তবে পুরোনো কুসংস্কার রয়ে গিয়েছিল। কেবল ফ্রান্স ও হল্যান্ড বাদে ওয়াটারলুতে (১৮২৫) নেপোলিয়নের পরাজয় ও তাঁর সাম্রাজ্যে পতনের পর ইহুদিদের দেওয়া অধিকারগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ইহুদিদের ফের ঘেটোতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, পুরোনো বিধিনিষেধের প্রত্যাবর্তন ঘটে, শুরু হয় নতুন হত্যাকাণ্ড। কিন্তু আধুনিক সমাজের চাহিদা শেষপর্যন্ত একের পর এক সরকারকে ফাউস্টিয়ান বারগেইন গ্রহণে রাজি হওয়া সাপেক্ষে ইহুদিদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও জার্মানির মতো ইহুদিদের সমতা ও নাগরিকত্বদানকারী রাষ্ট্রগুলো সমৃদ্ধি অর্জন করে; কিন্তু গণতন্ত্রায়িত না করে আধুনিকতার সুবিধাসমূহকে অভিজাত শ্রেণীর মাঝে সীমিত রাখার চেষ্টা করেছে যারা, তারা পিছিয়ে পড়ে। ১৮৭০ সাল নাগাদ গোটা পশ্চিম ইউরোপে ইহুদিদের মুক্তি অর্জিত হয়; অবশ্য, পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়ায় যেখানে সরকারগুলো ইহুদি বিচ্ছিন্নতাকে ধ্বংস করতে অধিকতর নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, লক্ষ লক্ষ ইহুদি আধুনিক রাষ্ট্র থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে গোঁয়ারের মতো রাব্বিনিক ও হাসিদিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে।
কিন্তু নেপোলিয়নের অনুমোদিত মূল অধিকারসমূহ বাতিল করার পরের প্রথম বছরগুলোয় ইহুদিরা বিচ্ছিন্ন ও প্রতারিত বোধ করেছে। তারা ভালো সেক্যুলার শিক্ষা গ্রহণ করেছিল, আধুনিক সামজে অংশ নিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু এখন তাতে বাদ সাধা হয়েছে। মেন্দেলসন তাদের ঘেটো থেকে বের হয়ে আসার একটা উপায় বাৎলে দিয়েছিলেন। নেপোলিয়ন মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; এখন আর তারা ট্র্যাডিশনাল জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারছিল না। হতাশা থেকে বহু জার্মান ইহুদি মূলধারার সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতে ক্রিশ্চান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। অন্যরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, ইহুদিবাদকে বাঁচতে হলে ধর্মান্তরের এই স্রোত রুখতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জার্মানিতে দুটো সম্পর্কিত আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, দুটোরই শেকড় প্রোথিত ছিল ইহুদি আলোকনে। মাসকিলিমরা বিশ্বাস করত যে, তারা ঘেটো থেকে আধুনিক বিশ্বে উত্তোরণে সেতুবন্ধের কাজ করতে পারবে। তারা ভালো জার্মান বলতে পারত, জার্মান বন্ধু ছিল, প্রকাশ্যে তাদের সম্পূর্ণ ইউরোপিয় জীবনযাত্রার সাথে মানানসই বলে মনে হত। এবার তাদের কেউ কেউ আধুনিক বিশ্বের সাথে আরও সহজে খাপ খাওয়াতে খোদ ইহুদিবাদকেই সংস্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
এই সংস্কৃত ইহুদিবাদ সম্পূর্ণ বাস্তববাদী আন্দোলন হিসাবে সূচিত হয়েছিল; এই কারণে পুরোপুরিভাবে লোগোসের নীতিমালায় পরিচালিত হয়েছে। সত্যিই এটা ছিল ইহুদিবাদ থেকে মিথোসকে নিশ্চিহ্ন করার পদক্ষেপ। ইসরায়েল জ্যাকবসন (১৭৬৮-১৮২৮) বিশ্বাস করতেন, ইহুদিবাদকে জার্মান জনগণের কাছে কম ভিনদেশী মনে হলে তাতে করে মুক্তির সুযোগ বেড়ে উঠবে। সাধারণ ব্যক্তি ও দানবীর হিসাবে তিনি গাযা পাহাড়ের কাছে সীসেনে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, ছাত্ররা এখানে সেক্যুলার বিষয়ের পাশাপাশি ইহুদি বিষয়ও পড়ত। একটা সিনাগগও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি যেখানে উপাসনাকে ইহুদি ধরনের চেয়ে বরং ঢের বেশি প্রটেস্ট্যান্ট মনে হত। হিব্রুর বদলে মাতৃভাষায় উপাসনা মন্ত্র উচ্চারিত হত; জার্মান কোরাল সঙ্গীত, মিশ্র কয়ার ও জার্মান ভাষায় সারমন আগের তুলনায় সার্ভিসের অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথাগত আচারগুলোকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হয়েছিল। ১৮১৫ সালে জ্যাকবসন অন্য সাধারণ জনেরা মিলে এই আধুনিকায়িত উপাসনা পদ্ধতিকে বার্লিনে নিয়ে আসেন। এখানে তাঁরা নিয়মিত সিনাগগ থেকে ভিন্ন দেখানোর জন্যে তাঁদের ভাষায় ‘ব্যক্তিগত’ সিনাগগ খোলেন। ১৮১৭ সালে এডওয়ার্ড ক্লে হামবুর্গে একটি নতুন মন্দির স্থাপন করেন। এখানে সংস্কার ছিল আরও বিপ্লবাত্মক। যায়নে প্রত্যাবর্তন ও মেসায়াহর আগমনের আর্তি জানিয়ে প্রার্থনাকে বাদ দিয়ে সেখানে সকল মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধের জয়গান গেয়ে প্রার্থনা যোগ করা হয়েছিল: ইহুদিরা যেখানে জার্মানির নাগরিক হতে চাইছে সেখানে কেমন করে তারা প্যালেস্তাইনে এক মেসিয়ানিক রাষ্ট্রের জন্যে প্রার্থনা করতে পারে? ১৮২২ সালে প্রটেস্ট্যান্ট কায়দায় মেয়ে ও ছেলেদের জন্যে কনফার্মেশন সার্ভিস অনুষ্ঠিত হতে শুরু করে; সার্ভিসে পুরুষ ও নারীদের আলাদা বসার রেওয়াজও পরিত্যাগ করা হয়। হামবুর্গের র্যাবাইগণ এই সংস্কার আন্দোলনের নিন্দা জানান এবং এমনকি প্রুশিয় সরকারের কাছে আবেদন জানানোর মাধ্যমে বার্লিন মন্দির বন্ধ করতেও সমর্থ হন।২১ সুতরাং, পরের বছরগুলোতে এই সংস্কৃত ইহুদি আন্দোলনকে অনুকূল ভাবতে পারত এমন অনেক ইহুদি ক্রিশ্চান ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু হামবুর্গ মন্দির খোলাই থাকে ও লিপযিগ, ভিয়েনা ও ডেনমার্কে নতুন নতুন মন্দির খোলা হয়। আমেরিকায় নাট্যকার আইজাক হারবি চার্লসটনে এক সংস্কার মন্দির স্থাপন করেন। আমেরিকার ইহুদিদের কাছে সংস্কার দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৮৭০ সাল নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই শো সিনাগগের উল্লেখযোগ্য অংশ অন্তত কিছু পরিমাণ সংস্কার অনুশীলনী গ্রহণ করেছিল।২২
