আলোকনের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ইহুদি মাসকিলিমদের (‘আলোকিত জন’) কেউ কেউ অধিকতর সেক্যুলার দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিল। কেউ কেউ, আমরা যেমন দেখব, ইহুদি ইতিহাসের আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কাজ হাতে নেবে; অন্যরা অর্থডক্স ইহুদিদের প্রার্থনা ও নিবেদনের কাজের জন্যে তুলে রাখা দ্বিতীয় মাতৃভাষা হিব্রুতে পড়াশোনা ও লেখালেখি শুরু করেছিল। মাসকিলিমরা পবিত্র ভাষাকে সেক্যুলারে রূপান্তরিত করে এবার এক নতুন হিব্রু সাহিত্য গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। ইহুদি হওয়ার একটা আধুনিক কায়দা বের করার, তাদের চোখে অতীতের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আলোকিত সমাজের কাছে ইহুদিবাদকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়াস পাচ্ছিল তারা।
কিন্তু তাদের মূলধারার সংস্কৃতিতে অংশগ্রহণের ক্ষমতাকে বাহ্যিক আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের ভেতর দিয়ে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল: ইহুদিদের রাষ্ট্রীয় কোনও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, রাজনৈতিক জীবনে অংশ নিতে পারত না তারা এবং সরকারীভাবে তখনও ভিন্ন জাতি হিসাবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্ত মাসকিলিমদের আলোকনের উপর বিরাট আশা ছিল। তারা লক্ষ করেছিল যে, আমেরিকান বিপ্লবের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্যুলার রাজনীতিতে ইহুদিদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। আলোকনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শাসক নেপোলিয়ন বোনাপার্তে যখন ফ্রান্সে ক্ষমতায় এসে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে শুরু করেছিলেন, কিছু সময়ের জন্যে মনে হয়েছিল যে, শত শত বছরের নির্যাতন নিপীড়নের শেষে ইহুদিরা এবার অবশেষে ইউরোপেও সমতা ও সম্মান পেতে যাচ্ছে।
মুক্তি ছিল ফরাসি বিপ্লবের সিংহনাদ, ফ্রান্সের নেপোলিয়ন সরকারের মূলমন্ত্র। ঘেটো থেকে পালাতে উদগ্রীব ইহুদিদের অবিশ্বাস্য আনন্দের ভেতর ফ্রান্সের ইহুদিরা পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন নেপোলিয়ন। ২৯শে জুলাই, ১৮০৬ ইহুদি ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ও র্যাবাইদের প্যারিসের হোটেল দে ভিলে তলব করা হয়। এখানে তাঁরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন। কয়েক সপ্তাহ পরে নেপোলিয়ন ইহুদি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সংস্থা গঠন করেন, এর নাম দেন তিনি ‘মহান সানহেদ্রিন’-সানহেদ্রিন ছিল ইহুদি শাসক সংস্থা, ৭০ সিই-তে মন্দির ধ্বংসের পর এর আর অধিবেশন বসেনি। এই সংস্থার ম্যান্ডেট ছিল পূর্বের সম্মেলনের ধর্মীয় বিধিবিধানের অনুমোদন দান। ইহুদিরা উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। র্যাবাইগণ ঘোষণা দিয়েছেন যে, ফরাসি বিপ্লব হচ্ছে ‘সিনাই পর্বত থেকে আগত দ্বিতীয় আইন,’ ‘মিশর থেকে আমাদের এক্সোডাস, আমাদের আধুনিক পিস্যাচ’; ‘লিবার্তে, ইগালিতে, ফ্রাতার্নিতে নিয়ে এই নতুন সমাজে আবির্ভূত হয়েছে মেসিয়ানিক যুগ।’১৫ নেপোলিয়নের বাহিনী গোটা ইউরোপ দখল করে নেওয়ার সময় দখল করা প্রতিটি দেশেই এই সাম্যবাদ বহাল করেছিলেন তিনি নেদারল্যান্ডস, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও প্রুশিয়া। একের পর এক সব প্রিন্সিপালিটি ইহুদিদের মুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এমনকি ১৮০৬-এর প্রথম সম্মেলনের সময়ও ইহুদি জাতির প্রতি নেপোলিয়নের কমিশনার লুইস কাউন্ট মোলের এক আক্রমণে আলোকনের বৈরিতা বের হয়ে আসে। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, আলসেচের ইহুদি মহাজনরা কর ফাঁকি দিয়ে জনগণকে শুষে নিচ্ছে। সুতরাং, সমাবেশের ইহুদি প্রতিনিধিদের তাই দায়িত্ব রয়েছে তাদের জনগণের ভেতর শত শত বছরের ‘অমর্যাদাকর অস্তিত্বের’ ফলে বিস্মৃত নাগরিক নৈতিকতা বোধ জাগিয়ে তোলা।১৬ ১৭ই মার্চ, ১৮০৮ ইহুদিদের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নেপোলিয়ন, পরে একে ‘কুখ্যাত ডিক্রি’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। টানা তিন বছর এইসব বিধিনিষেধ জারি থাকায় হাজার হাজার ইহুদি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। আমেরিকান ইতিহাসবিদ নরম্যান ক্যান্টর যেমন উল্লেখ করেছেন, ইহুদিদের ‘ফাউস্টিয়ান বারগেইনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নেপোলিয়ন: মুক্তির বিনিময়ে তাদের অনন্য ইহুদি আত্মা বিক্রি করে দিতে হবে।১৭ লিবার্তের সব রকম অনুপ্রেরণামূলক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও আধুনিক কেন্দ্রিয় রাষ্ট্র ঘেটোর মতো স্বায়ত্তশাসিত অনিয়ম সহ্য করতে পারেনি। আলোকনের রাজনীতিকে আইনি ও সাংস্কৃতিকভাবে সমরূপ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাদের অবশ্যই মিশে যেতে হবে, বুর্জোয়া ফরাসিতে পরিণত হতে হবে, আলাদা জীবনযাত্রা ত্যাগ করতে হবে এবং ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে: ইহুদিদের ইহুদি হিসাবে মিলিয়ে যেতে হবে।
ফরাসি সমাধান ইউরোপের বাকি অংশে ইহুদিদের মুক্তির প্যাটার্নে পরিণত হয়। নতুন সহিষ্ণুতা ছিল পুরোনো বিচ্ছিন্নতার চেয়ে উন্নতি, কিন্তু এটা কেবল আলোকনের অভিনব আদর্শের ছিল না, বরং আধুনিক রাষ্ট্রের চাহিদার ফল। আমরা যেমন দেখেছি, একই ধরনের বাস্তববাদীতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিক বহুত্ববাদকে গ্রহণ করার দিকে চালিত করেছিল। আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে ও একটি সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠন করতে হলে সরকারগুলোকে অবশ্যই তাদের সম্পূর্ণ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। রাষ্ট্রের সরকারী ধর্ম যাই হোক, নতুন অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নের কর্মসূচিতে ইহুদি, প্রটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক ও সেক্যুলারিস্টদের প্রত্যেককেই প্রয়োজন হবে। ইহুদিদের কিংবদন্তীসম ব্যবসাবুদ্ধি বিশেষভাবে কাঙ্ক্ষিত ছিল। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এই সম্পদকে আয়ত্তে আনার প্রয়োজন ছিল ১৮
