হাসিদিম ও মিসনাগদিমের বিরোধ প্রবল হয়ে উঠেছিল। যালমান আসলে কয়েক বছরের জন্যে সেইন্ট পিটার্সবার্গে কারাবন্দি ছিলেন, মিসনাগদিম তাঁকে ঝামেলাবাজ হিসাবে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোয় বৈরিতা কমে আসতে শুরু করে। উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছিল যে পরস্পরের কাছ থেকে নয়, বরং অন্যদিক থেকে তাদের জন্যে বেশি ভয়ের কারণ রয়েছে। সুতরাং, তাদের উচিত একসাথে মিলে এই নতুন হুমকীর মোকাবিলা করা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার ছিল সবে পূর্ব ইউরোপিয় ইহুদি গোত্রের মাঝে প্রবেশ ঘটতে যাওয়া ইহুদি আলোকন হাসকালাহর আবির্ভাব। হাসদিম ও মিসনাগদিম, দুই পক্ষের কাছেই একে ধর্মদ্রোহী মনে হয়েছে।
হাসকালাহ ছিল জার্মানির দেসাউ-র এক দরিদ্র তোরাহ পণ্ডিতের মেধাবী ছেলে মোজেস মেন্দেলসনের (১৭২৯-৮৬) সৃষ্টি। চৌদ্দ বছর বয়সে প্রিয় শিক্ষককে অনুসরণ করে বার্লিনে চলে এসেছিলেন তিনি। এখানে আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষার প্রেমে পড়েন ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি, লাতিন, গাণিত ও দর্শনে নৈপূণ্য অর্জন করেন। জার্মান আলোকনে অংশ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন তিনি, কান্টের ব্যক্তিগত বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। অবসরের গোটা সময়টা পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করতেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ফিদন (১৭৬৭) যৌক্তিক দিক দিয়ে আত্মার অমরতা প্রমাণের প্রয়াসী ছিল, এর মাঝে ইহুদিসূচক বিশেষ কিছু ছিল না। অবশ্য তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইহুদি ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে আলোকনের বৈরিতার মুখোমুখী হয়ে ইহুদিবাদের সমর্থনে নিজেকে আবিষ্কার করে বসেন মেন্দেলসন। ১৭৬৯ সালে এক সুইস প্যাস্টর জোহান কাস্পার লাভাতার মেন্দেলসনকে প্রকাশ্যে ইহুদিবাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি ক্রিশ্চান ধর্মের যৌক্তিক প্রমাণগুলো খণ্ডাতে না পারলে, ঘোষণা করেন লাভাতার, নিজেকে ব্যাপ্টিজমে সমর্পণ করতে হবে। মেন্দেলসন এক প্রুশিয় রাজ কর্মচারী ক্রিশ্চিয়ান উইলহেম ভ্যান দোহমের লেখা প্যামফ্লেট অন দ্য নিসভিক ইম্প্রুভমেন্ট অভ দ্য কন্ডিশন অভ জুজ (১৭৮১)-এ অ্যান্টিসেমিটিক লেখার কারণেও বিব্রত ছিলেন। আধুনিক বিশ্বে দক্ষ ও প্রতিযোগিতার সাথে টিকে থাকার জন্যে, যুক্তি দেখিয়েছেন ভ্যান দোহম, যেকোনও জাতিকে যত বেশি সম্ভব তার মেধাবীদের সমবেত করতে হবে, সুতরাং ইহুদিদের মুক্ত করে তাদের সমাজে আরও পূর্ণভাবে সমন্বিত করার ব্যাপারটি অর্থপূর্ণই মনে হয়, যদিও তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া ঠিক হবে না বা সরকারী অফিসে চাকরী দেওয়া চলবে না। অন্তস্থঃ পূর্বানুমান ছিল ইহুদিরা আপত্তিকর ও তাদের ধর্ম বর্বরোচিত
অনীহার সাথে নিজেকে সাড়া দিতে বাধ্য মনে করেন মেন্দেলসন। ১৭৮৩ সালে জেরুজালেম, কনসার্নিং রিলিজিয়াস অথরিটি অ্যান্ড জুদাইজম প্রকাশ করেন তিনি। জার্মান আলোকন ধর্মের প্রতি বেশ ইতিবাচক ছিল। মেন্দেলসন স্বয়ং লকের প্রশান্ত ডেইস্ট বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন বলে মনে হয়; যদিও একে ইহুদিবাদ হিসাবে শনাক্ত করা কঠিন। মেন্দেলসন যেন একজন দয়াময় ঈশ্বরের অস্তিত্বকে কাণ্ডজ্ঞানের ব্যাপার মনে করেছিলেন, তবে যুক্তিকে বিশ্বাসের আগে স্থান দেওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। কেবল যৌক্তিকভাবে সত্যিকে প্রমাণ করার পরই আমরা বাইবেলের কর্তৃত্ব মেনে নিতে পারি। এটা অবশ্যই ট্র্যাডিশনাল রক্ষণশীল ধর্মবিশ্বাসের অগ্রাধিকারকে পাল্টে দিয়েছিল, যেখানে এটা নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, যুক্তি ঐশীগ্রন্থে পাওয়া মিথের সত্যি তুলে ধরতে পারে না। মেন্দেলসন চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ ও ধর্মের ব্যক্তিকরণেরও যুক্তি দেখান-ইহুদিদের পক্ষে অত্যন্ত আকর্ষণীয় সমাধান ছিল এটা। ঘেটোর বিধিনিষেধ ঝেড়ে ফেলে মূলধারার ইউরোপিয় সংস্কৃতিতে সংশ্লিষ্ট হতে উদগ্রীব ছিল তারা। ধর্মবিশ্বাসকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় বানিয়ে তারা একদিকে যেমন ইহুদি থেকে যেতে পারবে তেমনি হয়ে উঠতে পারবে ভালো ইউরোপিয়। মেন্দলসন জোরের সাথে বলেন যে, ইহুদিবাদ বিশেষভাবে সময়ের ধারার সাথে মানানসই যৌক্তিক ধর্মবিশ্বাস, এর মতবাদগুলো যুক্তিভিত্তিক। ঈশ্বর সিনাই পর্বতে মোজেসের সামনে নিজেকে প্রকাশ করার সময় ইহুদি জাতির জন্যে কতগুলো মতবাদের সংকলন নয়, বরং একটা বিধান নিয়ে এসেছেন। সুতরাং, ইহুদিবাদ কেবল নৈতিকতা ও মানবীয় আচরণের সাথেই জড়িত; এটা ইহুদিদের মানসিকতাকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখে। মেন্দেলসনের ইহুদিবাদের অতীন্দ্রিয় ও পৌরাণিক উপাদান সম্পর্কে সামান্যই উপলব্ধি ছিল মনে হয়। ইহুদিবাদকে জোর করে এর পক্ষে অচেনা এক যৌক্তিক ছাঁচে ঢেলে আধুনিক বিশ্বের কাছে ইহুদিবাদকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার বেশ কয়েকটি প্রয়াসের ভেতর তাঁরটাই ছিল প্রথম-বেশির ভাগ ধর্মের ক্ষেত্রেই যেমন অচেনা ছিল তা।
মেন্দেলসনের ধারণাগুলো অবশ্যই পূর্ব ইউরোপের হসিদিম ও মিসনাগদিমের পক্ষে ঘৃণিত ছিল, পশ্চিমা বিশ্বের অধিকতর অর্থডক্স ইহুদিদের বেলায়ও তাই। বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করে জেন্টাইলদের সাথে যোগ দেওয়া ধর্মদ্রোহী নব্য স্পিনোযা হিসাবে পরিহাস করা হয়েছে তাঁকে। তারপরেও এটা মেন্দেলসনকে দুঃখ দিতে পারত; তিনি স্পষ্টতই ঐতিহ্যবাহী ইহুদিবাদের অধিকাংশকেই অবিশ্বাস্য ও অচেনা আবিষ্কার করেছিলেন বটে, কিন্তু ইহুদি ঈশ্বরকে বা নিজের ইহুদি পরিচয় ত্যাগ করতে চাননি। অবশ্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী ছিল তাঁর। শ্যাব্বেতাই যেভি ঘটনার পর থেকেই ইহুদিরা দেখিয়ে এসেছে যে, ইহুদিবাদের প্রচলিত সীমিতকারী আবিষ্কার করা কঠোর বিধানের অতীতে যেতে চায় তারা। মেন্দেলসনের নজীর অনুসরণ করতে পেরে খুশি হয়েছিল তারা: জেন্টাইল সমাজে মেলামেশা করা, নতুন বিজ্ঞান পাঠ করা, নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে একান্তে রাখা। মেন্দেলসন ছিলেন ইহুদিদের জাতি ও নিজস্ব সংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ত্যাগ করতে বাধ্য না করে ঘেটো থেকে বের হয়ে আধুনিক ইউরোপে মিশে যাওয়ার উপায় উদ্ভাবনকারী প্রথম ব্যক্তিদের একজন।
