বেশ্ট হাসিদিমকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেন। র্যাবাইদের কছে থেকে নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটানোর প্রয়াস পেয়েছিল তা। ১৭৫০ সাল নাগাদ পোদোলা, ফোলহাইনা, গালিশিয়া ও ইউক্রেনের মতো অধিকাংশ নতুন শহরে হাসিদিমের সেল আবির্ভূত হয়েছিল। সমসাময়িক একটি সূত্র অনুমান করেছে যে, জীবনের শেষ নাগাদ বেশটের মোটামুটি চল্লিশ হাজার অনুসারী ছিল, নিজস্ব ভিন্ন সিনাগগে প্রার্থনা করত এরা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ হাসিদিম পোল্যান্ড, ইউক্রেন, ও পূর্ব গালিশিয়ার অধিকাংশ ইহুদি সম্প্রদায়ের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। হোয়াইট রাশিয়া, রোমানিয়ার অনেক শহরে এর প্রতিষ্ঠা ঘটে ও লিথুয়ানিয়ায় প্রবেশ শুরু করে।
নিউ লাইট প্রটেস্ট্যানন্ট মতবাদের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল হাসিদিম; নিউ লাইটস যেমন তাদের ভিন্ন চার্চ গঠন করেছিল তেমনি হাসিদিমও নিজস্ব জমায়েত গঠন করে। দুটোই পল্লী অঞ্চলে জনসাধারণের কাছ জনপ্রিয় ছিল। রেডিক্যাল প্রটেস্ট্যান্টরা যেমন অভিজাতদের তাদের শিক্ষা ও ধর্মতাত্ত্বিক দক্ষতার উপর নির্ভর করার জন্যে তীব্র নিন্দাবাদ জানিয়েছিল, ঠিক তেমনি হাসিদিম র্যাবাইদের শুষ্ক তোরাহ পণ্ডিতি নিয়ে পরিহাস করেছে। বেশ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রার্থনাকে অবশ্যই তোরাহ পাঠের আগে স্থান দিতে হবে, বিপ্লবী পদক্ষেপ ছিল এটা। শত শত বছর ধরে ইহুদিরা তোরাহ শিক্ষার উপর ভিত্তি করে র্যাবাইদের কর্তৃত্ব মেনে এসেছে, কিন্তু র্যাবাইরা সম্প্রদায়ের জরুরি সামাজিক সমস্যাদি থেকে চোখ ফিরিয়ে পবিত্র টেক্সটে পিছু হটায় হাসিদিম গতানুগতিকে পরিণত হতে চলা এই পণ্ডিতি প্রত্যাখান করেছে, যদিও নিজেদের মতো করে পবিত্র টেক্সট পাঠ করত তারা।
অবশ্য নিউ লাইটস প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ ছিল আধুনিকায়নের আধ্যাত্মিকতা, অন্যদিকে হাসিদিম প্রকৃতিগতভাবে রক্ষণশীল সংস্কার আন্দোলন ছিল। এর আধ্যাত্মিকতা ছিল পৌরাণিক, আদিম বিপর্যয়ের সময় বস্তু জগতে আটকা পড়ে যাওয়া স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গের লুরিয় প্রতীকের উপর ভিত্তি করে প্রণীত, কিন্তু বেশ্শ্ট এই ট্র্যাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ঈশ্বরের সর্বব্যাপীতার ইতিবাচক উপলব্ধিতে পরিণত করেছেন। সব কিছুতেই স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গের ছিটেফোঁটা পাওয়া যেতে পারে। এমন কোনও জায়গা পাওয়া যাবে না যেখানে ঈশ্বর উপস্থিত নন: সবচেয়ে সফল হাসিদিম মনোসংযোগ ও সর্বক্ষণ ঈশ্বরের সাথে সংশ্লিষ্ট (দেভেকুত) থেকে এই গুপ্ত স্বর্গীয় উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে। কোনও কাজই, তা সে যত পার্থিব বা ইন্দ্রিয়জ হোক না কেন, কোনওভাবেই অশ্লীল নয়। ঈশ্বর সব সময়ই উপস্থিত, হাসিদিম যখন খাচ্ছে, পান করছে, ভালোবাসছে বা ব্যবসা পরিচালনা করেছ, সব সময়ই তাঁকে পাওয়া যেতে পারে। হাসদিমকে অবশ্যই তাদের এই ঐশী উপস্থিতির সচেতনতা দেখাতে হবে। একেবারে গোড়া থেকেই হাসিদিক প্রার্থনা শোরগোলময় ও পরমানন্দমূলক ছিল; হাসিদিম সমগ্র সত্তাকে প্রার্থনায় নিয়োজিত করার লক্ষ্যে প্রণীত তাদের প্রার্থনাকে অদ্ভুত, সহিংস অঙ্গভঙ্গি দিয়ে গড়ে তুলেছিল। তারা হাততালি দিত, সামনে পেছনে মাথা দোলাত, হাত দিয়ে দেয়ালের আঘাত করত, আর গোটা শরীর এপাশ-ওপাশ দোল খাওয়াত। বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের চেয়ে গভীর স্তরে হাসিদকে শিখতে হত যে তার সমগ্র সত্তাকে অবশ্যই আশপাশের পরিবেশের স্বর্গীয় শক্তির কাছে সুনম্য হতে হবে, ঠিক যেমন মোমবাতির শিখা বাতাসের প্রতিটি ওঠা-নামার সাথে সাড়া দেয়। কোনও কোনও হাসিদিম এমনকি ঈশ্বরের কাছে সামগ্রিক আত্মসমর্পণের কারণে সম্পূর্ণ অহমের পাল্টে যাওয়া বোঝাতে সিনাগগে ডিগবাজিও খেত
অবশ্য হাসিদিমের উদ্ভাবনসমূহ অতীতে প্রোথিত ছিল, এসবকে প্রাচীন সত্যি পুনরুদ্ধার হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। বেশ্ট দাবি করেছেন, পয়গম্বর এলিযাহর গুরু আহিজাহ অভ শিলোহই তাঁকে ঐশী রহস্য সম্পর্কে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি স্বয়ং এলিযাহর আত্মাকে ধারণ করছেন।’ বেশট ও তাঁর অনুসারীরা প্রাচীন পৌরাণিক পদ্ধতিতে ঐশীগ্রন্থ পাঠ করছিলেন। বাইবেলকে সমালোচনার দৃষ্টিতে বা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পাঠ করার বদলে হাসিদিম তোরাহ পাঠকে আধ্যাত্মিক অনুশীলনে পরিণত করেছিল। ‘তোমাদের সেরা উপায়ের তোরাহ পাঠ শিক্ষা দেব আমি,’ শিষ্যদের বলতেন বেশ্শ্ট; ‘মোটেই নিজেকে অনুভব [সচেতন হয়ে ওঠা] করার জন্যে নয়, বরং এক মনোযোগী শ্রোতার মতো যার কান উচ্চারিত সব কথাই শুনতে পায়, কিন্তু নিজে কোনও কথা বলে না।” হাসিদকে টেক্সটের প্রতি হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দিতে হত, নিজেকে অহম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিতে হত। সত্তার এই অতিক্রম ছিল এক ধরনের পরমানন্দ যার জন্যে প্রয়োজন ছিল হাসিদের মানসিক শক্তির সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ যা আমেরিকার পুনর্জাগরণবাদীদের আরও উন্মত্ত পরিবর্তনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আক্ষরিক পাঠের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না বেশট, তিনি পৃষ্ঠার শব্দের অতীত স্বর্গের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছেন, ঠিক যেভাবে তাঁর হাসিদিমদের বাহ্যিক বিশ্বের উপরিতলের উপর দিয়ে তাকিয়ে অভ্যন্তরে বিরাজিত সত্তা সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠার শিক্ষা দিয়েছিলেন। একটা গল্প চালু রয়েছে যে হাসিদিক আন্দোলনের পরে একদিন বেশট-এর উত্তরসুরি হয়ে ওঠা বিজ্ঞ কাব্বালিস্ট দোভ বার (১৭১০-৭২) তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। দেবদূতদের প্রসঙ্গে একটি লুরিয় অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা করছিলেন দুই জন, বেশ্শ্ট লক্ষ করলেন দোভ বারের আক্ষরিক ব্যাখ্যা সঠিক হলেও তা যথেষ্ট নয়। তিনি তাঁকে দেবতাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে উঠে দাঁড়াতে বললেন। দোভ বার সোজা হয়ে দাঁড়ানোমাত্র ‘গোটা বাড়ি আলোয় ভরে উঠল, চারপাশে জ্বলে উঠল আগুন, এবং তাঁরা [দুজনই] উল্লেখ করা দেবদূতদের উপস্থিতি টের পেলেন।’ ‘তুমি যেভাবে বলেছ সেটাই সহজ পাঠ,’ দোভ বারকে বললেন বেশট, ‘কিন্তু তোমার পাঠের ধরনে আত্মার ঘাটতি ছিল।৯ প্রবণতা ও প্রার্থনার কাল্টিক অঙ্গভঙ্গি ছাড়া সম্পূর্ণ যৌক্তিক পাঠ কোনও হাসিদকে টেক্সটের নির্দেশিত অদৃশ্য বাস্তবতার দিকে চালিত করবে না।
