কিন্তু তাসত্ত্বেও অরিজিন প্রকাশিত হওয়ার পর ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া ছিল চাপা। সাতজন অ্যাংলিকান যাজক সাধারণ পাঠকের জন্যে সর্বশেষ বাইবেলিয় সমালোচনা সহজলভ্য করে তোলা এসেজ অ্যান্ড রিভিউজ প্রকাশ করলে পরের বছর বেশি শোরাগোল হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে জার্মান পণ্ডিতগণ বাইবেলের ক্ষেত্রে সাহিত্যিক বিশ্লেষণ, প্রত্নতত্ত্ব ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের নতুন কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছিলেন। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগযোগ্য পদ্ধতির অধীনে নিয়ে এসেছিলেন একে। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বাইবেলের প্রথম পাঁচটি পুস্তক, প্রচলিতভাবে যেগুলোর রচয়িতা মোজেস বলে উল্লেখ করা হয়, আসলে অনেক পরে বেশ কয়েক জন ভিন্ন ভিন্ন লেখকের হাতে রচিত; বুক অভ ইসায়াহর অন্তত দুটো ভিন্ন ভিন্ন উৎস রয়েছে, রাজা ডেভিড সম্ভবত শ্লোক রচনা করেননি। বাইবেলের বর্ণিত বেশির ভাগ অলৌকিক কাণ্ডই স্রেফ সাহিত্যিক হেঁয়ালি, আক্ষরিকভাবে বোঝার উপায় নেই; বাইবেলিয় বহু ঘটনা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ঐতিহাসিক নয়। এসেজ অ্যান্ড রিভিউজ-এ ব্রিটিশ যাজকগণ যুক্তি দেখান, বাইবেলের কোনও বিশেষ মর্যাদা পাওয়া উচিত নয়, একে বরং আর পাঁচটা টেক্সটের মতোই সমান সমালোচনার বিষয়ে পরিণত করতে হবে। নতুন ‘হাইয়ার ক্রিটিসিজম’ মিথের বিরুদ্ধে লোগোসের যৌক্তিক ডিসকোর্সের বিজয় তুলে ধরেছে। যৌক্তিক বিজ্ঞান বাইবেলের মিথোই-কে রেডিক্যাল নিরীক্ষার অধীনে নিয়ে এসে আবিষ্কার করেছে যে, এর কোনও কোনও দাবি ‘মিথ্যা’। বাইবেলিয় কাহিনীসমূহ কেবলই ‘মিথ’, জনপ্রিয় আলোচনায় এখন যার মানে দাঁড়ায়, ওসব সত্যি নয়। হাইয়ার ক্রিটিসিজম ক্রিশ্চান মৌলবাদীদের পক্ষে জুজুতে পরিণত হবে। কারণ একে ধর্মের উপর বড় ধরনের হামলা মনে হয়েছে, তবে এর একমাত্র কারণ পাশ্চাত্যের জনগণ অতীন্দ্রিয়ের মূল বোধ হারিয়ে ফেলেছিল, তারা ধরে নিয়েছিল যে মতবাদ ও ঐশীগ্রন্থের বিবরণসমূহ লোগোই, যেসব বিবরণ তথ্যগতভাবে সঠিক হওয়ার কথা ও যেসব ঘটনা বৈজ্ঞানিকভাবে তদন্তযোগ্য। কিন্তু বাইবেল সম্পূর্ণ আক্ষরিক অর্থে পাঠ করা যে কতখানি কঠিন সেটা প্রকাশ করে হাইয়ার ক্রিটিসিজম আধুনিক ক্রিশ্চানদের ধর্মবিশ্বাসকে বৈজ্ঞানিক’ করে তোলার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি স্বাস্থ্যকর পাল্টা ভারসাম্যের যোগানও দিতে পারত।
ডারউইনের প্রকল্প ও জেনেসিসের প্রথম অধ্যায়ের বিভিন্ন অমিল তুলে ধরে ডারউইনের আমেরিকান বন্ধু ও সতীর্থ বৈজ্ঞানিক আসা গ্রে (১৮১০-৮৮)-র মতো কিছু ক্রিশ্চান জেনেসিসের আক্ষরিক পাঠের সাথে প্রাকৃতিক নির্বাচনকে খাপ খাওয়ানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। পরে ক্রিয়েশন সায়েন্স নামে পরিচিত হয়ে ওঠা এই প্রকল্পটি জেনেসিসকে বৈজ্ঞানিকভাবে সম্মানজনক করে তোলার জন্যে আরও অনেক দূর অগ্রসর হবে। কিন্তু এটা ছিল আসল সত্যি বাদ দিয়ে যাওয়া, কারণ মিথ হিসাবে বাইবেলের সৃষ্টিকাহিনী প্রাণের বিকাশের ঐতিহাসিক বিবরণ নয় বরং খোদ জীবনের পরম তাৎপর্যের আধ্যাত্মিক প্রতিফলন ছিল; যার সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক লোগোসের বলার মতো কিছুই নেই।
ডারউইন না চাইলেও অরিজিনের প্রকাশনা সত্যিই ধর্ম ও বিজ্ঞানের ভেতর প্রাথমিক সংঘাতের কারণ হয়েছিল। কিন্তু প্রথম গুলি ছোঁড়া হয়েছিল অধিকতর সেক্যুলারিস্টদের তরফ থেকে। ইংল্যান্ডে টমাস এইচ. হাক্সলি (১৮২৫-৯৫) ও মহাদেশে কার্ল ফোগত (১৮১৭–৯৫), লুদভিগ বাকনার (১৮২৪–৯৯), জ্যাকব মোলেস্ট (১৮২২-৯৩) ও আর্নস্ট হেকেল (১৮৩৪-১৯১৯) বহু সফর করে বিপুল সংখ্যক দর্শকের সামনে বিজ্ঞান ও ধর্মকে পরস্পর বেমানান প্রমাণ করে ডারউইনের মতবাদকে জনপ্রিয় করে তোলেন। আসলে তাঁরা ধর্মের বিরুদ্ধে এক ক্রুসেডের প্রচার করছিলেন।
হাক্সলি স্পষ্ট অনুভব করেছিলেন, তাঁর সামনে লড়াই অপেক্ষা করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তিকেই সত্যির একমাত্র মাপকাঠি হতে হবে। মানুষকে মিথলজি ও যৌক্তিক বিজ্ঞানের ভেতর যে কোনও একটাকে বেছে নিতে হবে। এখানে কোনও আপোস হতে পারে না: ‘অজ্ঞাত মেয়াদের সংগ্রামের পর একটার অন্যটিকে গ্রাস করে নিতেই হবে। হাক্সলির কাছে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ ছিল এক নতুন সেক্যুলার ধর্ম; পরিবর্তন ও সম্পূর্ণ অঙ্গীকার দাবি করেছে তা। “বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে, নিজের যুক্তিকে অনুসরণ করো, তোমাকে তা যতদূরে নিয়ে যাক, আর কোনও বিবেচনাকে মাথায় নিয়ো না,’ শ্রোতাদের আর্জি জানিয়েছেন তিনি। ‘আর নেতিবাচকভাবে, বুদ্ধিমত্তার বেলায়, প্রকাশ করা হয়নি বা প্রমাণযোগ্য নয় এমন সিদ্ধান্তকে নিশ্চিত ধরে নিয়ো না।৯৪ লক্ষণীয় সাফল্য লাভ করে নিজেকে আগ্রাসীভাবে সত্যির একক শানাক্তকারী হিসাবে দাবিকারী আধুনিক প্রগতিশীল সংস্কৃতির অভিঘাতের পূর্ণ সমর্থন ছিল হাক্সলির পেছনে। কিন্তু সত্যিকে ‘প্রকাশিত ও প্রমাণযোগ্য’ সীমিত করে ফেলা হয়েছিল; যা ধর্ম বাদেও শিল্পকলা ও সঙ্গীতের সত্যিকে বিসর্জন দেবে। হাক্সলির চোখে অন্য কোনও সম্ভাব্য পথ থাকতে পারে না। যুক্তিই একমাত্র সত্যি, ধর্মের মিথসমূহ অর্থহীন। এটা ছিল রক্ষণশীল সীমাবদ্ধতা থেকে চূড়ান্ত স্বাধীনতা ঘোষণা। যুক্তিকে আর উচ্চ আদালতে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে না। একে নৈতিকতা দিয়ে সীমাবদ্ধ করে রাখা যাবে না, বরং ‘অন্যান্য বিবেচনাকে পরোয়া না করে’ শেষ পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যেতে হবে। মহাদেশের ক্রুসেডাররা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরও বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিল। বাকনারের বেস্টসেলার ফোর্স অ্যান্ড ম্যাটার-খোদ হাক্সলির অপছন্দ আনাড়ী গ্রন্থ-যুক্তি তুলে ধরে যে, মহাবিশ্বের কোনও উদ্দেশ্য নেই, পৃথিবীর সমস্ত কিছুই একটি মাত্র কোষ থেকে উদ্ভুত হয়েছে, কেবল নির্বোধই ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে পারে। কিন্তু এ বইয়ের বিরাট সংখ্যক পাঠক ও হেকেলের ভাষণ শুনতে সমবেত বিপুল দর্শক দেখিয়েছে যে, ইউরোপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বিজ্ঞানের কথা শুনতে চেয়েছে এবং চিরকালের জন্যে ধর্মকে বাতিল করে দিয়েছে।
