সংস্কার ইহুদিবাদ সম্পূর্ণই আধুনিক বিশ্বের সম্পত্তি ছিল; এটা ছিল যৌক্তিক, বাস্তবধর্মী ও জোরালভাবে ব্যক্তিয়ায়িত ধর্মবিশ্বাসের পক্ষপাতি। সংস্কারকগণ অতীতের সাথে রেডিক্যাল বিচ্ছেদ ঘটাতে ট্র্যাডিশনাল বিভিন্ন মতবাদ ও ভক্তিকে উৎখাত করতে ইচ্ছুক-প্রকৃতপক্ষে অধীর—ছিলেন। নির্বাসনকে অস্তিত্বগত বিপর্যয় হিসাবে দেখার বদলে সংস্কারকগণ ডায়াসপোরায় নিখুঁতভাবেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেছেন। ইহুদিবাদকে আধুনিকতার সকল গুণাবলী ধারণ করা ধর্ম হিসাবে তুলে ধরেছেন সবাই: এটা যৌক্তিক, উদার ও মানবিক, প্রাচীন স্বাতন্ত্র্যবাদ ঝেড়ে ফেলে সর্বজনীন ধর্মবিশ্বাসে পরিণত হতে প্রস্তুত।২৩ সংস্কারকদের অযৌক্তিক, অতীন্দ্রিয় বা রহস্যের কোনও অবকাশ ছিল না। প্রাচীন মূল্যবোধ ও বিশ্বাস ইহুদিদের আধুনিক জীবনে উৎপাদনশীল ভূমিকা রাখায় বাধা সৃষ্টি করে থাকলে সেগুলোকে অবশ্যই বাদ দিতে হবে। গোড়ার দিকে তাদের উদ্বেগ ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবভিত্তিক, কিন্তু ১৮৪০-র দশক নাগাদ সংস্কার পণ্ডিত ও র্যাবাইদের আকৃষ্ট করতে শুরু করে, এঁরা ইহুদি ইতিহাসের সমালোচনামূলক গবেষণার কাজ শুরু করেছিলন। লেপল্ড যুন্য (১৭৯৪-১৮৮৬), যাকারিয়াহ ফ্রাংকেল (১৮০১-৭৫), নাখমান ক্রোচমাল (১৭৮৫-১৮৪০) এবং আব্রাহাম গেইগার (১৮১০–৭৪) ইহুদিবাদের পবিত্র উৎসসমূহকে অনুসন্ধানের আধুনিক পদ্ধতির অধীনে নিয়ে আসেন। তাঁরা জুৎসইভাবে মানানসই কান্ট ও হেগেলের দর্শনে স্পষ্টই প্রভাবিত ‘দ্য সায়েন্স অভ জুদাইজম’ নামে একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ইহুদিবাদ অতীতে কোনও এক সময় তা প্রত্যাদিষ্ট হয়ে শেষ হয়ে যাওয়া কোনও ধর্ম নয়; বরং ধীরে ধীরে তা বিবর্তিত হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় ক্রমেই আগের চেয়ে বেশি যৌক্তিক ও আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে। এযাবৎ দিব্যদৃষ্টিতে প্রকাশিত ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এখন সমালোচনামূলক বুদ্ধি দিয়ে ধারণায়ন ও উপলব্ধি করা যেতে পারে।২৪ অন্য কথায়, মিথোসকে এবার লোগোসে পরিণত করা হয়েছিল।
পণ্ডিতগণ বিভিন্ন ইহুদি অবস্থানের ভেতর একটা ভারসাম্য আনার প্রয়াস পেয়েছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, ক্রোচমাল ঐতিহ্যবাদীদের সাথে একমত হয়েছিলেন যে, তোরাহ সিনাই পাহাড় চূড়ায় মোজেসের উপর একবারই অবতীর্ণ হয়েছিল, কিন্তু হালাখাহর-তোরাহর উপর ভিত্তি করে বিকশিত ও প্রসারিত ইহুদি বিধান—ঐশী উৎসকে অস্বীকার করে তিনি তাদের ক্রুদ্ধ করে তোলেন। ফ্রাংকেল যুক্তি দেখান যে, হালাকাহ সম্পূর্ণই মানব রচিত, যুক্তির ফসল, সুতরাং যুগের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে একে পরিবর্তন করা যেতে পারে। ক্রোচমাল যুক্তি দেখান, ইহুদি ইতিহাস দেখিয়েছে যে, ইহুদিবাদ সব সময়ই অন্য সংস্কৃতির কাছ থেকে ধারণা ধার করেছে; এভাবেই টিকে আছে এটা। সুতরাং ইহুদিদের আধুনিক বিশ্বকে নিয়ে পড়াশোনা করে নতুন মূল্যবোধের সাথে খাপ খাইয়ে না নেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। প্রকৃতপক্ষেই আধুনিক সমাজের সুযোগসুবিধা ও চ্যালেঞ্জ ভোগ করার জন্যে ইহুদিদের ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষা লাভ ঠেকানোর এছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। গেইগারের বিশ্বাস ছিল, মেন্দেলসন এক নতুন ইহুদি যুগের সূচনা করেছেন; সংস্কার ইহুদিবাদ ধর্মবিশ্বাসকে আলোকন দর্শনের এক স্বাস্থ্যকর সংযোগ দিয়ে মুক্তি দান করবে।
কিন্তু সায়েন্স অভ জুদাইজম অনেক সময় সংস্কারের সমালোচনামুখর ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, ক্রোচমাল ধার্মিক ইহুদি ছিলেন, সংস্কারকগণ যেসব প্রাচীন আচার আচরণ বাতিল করে দিচ্ছিলেন সেগুলোর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন তিনি। ফ্রাংকেল ও যুন্য, দুজনই বিশ্বাস করতেন ঐতিহ্যের এমনি পাইকারী বিসর্জন দারুণ বিপজ্জনক। ১৮৪৯ সালে যুন্য ইহুদি আচারগুলোকে মৌলিক বিশ্বাসের বাহ্যিক লক্ষণ অভিহিত করে একটি নিবন্ধ রচনা করেন। খাদ্যসংক্রান্ত বিধি ও ফিল্যাষ্ট্রিজ পরা শত শত বছরের পরিক্রমায় ইহুদি অভিজ্ঞতার অত্যাবশ্যক অংশে পরিণত হয়েছে, এইসব আচার বাদে ইহুদিবাদ বিমূর্ত কিছু মতবাদের একটি ব্যবস্থায় পর্যবসিত হবে। যুন্য কাল্টের জটিল গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, একমাত্র এটাই ধর্মের মিথ ও বিশ্বাসগুলোক বোধগম্য করে তোলে। ফ্রাংকেলও সঠিক আধ্যাত্মিক প্রবণতা সৃষ্টিতে লোকজনকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে আচারঅর্চণার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর ভয় ছিল, কেবল যুক্তি ঐতিহ্যবাহী ইহুদিবাদ তুঙ্গ অবস্থার মতো করে সবসময়ই আবেগকে সন্তুষ্ট করতে বা আনন্দ ও ফুর্তি বয়ে আনতে পারবে না। ইয়োম কিপ্পুরের প্রাচীন জটিল আচার সম্পূর্ণ বিনাশ করা বা যায়নে মেসিয়ানিক প্রত্যাবর্তনের সকল উল্লেখ মুছে ফেলা ভুল হবে, কারণ এইসব ইমেজ ইহুদি চেতনাকে গড়ে তুলেছে এবং ইহুদিদের এক ধরনের ভীতির বোধ গড়ে তুলতে ও অসহনীয় পরিস্থতিতে আশার আলো খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।২৫ কিছু পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সংস্কারকারীরা যেন প্রায়শঃই উপাসনায় আবেগের ভূমিকার ব্যাপারে নিরাসক্ত ছিলেন। যুন্য ও ফ্রাংকেল ধর্মের আবিশ্যিকভাবে পৌরাণিক উপকরণ সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন, তাঁরা সত্যির প্রবেশদ্বার হিসাবে কেবল যুক্তিকেই দেখার আধুনিক প্রবণতার সাথে পুরোপুরি একমত হননি। গেইগারের দিকে থেকে, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক যুক্তিবাদী, পাইকারী সংস্কারের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তারপরেও বছর পরিক্রমায় সংস্কার ইহুদিরা যুনযের প্রজ্ঞা ও ফ্রাংকেলের উদ্বেগকে স্বীকৃতি দিয়ে আবেগীয় অতীন্দ্রিয় উপাদান ছাড়া বিশ্বাস ও উপাসনা তাদের আত্মাকে হারিয়ে ফেলে উপলব্ধি করে কিছু কিছু ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতির পুনর্বাসন করেছিলেন।
