আন্দোলনকে অসম্ভব ও বিচিত্র ঠেকলেও মিলারবাদ আশু আবেদন সৃষ্টি করতে পেরেছিল। প্রায় ৫০,০০০ আমেরিকান নিশ্চিত মিলারবাদীতে পরিণত হয়েছিল, অন্যদিকে আরও হাজার হাজার সেভাবে যোগ না দিলেও সহানুভূতিশীল ছিল।৭৯ অবশ্য অনিবার্যভাবে বাইবেলের মিথোসকে আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করার বিশেষ নজীরে পরিণত হয়েছিল মিলারবাদ। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ১৮৪৩ সালে ক্রাইস্ট ফিরে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং মিলারবাদ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। তাসত্ত্বেও এই ব্যর্থতার মানে এই ছিল না যে মিলেনিয়ালিজমের অবসান ঘটেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তা প্রধান আবেগে পরিণত হয় এবং এখনও অব্যাহত আছে। ১৮৪৩ সালের ‘মহা হতাশা’ থেকে সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্টের মতো অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো আবির্ভূত হয়। এরা প্রলয়বাদী সময়সূচিকে সমন্বিত করে। নিখুঁত পূর্বাভাস এড়িয়ে গিয়ে নতুন আমেরিকার নতুন প্রজন্মগুলোকে ইতিহাসের আসন্ন অবসানের অপেক্ষায় থাকতে সক্ষম করে তুলেছে তারা।
প্রথম প্রথম এই নতুন কর্কশ ও গণতান্ত্রিক ক্রিশ্চানিটি দরিদ্র ও বেশি অশিক্ষিত শ্রেণীর ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ১৮৪০-র দশকে আমেরিকান ধর্মের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব চার্লস ফিনি (১৭৯২–১৮৭৫) একে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে তুলে আনেন। এভাবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি একে গস্পেলের আক্ষরিক পাঠের উপর নির্ভরশীল ও সেক্যুলার ধারণাকে ক্রাইস্টের উপর বর্তানোর ইচ্ছুক এই ‘ইভাঞ্জেলিকাল’ ক্রিশ্চানিটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ধর্মবিশ্বাসে পরিণত করতে সাহায্য করেন তিনি।° ফিনি প্রাচীন পয়গম্বরদের অমার্জিত, বর্বর পদ্ধতি কাজে লাগান, কিন্তু আইনবিদ, ডাক্তার, ও বণিকদের প্রত্যক্ষভাবে প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্ততা ছাড়া ক্রাইস্টকে উপলব্ধি করার তাগিদ দেন, নিজেদের মতো করে ভাবতে ও বিভিন্ন গোত্রের বিজ্ঞ ধর্মবেত্তাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বলেন। মধ্যবিত্ত শ্রোতাদের সমাজের সামাজিক সংস্কারে অন্যান্য ইভাঞ্জেলিকালদের সাথেও যোগ দিতে বলেন।৮১
বিপ্লবের পর রাষ্ট্র ধর্ম হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, একই সময়ে সকল গোষ্ঠীর ক্রিশ্চান রাষ্ট্র থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে। মিলেনিয়াম বয়ে আনতে ব্যর্থ বিপ্লব নিয়ে স্বপ্নভঙ্গ ও মোহমুক্তির ব্যাপার ছিল। প্রটেস্ট্যান্টরা ডেইস্ট রিপাবলিকান সরকারের থেকে দূরে থেকে নিজস্ব ধর্মীয় ‘স্থান’ সংরক্ষণের উপর জোর দিতে শুরু করে। ফেডারেল প্রতিষ্ঠানের অংশ নয়, তারা ছিল ঈশ্বরের সম্প্রদায়। প্রটেস্ট্যান্টরা তখনও বিশ্বাস করছিল যে আমেরিকার ধার্মিক জাতি হওয়া উচিত এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে ক্রমবর্ধমানহারে অরাজনৈতিক বিবচনা করা হচ্ছিল;৮২ সমাজের মুক্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্র থেকে স্বাধীনভাবে ১৮২০-র দশকে দ্বিতীয় মহাজারণের পর উত্তরের রাজ্যগুলোয় গড়ে ওঠা বিভিন্ন চার্চ, স্কুল ও সংস্থায় কাজ করাই শ্রেয়তর। ক্রিশ্চানরা একটি ভালো পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করতে থাকে। তারা দাসপ্রথা ও মদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায় ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর উপর নির্যাতন বন্ধের দাবি জানায়। মিলারবাদীদের অনেকেই মিতাচার, দাসপ্রথা উচ্ছেদ ও নারীবাদী সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।৩ এসব কিছুর ভেতর নিশ্চিতভাবেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উপাদান ছিল। এছাড়া প্রটেস্ট্যান্টদের মিতব্যায়িতা, সংযম ও পরিষ্কার জীবন যাপনের গুণের উপর গুরুত্ব আরোপের ভেতর অপ্রীতিকরভাবে সংরক্ষণবাদের অনুপ্রেরণাও ছিল। প্রটেস্ট্যান্টরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাথলিকদের বিপুল অভিবাসনে অস্বস্তিতে ভুগছিল। বিপ্লবের সময় আমেরিকা প্রটেস্ট্যান্ট দেশ ছিল। ক্যাথলিকরা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ। কিন্তু ১৮৪০-র দশক নাগাদ আমেরিকায় ক্যাথলিকের সংখ্যা দাঁড়ায় ২.৫ মিলিয়নেরও বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রোমান ক্যাথলিক মতবাদ বৃহত্তম ক্রিশ্চান গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।৮৪ পোপকে দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টিক্রাইস্ট ভেবে আসা কোনও দেশের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পরিবর্তন ছিল এটা। ইভাঞ্জেলিকাল প্রয়াসের কিছু কিছু নিশ্চিতভাবেই এই ক্যাথলিক প্রভাবকে ঠেকানোর প্রয়াস ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, মিতাচার নতুন পোলিশ, আইরিশ ও ইতালিয় আমেরিকানদের মদপানের অভ্যাসের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে প্রচারিত হয়েছিল।৮৫
তাসত্ত্বেও এইসব ইভাঞ্জেলিকাল সংস্কার আন্দোলনসমূহ ইতিবাচক ও আধুনিকায়নকারীও ছিল। প্রতিটি মানব সন্তানের গুরুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। সক্রিয়ভাবে তারা সাম্যবাদের সমর্থন করে গেছে যাতে, উদাহরণ স্বরূপ, উত্তরের রাজ্যগুলোতে দাসপ্রথা অসহনীয় করে তুলতে সাহায্য করা যায়, কিন্তু দক্ষিণে নয়; দ্বিতীয় মহাজাগরণের বলতে গেলে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গিয়েছিল তা, গৃহযুদ্ধে অনেক পরেও তা প্রাক আধুনিক আভিজাত্যবাদী সামাজিক কাঠামো ধরে রেখেছিল।৮৬ সংস্কার আন্দোলনগুলো সাধারণ মানুষকে ক্রিশ্চান প্যাকেজে অন্তত উত্তরে অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকারসমূহকে ঠাঁই করে দিতে সাহায্য করেছে। ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিশ্চানদের সূচিত নারীবাদ ও শাস্তিমূলক এবং শিক্ষার জন্যে আন্দোলনগুলোও প্রগতিশীল ছিল। খোদ সংস্কারবাদী দলগুলোও মানুষকে আধুনিক চেতনা ধারণে সাহায্য করেছে। সদস্যরা কোনও সংগঠনে যোগ দেওয়ার সচেতন, স্বেচ্ছামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কীভাবে পরিকল্পনা, সংগঠন করতে হয় এবং আধুনিক ও যৌক্তিক উপায়ে একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়িত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে হয় সেটা শিখেছে। শেষ পর্যন্ত ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিশ্চানরা হুইগ পার্টির (ব্যাপক দিক থেকে পরবর্তীকালের রিপাবলিকান পার্টি যার উত্তরাধিকারী) মেরুদণ্ড গড়ে তুলবে, অন্যদিকে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী (ওল্ড লাইটস ও ক্যাথলিকরা) ডেমোক্রেটিক পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়বে। হুইগ/রিপাবলিকানরা আলোকনের বদলে ধার্মিক গুণাবলীর ভিত্তিতে আমেরিকায় একটি ‘ন্যায়নিষ্ঠ সাম্রাজ্য’ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল।
