সংস্কারক ও সায়েন্স অভ জুদাইজমের পণ্ডিতদের উভয় পক্ষই এমন এক বিশ্বে তাদের ধর্মের টিকে থাকার ব্যাপারে ভাবিত ছিলেন যাকে যতই উদারভাবে মনে হোক না কেন, একে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে। সতীর্থ ইহুদিদের দীক্ষা গ্রহণের ঝর্নার দিকে হুড়মুড় করে ছুটে যেতে দেখার সময় ইহুদিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন তাঁরা এবং এর টিকে থাকা নিশ্চিত করার উপায় খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। আমরা দেখব, আধুনিক বিশ্বের বহু ধার্মিক জন এই উদ্বেগের অংশীদার। তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মেই প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস মারাত্মক বিপদাপন্ন বলে বার বার আশঙ্কার সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। নিশ্চিহ্নতার ভীতি মানুষের অন্যতম মৌলিক আতঙ্ক। আধুনিক বিশ্বে আবির্ভূত বহু ধর্মীয় আন্দোলনই নিশ্চিহ্নতার এই আতঙ্ক থেকে আবির্ভূত হয়েছে। সেক্যুলার চেতনা ধীরে ধীরে শেকড় গড়ে বসার সাথে সাথে চলমান যুক্তিবাদ ধর্মবিশ্বাসের প্রতি ক্রমশঃ বৈরী হয়ে ওঠায় ধার্মিক লোকজন ক্রমবর্ধমানহারে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে সরে গেছে ও তাদের আধ্যাত্মিকতা আরও বেশি করে যুদ্ধ করার জন্যে তৈরি হয়েছে।
উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ঐতিহ্যবাহী ইহুদিরা-সংস্কারকরা যাদের আলতগ্লোবিজেন, ‘প্রাচীন বিশ্বাসী’ বলতেন-নিশ্চিতভাবে নিজেদের দলছুট ভাবতে শুরু করেছিল। এমনকি মুক্তির পরেও তারা এমনভাবে বাস করত যেন ঘেটোর দেয়ালগুলো এখনও জায়গামতোই রয়েছে। সম্পূর্ণভাবে তোরাহ ও তালমুদে পাঠে নিজেদের নিয়োজিত করেছিল তারা আর আধুনিকতাকে বর্জন করার প্রতি জোর দিচ্ছেল। জেন্টাইল পাঠকে তারা ইহুদিবাদের সাথে বেমানান বলে বিশ্বাস করত। তাদের অন্যতম নেতৃস্থানীয় মুখপাত্র ছিলেন র্যাবাই মোজেস সোফার প্রেসবার্গ (১৭৬৩-১৮৩৯)। আধুনিকতাকে স্থান করে দিতে যেকোনও পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন তিনি-হাজার হোক ঈশ্বর পরিবর্তিত হননি; নিজের সন্তানদের উপর মেন্দেলসনের বইপত্র পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন তিনি, তাদের সেক্যুলার শিক্ষা দিতে অস্বীকার গেছেন বা কোনওভাবে আধুনিক সমাজে অংশগ্রহণ করতে দেননি।২৬ সব মিলিয়ে তাঁর সহজাত প্রতিক্রিয়া ছিল পিছু হটা। কিন্তু অন্য ঐতিহ্যবাদীরা সেক্যুলারাইজিং ও যৌক্তিকীকরণের প্রভাবে বিপদের বিরুদ্ধে আরও সৃজনশীল অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
১৮০৩ সালে গাওন অভ ভিলনার একজন শিষ্য র্যাবাই হাঈম ফোলোঝিনার এক চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেন যা ঐতিহ্যবাহী ইহুদি আধ্যাত্মিকতাকে বদলে দেবে। লিথুয়ানিয়ার ফেলোঝিনে এতয হাঈম ইয়েশিভা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শতাব্দীর পরিক্রমায় পূর্ব ইউরোপের অপরাপর অংশেও অন্যান্য নতুন ইয়েশিভোত প্ৰতিষ্ঠিত হয়: মির, তেলয, স্লোবোদকা, লোমযা ও নোভোগ্রুদোক। অতীতে ইয়েশিভা (হিব্রু “বসা”-র প্রতিশব্দ থেকে গৃহীত একটি শব্দ) ছিল সিনাগগের পেছনের কতগুলো কামরার সারিমাত্র, যেখানে ছাত্ররা বসে তোরাহ ও তালমুদ পাঠ করত। সাধারণত স্থানীয় সম্প্রদায়ই এর দেখাশোনা করত। তবে ফোলোঝিন ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে শত শত মেধাবী ছাত্র বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞদের কাছে পড়ার জন্যে এসে এখানে ভীড় জমাত। পাঠ্যক্রম ছিল কঠিন, ক্লাসগুলো ছিল প্রলম্বিত, ইয়েশিভায় ভর্তি হওয়ার ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। র্যাবাই হাঈম গাওনের কাছে শেখা পদ্ধতিতে তোরাহ পাঠ শেখাতেন, টেক্সট বিশ্লেষণ করে যৌক্তিক সামঞ্জস্যতার উপর জোর দিতেন। কিন্তু একভাবে তা ঐশীসত্তার সাথে আধ্যাত্মিক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করত। এটা স্রেফ তালমুদ সম্পর্কে জানার কোনও ব্যাপার ছিল না; মুখস্থ বিদ্যার প্রক্রিয়া, প্রস্তুতি ও প্রাণবন্ত আলোচনা ক্লাসে পৌঁছানো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটা ছিল এক ধরনের প্রার্থনা, এমন এক আচার ছাত্রদের যা পবিত্রতার অনুভূতি যোগাত। এটা ছিল এক প্রবল অস্তিত্ব। তরুণদের আধা মঠজাতীয় গোষ্ঠীতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হত, সম্পূর্ণ ইয়েশিভায় তাদের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন আকার পেত। পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হত তাদের, কেবল ইহুদি পণ্ডিতির জগতে মগ্ন থাকত তারা। ছাত্রদের কাউকে কাউকে কিছু সময় আধুনিক দর্শন বা গণিত নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হলেও এধরনের সেক্যুলার বিষয়বস্তু ছিল গৌণ, তোরাহ থেকে সময় চুরি করা হচ্ছে মনে করা হত। ২৭
ইয়েশিভোতের লক্ষ্য ছিল হাসিদিমের হুমকীর মোকাবিলা করা; ইয়েশিভোত স্পষ্টভাবেই মিসনাগদিক প্রয়াস ছিল। তোরাহর প্রবল পাঠ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রণীত। কিন্তু শতাব্দীর গড়িয়ে যাবার সাথে সাথে ইহুদি আলোকনকে হুমকীর চেয়েও বেশি কিছু বলে ধারণা করা হচ্ছিল; ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর চৌহদ্দির ভেতর সেক্যুলার সংস্কৃতির অশুভকে নিয়ে আসা ট্রোজান হর্সের মতো বিবেচনা করা মাসকিলিমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হাসিদিম ও মিসনাগদিম একাট্টা হতে শুরু করেছিল। সুতরাং, আস্তে আস্তে নতুন ইয়েশিভোত অর্থডক্সির ঘাঁটিতে পরিণত হয়, যার প্রাথমিক কাজ ছিল এই ভীষণ বিপদকে দূরে ঠেলে দেওয়া। কেবল তোরাহ পাঠই ইহুদিবাদের বিনাশ ঠেকাতে সক্ষম।
