প্রাক-আধুনিক বিশ্বে ইতিহাস সম্পর্কে মানুষের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তারা আসলে কী ঘটেছিল তা নিয়ে আমাদের চেয়ে কম আগ্রহী ছিল। তারা বরং ঘটনার নিগূঢ় অর্থের ব্যাপারেই বেশি সংশ্লিষ্ট ছিল। ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহকে সময়ের দূরবর্তী প্রান্তের অনন্য সাধারণ ব্যাপার হিসাবে দেখা হত না, বরং একে অটল, সময়হীন বাস্তবতার প্রকাশ মনে করা হত। এই কারণে ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করার প্রবণতা দেখাত, কারণ সূর্যের নিচে কোনও কিছুই নতুন ছিল না। ঐতিহাসিক বিবরণসমূহ চিরন্তন মাত্রাকে বের করে আনার প্রয়াস পেত। এভাবে প্রাচীন ইসরায়েলিরা মিশর থেকে পালিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করার সময় আসলে কী ঘটেছিল সেটা আর আমরা জানতে পারি না। পরিকল্পিতভাবেই এই কাহিনীকে মিথ হিসাবে লেখা হয়েছে, এবং একে যাত্রার অন্যান্য কাহিনী, গভীরে প্লাবিত হওয়া ও এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টির জন্যে দেবতাগণের সাগর দুই ভাগ করার কাহিনীর সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর পাসওভার সেদারের আচারে ইহুদিরা এই মিথের অভিজ্ঞতা লাভ করে, এই উৎসব ওদের জীবনে কাহিনীটিকে নতুন করে ফিরিয়ে এনে একে তাদের নিজেদের কাহিনীতে পরিণত করতে সাহায্য করে। কেউ বলতে পারেন ঐতিহাসিক ঘটনাকে এইভাবে মিথে পরিণত করা না হলে, এবং অনুপ্রেরণাসৃষ্টিকারী কাল্টে রূপান্তরিত না করলে তা ধর্মীয় হতে পারবে না। ঠিক বাইবেলে যেভাবে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, মিশর থেকে এক্সোডাস সেভাবেই ঘটেছিল কিনা, এই প্রশ্ন উত্থাপন বা একে সত্যি প্রমাণ করার জন্যে বৈজ্ঞানিক বা ও ঐতিহাসিক প্রমাণ দাবি করা গল্পের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে গ্রহণ করার শামিল হবে। এটা হবে মিথোস-কে লোগোসে-র সাথে গুলিয়ে ফেলার মতো।
লোগোসও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লোগোস হচ্ছে এই বিশ্বে নারী- পুরুষকে কর্মক্ষম রাখার যৌক্তিক, বাস্তবভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা। আজকের দিনে পশ্চিমে আমরা হয়তো মিথোসের বোধ হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু লোগোসের সাথে আমরা বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। এটাই আমাদের সমাজের ভিত্তি। মিথের বিপরীতে লোগোস-কে অবশ্যই বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত হতে হবে ও বাইরের বাস্তবতার সাথে মিলতে হবে, যদি একে কার্যকর হতে হয়। জাগতিক বিশ্বে একে দক্ষতার সাথে ক্রিয়াশীল থাকতে হবে। আমরা যখন কোনও কিছু করতে যাই, কোনও কাজ সম্পাদন করতে চাই বা অন্য লোককে বিশেষ কোনও কাজে সম্মত করাতে চেষ্টা করি তখনই এই যৌক্তিক, আলোচনামূলক যুক্তি প্রয়োগ করে থাকি। লোগোস বাস্তবভিত্তিক। সূচনা ও ভিত্তির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপকারী মিথের বিপরীতে লোগোস দৃঢ়তার সাথে সামনে অগ্রসর হয় ও প্রাচীন দর্শনকে ব্যাখ্যা করার লক্ষ্য নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করে, পরিবেশের উপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে, ও আনকোরা কিছু আবিষ্কার করে এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করে।
প্রাক আধুনিক বিশ্বে মিথোস ও লোগোস উভয়কেই অপহিার্য মনে করা হত। একটি ছাড়া অন্যটি অচল হয়ে পড়ত। কিন্তু তারপরেও এদুটো ছিল আবিশ্যিকভাবেই ভিন্ন; পৌরাণিক ও যৌক্তিক আলোচনাকে গুলিয়ে ফেলা বিপজ্জনক মনে করা হত। ভিন্ন ভিন্ন ছিল তাদের কাজ। মিথ যৌক্তিক ছিল না; এর বর্ণনা প্রায়োগিকভাবে তুলে ধরা যাবে বলে মনে হত না। এটা অর্থের একটা পরিপ্রেক্ষিত যোগাত যা আমাদের কর্মকাণ্ডকে মূল্যবান করে তুলত। মিথোসকে বাস্তবভিত্তিক কোনও নীতির ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করবেন আপনি, এমনটা ভাবা হত না। সেটা করে থাকলে ফলাফল ভয়াবহ রকম মারাত্মক হয়ে উঠতে পারত; কারণ মনের অন্তস্থঃ বিশ্বে যা চমৎকারভাবে কাজ করে সেটা চট করে বাইরের কর্মকাণ্ডে প্রয়োগ সম্ভব ছিল না। উদাহরণ স্বরূপ, পোপ দ্বিতীয় আরবান যখন ১০৯৫ সালে প্রথম ক্রুসেডের ডাক দেন, তার পরিকল্পনা ছিল লোগোসের বলয়ের। তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপের নাইটরা যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাত বন্ধ করে ও পাশ্চাত্য ক্রিশ্চান বিশ্বের ভিত্তি বিনষ্ট না করে চলে। এবং সেই শক্তিটুকু যেন তারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় করে তাঁর চার্চের শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু এই সামরিক অভিযান লোক মিথলজি, বাইবেলিয় উপকথা ও প্রলয়বাদী ফ্যান্টাসির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেলে বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়ায় তার পরিণতি; বাস্তবক্ষেত্রে, সামরিক দিক থেকে ও নৈতিকভাবেও। দীর্ঘ ক্রুসেডিয় কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ সময় জুড়ে ব্যাপারটা এমন ছিল যে যখনই লোগোস আধিপত্য বজায় রেখেছে তখনই ক্রুসেডাররা সাফল্যের মুখ দেখেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে চমৎকার তৎপরতা দেখিয়েছে তারা, মধ্যপ্রাচ্যে উপযোগি কলোনী প্রতিষ্ঠা করেছে এবং স্থানীয় জনগণের সাথে অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে মিশতে শিখেছে। তবে যখনই ক্রুসেডাররা তাদের নীতির ভিত্তিতে পৌরাণিক বা নিগূঢ় দর্শন তৈরি করতে গেছে, সাধারণত তারা পরাস্ত হয়েছে ও ভয়ানক সব নিষ্ঠুরতার জন্ম দিয়েছে।
লোগোসের নিজস্ব সীমাবদ্ধতাও ছিল বৈকি। মানুষের বেদনা বা বিষাদের প্রশমন ঘটাতে পারত না এটা। যৌক্তিক যুক্তি-তর্ক ট্র্যাজিডির কোনও অর্থ করতে পারত না। লোগোস মানব জীবনের পরম মূল্য সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর যোগাতে পারেনি। একজন বিজ্ঞানী বিভিন্ন বস্তুকে আরও কার্যকরভাবে ক্রিয়াশীল করে তুলতে পারতেন, ভৌত বিশ্ব সম্পর্কে আবিষ্কার করতে পারতেন অসাধারণ সব নতুন তথ্য, কিন্তু তিনি জীবনের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারতেন না।” এটাই ছিল মিথ আর কাল্টের রাজত্ব।
