দেহ পবিত্র রাখার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়; মাংস ও দুধ না মেশানোর উপর নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টিতে ঐশী শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনকে প্রতীকায়িত করে। সব আইনই পালন করতে হবে, কারণ সেগুলো চরিত্র গঠন করে ও ইহুদিকে পবিত্র করে তুলে মানবতার প্রতি নৈতিক ব্রত পালনে সক্ষম করে তোলে। হার্শের জীবন আবারও আধুনিক বিশ্বে ধর্মীয় অর্থডক্সির স্বেচ্ছাসেবী প্রকৃতি দেখায়। এককালে যেখানে ঐতিহ্যকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া হয়েছিল এখন সেখানে ইহুদিদের অর্থডক্স হওয়ার জন্যে লড়াই ও তর্ক করতে হচ্ছিল।
