এর কারণ ধর্মীয় সত্যিকে যৌক্তিক লোগোই-এর মতো বিবেচনা করে আধুনিক বিজ্ঞানী, সমালোচক ও দার্শনিকগণ সেগুলোকে অবিশ্বাস্য করে তুলেছিলেন। ১৮৮২ সালে ফ্রেডেরিখ নিৎশে (১৮৪৪-১৯০০) ঈশ্বরের প্রয়াণ ঘটেছে ঘোষণা করবেন। দ্য গ্রে সায়েন্স-এ তিনি এক উন্মাদের কাহিনী বলেছেন, একদিন সকালে সে বাজার এলাকায় ছুটে এসে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি!’ আমোদিত ও উন্নাসিক পথচারীরা যখন জানতে চাইল, সে কি ভেবেছে ঈশ্বর নির্বাসনে গেছেন বা সটকে পড়েছেন, চোখ পাকিয়ে তাকাল সে। ‘ঈশ্বর কোথায় গেছেন?’ জানতে চাইল সে। ‘আমরা তাঁকে হত্যা করেছি-তোমরা আর আমি! আমরা সবাই তাঁর ঘাতক!৯৫ গুরুত্বপূর্ণ এক অর্থে ঠিকই বলেছিলেন নিৎশে। মিথ, কাল্ট, আচার ও প্রার্থনা ছাড়া পবিত্রের অনুভূতি অনিবার্যভাবে মারা যায়। ‘ঈশ্বর’কে সম্পূর্ণ মতগত সত্যিতে পরিণত করে কিছু আধুনিক বিশ্বাসীর প্রয়াসের মতো কেবল বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ঐশী সত্তার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আধুনিক নারী- পুরুষ নিজেরাই এঁকে হত্যা করেছে। তাদের ভবিষ্যৎমুখী সংস্কৃতি পবিত্রের প্রতি অগ্রসর হওয়ার প্রচলিত পথকে দার্শনিকভাবে অসম্ভব করে তুলেছে। এর আগে ইহুদি মারানোদের মতো, সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে যাদের ধর্মীয় শূন্যতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, অনেক আধুনিক নারী-পুরুষ ধর্মের সত্যিকে ক্ষীণ, খেয়ালি ও দুর্বোধ্য বলে আবিষ্কার করছিল।
নিৎশে’র উন্মাদ বিশ্বাস করত, ঈশ্বরের প্রয়াণ মানবজাতিকে এর শেকড় থেকে উপড়ে দিয়েছে, পৃথিবীকে এর কক্ষপথ থেকে উৎক্ষিপ্ত করে একে মহাশূন্যের পথহীন অঞ্চলে ভাসিয়ে দিয়েছে। যা কিছু মানুষকে একসময় পথের দিশা দিত তার সবই উধাও হয়ে গেছে। ‘এখনও কি আকাশ ও জমিন আছে?’ জানতে চেয়েছে সে। ‘আমরা কি অসীম শূন্যতার ভেতর দিয়ে ভেসে চলার মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়িনি?’৯৬ এক গভীর ত্রাস, অর্থহীনতার বোধ আধুনিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে দাঁড়াবে। নিৎশে এমন এক সময় লিখছিলেন যখন আধুনিকতার অতিরিক্ত উল্লাস নামহীন ভীতির সঞ্চার করছিল। এটা কেবল ইউরোপের ক্রিশ্চানদেরই প্রভাবিত করবে না, বরং আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় টেনে আনা ইহুদি ও মুসলিম যারা একে সমানভাবে বিভ্রান্তিকর বলে আবিষ্কার করেছে, তাদেরও প্রভাবিত করবে।
০৪. ইহুদি ও মুসলিম: আধুনিক হলো (১৭০০-১৮৭০)
ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রিশ্চানদের পক্ষে আধুনিকায়ন কঠিন হয়ে থাকলে ইহুদি ও মুসলিমদের জন্যে সেটা ছিল আরও সমস্যাসঙ্কুল। মুসলিমরা আধুনিকায়নকে ঔপনিবেশবাদ ও বিদেশী আধিপত্যবাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক অচেনা আগ্রাসী শক্তি হিসাবে অনুভব করেছে। তাদের এমন এক সভ্যতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছিল যার মূল কথাই হচ্ছে স্বাধীনতা, যেখানে তারা নিজেরা রাজনৈতিক অধীনতা ভোগ করছিল। আধুনিক চেতনা লক্ষণীয়ভাবে ইহুদিবাদের প্রতি বৈরী ছিল। সহিষ্ণুতার অনেক বাগাড়ম্বড় সত্ত্বেও আলোকন চিন্তকরা তখনও ইহুদিদের অসন্তোষের সাথেই দেখছিলেন। ফ্রাঁসোয়া মেরি ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮) ডিকশনেয়ারে ফিলোসফিক-এ (১৭৫৬) তাদের ‘সম্পূর্ণ অজ্ঞ জাতি’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন; ‘ঘৃণার্হ কার্পণ্য ও তাদের যারা সহ্য করেছে সেইসব জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা’ তাদের উপাদান। ইউরোপের অন্যতম ঘোষিত নাস্তিক ব্যারন দ’হলবাখ (১৭২৩-৮৯) ইহুদিদের ‘মানবজাতির শত্রু’১ আখ্যায়িত করেন। কান্ট ও হেগেল উভয়ই ইহুদিবাদকে দাসোচিত, ইতর ধর্মবিশ্বাস, সম্পূর্ণ যুক্তির বিরোধী’ হিসাবে দেখেছেন, অন্যদিকে কার্ল মার্ক্স স্বয়ং ইহুদি বংশোদ্ভুত হলেও ইহুদিরা তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্বের সকল অশুভের মুল পুঁজিবাদের জন্যে দায়ী বলে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। সুতরাং, ইহুদিদের অবশ্যই ঘৃণার এক আবহে আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছিল।
আমেরিকায় অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনসমূহ প্রটেস্ট্যান্টদের দুটো ভিন্ন শিবিরে ভাগ করে দিয়েছিল। একই সময়ে পূর্ব ইউরোপিয় ইহুদি গোষ্ঠীর ভেতরও একই রকম বিরোধ দেখা দিয়েছিল। পোল্যান্ড, গালিশিয়া, বেলোরুসিয়া ও লিথুয়ানিয়ার ইহুদিরা দুটি বিরোধী শিবিরে বিভক্ত ছিল; দুটোই ইহুদি মৌলবাদের উৎপত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমেরিকান কালভিনিস্টরা যখন প্রথম মহাজাগরণের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় আবির্ভূত হাসিদিম নিউ লাইটসের চেয়ে তেমন একটা ব্যতিক্রম ছিল না। ১৭৩৫ সালে ইসরায়েল বেন এলিয়েজার (১৭০০–৬০) নামে এক দরিদ্র সরাইখানা মালিক ঘোষণা করে বসেন, এক প্রত্যাদেশ লাভ করেছেন তিনি যা তাঁকে ‘নামের গুরুতে’ (বা’ল শেম) পরিণত করেছে, ঈশ্বরের নামে অলৌকিক চিকিৎসা ও ওঝাগিরি করে পোল্যান্ডে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ানো ফেইথ হীলারদের একজন। কিন্তু ইসরায়েল অচিরেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে বসেন, কারণ দরিদ্রদের আধ্যাত্মিক প্রয়োজনসহ শারীরিক সমস্যার দিকে নজর দিতেন তিনি। ফলে বা’ল শেমে তোভের সমার্থক ‘বেশট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি, আক্ষরিকভাবে যার অর্থ ‘শুভ নামের গুরু,’ ভিন্ন মর্যাদার ওস্তাদ। পোলিশ ইহুদিদের জন্যে এটা ছিল এক কৃষ্ণ কাল। লোকে তখনও শাব্বেতিয় কেলেঙ্কারীর ধাক্কা পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি, ১৬৪৮ সালের হত্যালীলার পর থেকে বিরাট অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবেলা করে চলা ইহুদি সম্প্রদায়গুলো আধ্যাত্মিক সংকটে ভুগছিল। বেঁচে থাকার সংগ্রামে সম্পদশালী ইহুদিরা ন্যায়সঙ্গতভাবে করের বোঝা বণ্টন করত না, ধনী ও দরিদ্রের মাঝে সামাজিক বৈষম্য বেড়ে উঠেছিল, অভিজাত দরবারে নিয়মিত যাতায়াতকারী শক্তিমানরা কেহিলার নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিচ্ছিল, অন্যদিকে দুর্বলদের পিঠ দেয়ালে ঠেকছিল। আরও খারাপ ব্যাপার হলো, র্যাবাইদের অনেকেই এই নিপীড়নে হাত মেলান, তাঁরা দরিদ্রদের দিকে কোনও নজরই দেননি। আইনের খুঁটিনাটি নিয়ে মামুলি আলাপে বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি নষ্ট করছিলেন। দরিদ্ররা নিজেদের পরিত্যক্ত ভাবতে শুরু করেছিল। দেখা দিয়েছিল আধ্যাত্মিক শূন্যতা, কুসংস্কার সব সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। বেশি দুস্থ ইহুদিদের শিক্ষা দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন জনপ্রিয় যাজকগণ, তাঁদের পক্ষ নিয়ে রাব্বিনিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে আক্রমণ শাণিত করেন। প্রায়শঃই এই হাসিদিমরা (‘ধার্মিক জন’) সিনাগগের পরোয়া না করে বিচ্ছিন্ন সেল গঠন করে প্রার্থনা দল তৈরি করত। এই হাসিদিক বলয়েই নিজেকে ১৭৩৫ সালে তুলে ধরেন বেশট, নিজেকে একজন বা’ল শেম ঘোষণা করে তাদের র্যাবাইতে পরিণত হন.৪
