সুতরাং, উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ, ইভাঞ্জেলিকালরা আর প্রান্তি কায়িত ও অধিকারবঞ্চিত ছিল না। সেকুলারিস্ট প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করে বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। এবার আমেরিকার সমাজের ক্রিশ্চান রিকনকুইস্তায় নিয়োজিত হয়েছিল তারা, একে কঠোরভাবে প্রটেস্ট্যান্ট রীতিনীতির অধীনে ফিরিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিল। নিজেদের সাফল্যে গর্বিত বোধ করেছে তারা। আমেরিকান সংস্কৃতির উপর অনেপনীয় প্রভাব বিস্তার করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্যুলার সংবিধান সত্ত্বেও এখন যা আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে ঢের বেশি ক্রিশ্চান। ১৭৮০ ও ১৮৬০ সালের ভেতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিশ্চান গোষ্ঠীসমূহের লক্ষণীয় বৃদ্ধি ঘটে, জাতীয় জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারকে অনেকাংশে ছাড়িয়ে গিয়েছিল তা। ১৭৮০ সালে সমাবেশের সংখ্যা ছিল মাত্র ২,৫০০ টি, ১৮২০ সাল নাগাদ তা ১১,০০০ টিতে দাঁড়ায়; এবং ১৮৬০ সাল নাগাদ উল্লেখযোগ্য ৫২,০০০-এ-প্রায় ২১ গুন বৃদ্ধি পায়। তুলনামূলকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ১৭৮০ সালের আনুমানিক চার মিলিয়ন থেকে ১৮২০ সালে দশ মিলিয়নে দাঁড়ায় ও ১৮৬০ সালে দাঁড়ায় ৩১ মিলিয়নে-আটগুনেরও কম বৃদ্ধি।৭ ইউরোপে ধর্মকে ক্রমবর্ধমানহারে প্রতিষ্ঠানের সাথে এক করে দেখা হচ্ছিল। সাধারণ লোক বিকল্প আদর্শের দিকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, কিন্তু আমেরিকায় প্রটেস্ট্যানিজম সাধারণ লোককে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষমতাশালী করে তুলেছিল; এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, ফলে এখন আমেরিকায় এমন একটি জনপ্রিয় আন্দোলন খুঁজে বের করা কঠিন যা কোনওভাবে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয়। ১৮৫০-র দশক নাগাদ আমেরিকায় ক্রিশ্চান ধর্ম ছিল সজীব, ভবিষ্যতের বিজয়ের জন্যে তৈরি বলে মনে হয়েছে।
সম্পূর্ণ ভিন্ন কাহিনী ছিল ইউরোপে। সেখানে জনগণকে আধুনিক বিশ্বের দিকে চালিতকারী প্রধান আদর্শগুলো ছিল সেক্যুলারিস্ট, ধর্মীয় নয়। ক্রমবর্ধমানহারে পরকালের চেয়ে ইহকালের দিকে সাধারণ মানুষের মনোযোগ নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। জর্জ উইলিয়াম ফ্রেডেরিখ হেগেলের (১৭৭০-১৮৩১) রচনায় এই বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি দুয়ে ঈশ্বরকে মাটিতে টেনে নামিয়ে তাঁকে মানুষে পরিণত করেছিলেন। অতিপ্রাকৃতের মাঝে নয়, সম্পূর্ণতার সন্ধান মিলবে এই মাটিতেই; হেগেলের ফেনোমেনোলজি অভ মাইন্ড-এ (১৮০৭) বিশ্বজনীন আত্মা কেবল স্থান ও সময়ের সীমিত অবস্থায় নিজেকে স্থাপন করলেই এর পূর্ণ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে; মানব মনেই তা সবেচেয়ে বেশি পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। সুতরাং, মানবজাতিকেও নিজেদের ঐশী বলে উপলব্ধি করার খাতিরে ঈশ্বরের প্রাচীন দুয়ের ধারণা বিসর্জন দিতে হবে। এই মিথ, অবতারবাদের নতুন ক্রিশ্চান মতবাদকে বহু আধুনিক মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে বিচ্ছেদের একটা প্রতিষেধক হিসাবেও দেখা যেতে পারে। এটা ছিল ঐশী সত্তা হতে বঞ্চিত হয়ে পড়া এক বিশ্বকে আবার পবিত্রকরণের প্রয়াস; এবং দেকার্তে ও কান্টের দর্শনে মানুষের মনের যে ক্ষমতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে, তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করাও। কিন্তু সবার উপরে হেগেলের মিথ আধুনিকতার গতিশীল অভিঘাতও প্রকাশ করেছে। সোনালি যুগের কথা ভাববার কোনও ব্যাপার ছিল না এখানে। হেগেলের বিশ্ব অবিরাম নিজেকে পুনঃসৃষ্টি করছিল। প্রাচীন রক্ষণশীল বিশ্বাস অর্থাৎ, আগেই সবকিছু বলা হয়ে যাবার ধারণার বদলে হেগেল এক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার কথা কল্পনা করেছেন যেখানে মানুষ অতীতের এককালে পবিত্র ও অপরিবর্তনীয় ধারণা ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এই দ্বান্দ্বিকতায় সত্তার প্রতিটি অবস্থাই এর বিপরীতটি নিয়ে আসে; বিপরীত এই সত্তাগুলোর সংঘাত বাধে ও আরও উন্নত সংশ্লেষে সেগুলো সমন্বিত হয়। এরপর আবার সেই একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলে ফিরে যাবার কোনও উপায় নেই, এটা বরং সম্পূর্ণ নতুন ও নজীরবিহীন সত্যির দিকে অবিরাম বিবর্তন।
হেগেলের দর্শনে রক্ষণশীল চেতনাকে অপরিবর্তনীয়ভাবে পেছনে ফেলে আসা আধুনিককালের চালক আশাবাদের প্রকাশ ঘটেছে। তবে অনেকে হেগেল কেন ঈশ্বরের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে গেছেন বুঝতে পারেননি। ধর্ম ও মিথলজিকে কোনও কোনও ইউরোপিয়র কাছে কেবল সেকেলেই নয়, বরং ক্ষতিকর মনে হয়েছিল। আমাদের বিচ্ছিন্নতার বোধকে প্রশমিত করার বদলে এগুলোকে তা আরও জটিল করে তোলে বলে মনে করা হয়েছে। ঈশ্বরকে মানবজাতির বিপরীত সত্তা হিসাবে স্থাপন করে হেগেলের শিষ্য লুদভিগ ফয়েরবাখ (১৮০৪-৭২) যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ‘ধর্ম মানুষকে তার নিজের থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে…ঈশ্বর সম্পূর্ণ, মানুষ অসম্পূর্ণ, ঈশ্বর চিরন্তন, মানুষ ক্ষণস্থায়ী, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, মানুষ দুর্বল।৮৮ কার্ল মার্ক্সের (১৮১৮-৮৩) চোখে, ধর্ম অসুস্থ সমাজের লক্ষণ, এমন এক মাদক যা রোগাক্রান্ত সামাজিক ব্যবস্থাকে সহনীয় করে তোলে ও এই জগৎ থেকে অন্য জগতে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে এর একটি প্রতিষেধক বের করার ইচ্ছা নষ্ট করে ফেলে।৮৯
উঁচু নৈতিক ভিত্তি লাভ করছিল নাস্তিকরা। ১৮১৯ সালে চার্লস ডারউইনের লেখা দ্য অরিজিন অভ স্পিসিজ বাই মিনস অভ নেচারাল সিলেকশন প্রকাশিত হওয়ার পর এটা স্পষ্ট হয়ে যায়। গ্রন্থটি আধুনিক বিজ্ঞানের এক নতুন পর্যায় তুলে ধরেছিল। বেকনের পরামর্শ মোতাবেক তথ্য সংগ্রহের বদলে ডারউইন একটি প্রকল্প তুলে ধরেছেন: পশু, গাছপালা ও মানুষ সম্পূর্ণ আকারে সৃষ্টি হয়নি (বাইবেল যেমনটা বুঝিয়েছে), বরং পরিবেশের সাথে অভিযোজনের ভেতর দিয়ে বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় উন্নত হয়ে উঠেছে। দ্য ডিসেন্ট অভ ম্যান (১৮৭১)-এ ডারউইন প্রস্তাব রাখেন যে, হোমো সেপিয়েন্সরা ওরাংউটান, গরিলা ও শিম্পাঞ্জির আদিপুরুষ একই আদি নরমানব থেকে উদ্ভুত হয়েছে। মৌলবাদী বলয়ে ডারউইনের নাম নাস্তিক্যবাদের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে, কিন্তু অরিজিন-কে ধর্মের উপর আক্রমণ হিসাবে চিন্তা করা হয়নি, বরং তা ছিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের শোভন, সযত্ন ব্যাখ্যা। স্বয়ং ডারউইন অ্যাগনস্টিক ছিলেন, কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সব সময়ই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তিনি। তাসত্ত্বেও অরিজিন ছিল সন্ধিক্ষণ। প্রকাশের দিনই ১৪০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। নিশ্চিতভাবে এটা ও ডারউইনের পরবর্তীকালের কাজ মানুষের আত্ম-মর্যাদা বোধের উপর প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। কোপার্নিকাস মানুষকে বিশ্বজগতের কেন্দ্র থেকে উৎখাত করেছিলেন, দেকার্তে ও কান্ট মানুষকে ভৌত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করেন, আর এবার ডারউইন মত প্রকাশ করলেন যে মানুষ স্রেফ আরেকটা পশুমাত্র। ঈশ্বরের হাতে বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়নি তারা, বরং বাকি সমস্ত কিছুর মতো বিবর্তিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় যেন ঈশ্বরের কোনও স্থান নেই বলে মনে হয়েছে, ‘রক্তাক্ত থাবা ও দাঁতঅলা’ পৃথিবীর কোনও ঐশী লক্ষ্য নেই।
