অনেক দিক থেকেই হাসিদিম বেশটের জীবনের শেষ দিকে পূর্ব ইউরোপে মাত্র আবির্ভূত হতে শুরু করা ইউরোপিয় আলোকনের বিপরীত মেরুর ছিল। ফিলোসফস ও বিজ্ঞানীরা যেখানে বিশ্বাস করতেন যে, কেবল যুক্তিই সত্যির দিকে চালিত করতে পারে, বেশট সেখানে অতীন্দ্রিয় প্রতিষ্ঠানকে যৌক্তিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি উন্নত করেছেন। হাসিদিম আধুনিকতার বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার করেছে-রাজনীতি থেকে ধর্ম, পবিত্র থেকে অপবিত্র-এবং এমন এক হলিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে যেখানে সর্বত্র পবিত্রতাকে দেখতে পেয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে বিশ্বকে নিরানন্দে পরিণত করেছে, বিশ্বজগৎকে ঐশীসত্তা বিহীন আবিষ্কার করেছে, হাসিদিম সেখানে এক পবিত্র সর্বব্যাপীতা অনুভব করেছে। সাধারণ জনগণের আন্দোলন হলেও হাসিদিমে গণতান্ত্রিক কোনও ব্যাপার ছিল না। বেশট বিশ্বাস করতেন, সাধারণ হাসিদ সরাসরি ঈশ্বরের সাক্ষাতে পৌঁছাতে পারবে না। কেবল একজন যাদ্দিক (‘ন্যায়নিষ্ঠ পুরুষ’)-এর ভেতরেই সে ঐশী সত্তাকে খুঁজে পেতে পারে, যিনি সাধারণ মানুষের নাগালের অতীত ঈশ্বরের অতীন্দ্রিয় সচেতনতা দেভেকুতে দক্ষতা অর্জন করেছেন। সুতরাং, হাসিদ তার যাদ্দিকের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল, এটা এমন এক প্রবণতা যাকে কান্ট হয়তো অর্থহীন দাসত্ব বলে নিন্দা জানাতেন। সুতরাং, হাসিদিম গভীরভাবে আলোকন বৈরী ছিল, পূর্ব ইউরোপে এর অনুপ্রবেশ ঘটা শুরু করলে বহু হাসিদিমই প্রত্যাখ্যান করবে।
বেশট বেঁচে থাকতে রাব্বিনিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে ততটা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেনি, কিন্তু নতুন নেতা দোভ বার ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন খদ্দের। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। লিথুয়ানিয়ায় পৌঁছানোর পর শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব একাডেমি অভ ভিলনার প্রধান (গাওন) এলিয়াহ বেন সলোমন যালমানের (১৭২০-৯৭) নজর কাড়ে তা। গাওন এই আন্দোলনে, বিশেষ করে এর তোরাহ পাঠের অবমূল্যায়নে রীতিমতো ভীত বোধ করেন, এটাই ছিল তাঁর মূল আবেগ। অবশ্য তাঁর পাণ্ডিত্য দুর্নীতিবাজ পোলিশ র্যাবাইদের দায়সারা পাঠের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রার ছিল। গভীর অতীন্দ্রিয় ছাপ ছিল তাতে। তাঁর ছেলেরা আমাদের বলছেন যে, সারা রাত জেগে তোরাহ পাঠ করার জন্যে বরফ শীতল পানিতে পা ডুবিয়ে রাখতেন তিনি। গাওনের চোখে তোরাহ পাঠ ছিল হাসিদিমদের চেয়েও অনেক বেশি আগ্রাসী অনুশীলন। তিনি তাঁর ভাষায় পাঠের ‘প্রয়াস’-কে উপভোগ করতেন, মনে হত প্রবল মানসিক তৎপরতা তাঁকে সচেতনতার এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নিজেকে যখন ঘুমানোর সুযোগ দিতেন, তোরাহ তাঁর স্বপ্নে হানা দিত, স্বর্গে অতীন্দ্রিয় আরোহণের অভিজ্ঞতা লাভ করতেন তিনি। সুতরাং, তোরাহ পাঠ ছিল ঈশ্বরের সাথে এক ধরনের সাক্ষাৎ। তাঁর অনুসারী র্যাবাই হাঈম ফোলঝাইনার (১৭৪৯-১৮২১), পরে যার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটবে, যেমন ব্যাখ্যা করেছেন: ‘তোরাহ পাঠকারী ঈশ্বরের সাথে মিলিত হয়, কারণ ঈশ্বর ও তোরাহ এক ও অভিন্ন।১১ তবে আধুনিক গবেষণার জন্যে সময় বের করে নিয়েছিলেন গাওন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, অ্যানাটমি, গণিত ও বিদেশী ভাষায় নিপুণ ছিলেন তিনি। হাসিদিমকে ধর্মদ্রোহী ও অস্পষ্টতাবাদী হিসাবে আবিষ্কার করেছিলেন। বিরোধ তিক্ত হয়ে উঠেছিল। গাওন সমর্থকরা-হাসিদিমরা যাদের বলত মিসনাগদিম (‘বিরোধী’)-অনেক সময় তাদের কোনও সদস্য হাসিদিমে পরিণত হলে শোক পালনের অনুষ্ঠান করত, যেন সে মারা গেছে; অন্যদিকে হাসিদিমরা মিসনাগদিমদের প্রকৃত ইহুদি মনে করত না। শেষ পর্যন্ত ১৭৭২ সালে গাওন ভিলনা ও ব্রদির হাসিদিমকে সমাজচ্যুত করেন; বহিষ্কারের এই আঘাত দোভ বারের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল বলে কথিত আছে।
গাওনের জীবনের শেষে দিকে ইউক্রেন ও বেলোরুসিয়ার হাসিদিক নেতা র্যাবাই শেয়ুর যালমান (১৭৪৫-১৮১৩) সমন্বয়ের প্রয়াস পেয়েছিলেন, কিন্তু গাওন তাঁর সাথে কথা বলতে অস্বীকার করেন। প্রকৃতপক্ষে যালমানের গ্রন্থ তানিয়ার (১৭৯১) প্রকাশনা বহিষ্কারের এক নতুন আইনের সুচনা করেছিল। ব্যাপারটা ছিল করুণ। মিসনাগদিমের আধ্যাত্মিকতার অনেক কাছাকাছি হাবাদ নামে পরিচিত এক নতুন ধরনের হাসিদিমে`র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছিলেন যালমান, যৌক্তিক ভাবনাকে আধ্যাত্মিক তত্ত্বতালাশের সূচনা বিন্দুতে পরিণত করেছিল তা। যালমান আলোকনের কোনও কোনও ধারণার ব্যাপারে উন্মুক্ত ছিলেন। একটি অতীন্দ্রিয় কাঠামোয় সেগুলোকে স্থান করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল যৌক্তিক শক্তি ঈশ্বরকে পাওয়ার ক্ষেত্রে অক্ষম; আমরা কেবল আমাদের ইন্দ্রিয়র উপর নির্ভর করলে-বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা যেমনটা আমাদের করতে বলেন-জগৎকে আদতেই ঐশী সত্তাশূন্য ঠেকে। কিন্তু অতীন্দ্রিয়বাদী ধারণার ভিন্ন এক রূপে যাওয়ার জন্যে তার ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারে, সকল ঘটনা তা সর্বব্যাপী ঐশী উপস্থিতি প্রকাশ করবে। যালমান যুক্তি বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু কেবল সেই প্রাচীন রক্ষণশীল যুক্তিই তুলে ধরছিলেন যে যৌক্তিক ভাবনাই ধারণার একমাত্র উপায় নয়; যুক্তি ও অতীন্দ্রিয় স্বজ্ঞাকে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। ইহুদিরা যৌক্তিক আঁচঅনুমানে ব্যস্ত ও আধুনিক সেক্যুলার বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে যখন, যালমান যুক্তি দেখিয়েছেন, তারা তাদের মনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে, এবং নিগূঢ় প্রার্থনার মাধ্যমে সেগুলোকে অতিক্রম করে যেতে চাইবে। যালমান তাঁর হাবাদ হাসিদিমকে বেশ্ট সূচিত সহিংস অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে দুর্ভেয় অনুভূতিতে নিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছেন। স্বয়ং যালমান ঘোরের অবস্থায় না পৌঁছানো পর্যন্ত ঘাসের উপর গড়াগড়ি যেতেন, সাধারণ লোকের মতো নাচতেন।১৪ কিন্তু এই পরমানন্দ প্রোথিত ছিল পাঠ ও সুশৃঙ্খল মনোনিবেশের মাঝে। হাবাদ হাসিদিমদের মনের আরও গভীর স্তরে অবতরণের মাধমে সকল মহান ঐতিহ্যের অতীন্দ্রিয়বাদীর মতো সত্তার ভূমিতে পবিত্র উপস্থিতির সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত অবচেতন সত্তাকে সামাল দেওয়া শেখানো হত।
