দাউ, স্টোন ও জোসেফ স্মিথের প্রতি বিতৃষ্ণার সাথে নজর দিয়েছে প্রতিষ্ঠান; তাদের আধুনিক বিশ্বকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই এমন বক্তৃতাজীবী মনে করেছে। যাজকদের বর্বোরোচিত পশ্চাদপসরণকারী, আদিম হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর রেলিক্স মনে হয়েছে। মূলধারার যাজক ও আমেরিকান অভিজাত গোষ্ঠীর পরবর্তীকালের এই পয়গম্বরদের প্রতি সাড়ার দেওয়ার সাথে আজকের দিনে উদারপন্থী ও সেক্যুলারিস্টরা যেভাবে সাড়া দিয়ে থাকে তার সাথে খুব একটা অমিল নেই। কিন্তু তাঁদের নাকচ করে দিয়ে ভুল করেছিলেন তারা। দাউ, জোসেফ বা স্মিথের মতো ব্যক্তিদের গ্রাম্য-মেধাবী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।৭৪ তাঁরা গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীনতার মতো আধুনিক অধর্মসমূহকে এমন এক বাগধারায় সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম ছিলেন যাতে তারা বুঝে সেটাকে আপন করে নিতে পারে। আমেরিকায় জন্ম নিতে চলা নতুন বিশ্বে আবশ্যক হয়ে উঠতে যাওয়া এইসব নতুন আদর্শ এক পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে কম সুবিধাপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল যা সেগুলোকে অর্থ যুগিয়েছে এবং উত্তাল ও বিপ্লবী উত্থানপতনের এই সময়ে প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা যুগিয়েছে। নতুন পয়গম্বরগণ স্বীকৃতি দাবি করেছেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠিত অভিজাত গোষ্ঠীর পরিহাসের শিকার হলেও সাধারণ জনগণের কাছে তাঁদের সমাদর দেখিয়েছে যে প্রকৃত প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা। প্রথম মহাজাগরণের যাজকদের মতো ব্যক্তিগত ধর্মান্তরে সন্তুষ্ট ছিলেন না তাঁরা, বরং সমাজের পরিবর্তন চেয়েছেন। জনগণকে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে সমবেত করার ক্ষমতা রাখতেন তাঁরা, জনপ্রিয় সঙ্গীত ও প্রভাবকে নিপুণ করে তুলতে নতুন যোগাযোগ মাধ্যম কাজে লাগাতেন। ফাউন্ডিং ফাদারদের মতো উপর থেকে আধুনিক রীতিনীতি চাপিয়ে দেওয়ার বদলে তাঁরা জমিন থেকে উপর দিকে গড়ে তুলেছেন ও অনেকটা যুক্তিবাদী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায়ে বিদ্রোহ সংগঠিত করেছেন। দারুণভাবে সফল ছিলেন তাঁরা। উদাহরণ স্বরূপ, এলিয়াস স্মিথ, ও’কেলি, ক্যাম্পবেল ও স্টোন প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠীগুলো ক্রাইস্টের ‘ডিসাইপল’দের সমবেত করতে সম্মিলিত হয়েছিল। ১৮৬০ সাল নাগাদ ডিসাইপলদের মোট সদসসংখ্যা ২০০,০০০-এর দাঁড়ায় এবং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চম বৃহত্তম প্রটেস্ট্যান্ট গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল।৫ মরমনদের মতো ডিসাইপলরা এমন একটা জনপ্রিয় অসন্তোষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পেরেছিল প্রতিষ্ঠান যাকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
কিন্তু আলোকনের বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে রেডিক্যাল ক্রিশ্চান বিদ্রোহের আরও বেশি গভীর প্রভাব ছিল। দ্বিতীয় মহাজাগরণ বহু আমেরিকানকে ফাউন্ডিং ফাদারদের ক্লাসিকাল প্রজাতন্ত্র থেকে আরও বেশি অশ্লীল গণতন্ত্র ও রূঢ় ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দিকে টেনে নিয়ে গেছে যা আজকের আমেরিকান সংস্কৃতিকে বৈশিষ্ট্যায়িত করে। শাসক অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে উল্লেখযোগ্য বিজয় লাভ করেছে তারা। আমেরিকান চেতনায় এক ধরনের টানাপোড়েন ছিল যা যুক্তির কালের শীতল রীতিনীতির চেয়ে বরং উনবিংশ শতকের লোকানুবর্তী ও প্রতি-বুদ্ধিজীবীবাদের কাছাকছি। দ্বিতীয় মহাজাগরণের শোরগোলময়, দর্শনীয় পুনর্জাগরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃথক রাজনৈতিক স্টাইলের উপর স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে, যাদের গণমিছিল, অনিরুদ্ধ অনুভূতি ও লোকদেখানো ক্যারিশমা ইউরোপিয়দের কাছে দারুণ বিস্ময়কর ছিল। আজকের বহু মৌলবাদী আন্দোলনের মতো দ্বিতীয় মহাজাগণের এই পয়গম্বরগণ নতুন রাষ্ট্রে নিজেদের যারা অধিকার বঞ্চিত ও শোষিত মনে করেছে অধিকতর সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাত গোষ্ঠীর কানে তাদের কণ্ঠস্বর পৌছাতে সাহায্য করেছেন। তাঁদের আন্দোলন জনগণকে মার্টিন লুথারের ভাষায় ‘কেউ একজন হওয়ার অনুভূতি’৭৬ দিয়েছিল, অনেকটা আজকের দিনে মৌলবাদী গ্রুপগুলো যেমন করে থাকে। মৌলবাদী আন্দোলনের মতো এই নতুন গোষ্ঠীগুলোর প্রত্যেকে আদিম ব্যবস্থার শরণাপন্ন হয়েছে, ধর্মবিশ্বাসকে নতুন করে গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল তারা; সবাই ঐশীগ্রন্থের দিকে সম্পূর্ণ নতুন চোখে নির্ভর করেছে, একে তারা আক্ষরিক ও প্রায়শঃই লঘু করে ব্যাখ্যা করেছে। স্বৈরাচারী প্রবণতাও দেখিয়েছে তারা। উনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকায় এটা ছিল একটা বৈপরীত্য, উনবিংশ শতকের শেষের দিকে মৌলবাদী আন্দোলনসমূহের মতো স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও সমতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা বিপুল সংখ্যক লোককে আভাসে ধর্মীয় বক্তৃতাবাজদের মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত এতসব কথাবার্তায় জোসেফ স্মিথ কার্যত এক ধর্মীয় স্বৈরাচার সৃষ্টি করেছিলেন এবং আদি চার্চের সাম্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক আদর্শের প্রতি তারিফ সত্ত্বেও আলেকজান্দার ক্যাম্পবেল পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন, দলের লোকদের লৌহমানবের মতো শাসন করেছেন তিনি।
দ্বিতীয় মহাজাগরণ মানুষ তাদের সমাজকে আধুনিকায়নের কষ্টকর উত্থানপতনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কী ধরনের সমাধান সাধারণ জনগণ আকর্ষণীয় বোধ করে সেটাই তুলে ধরে। আধুনিক মৌলবাদীদের মতো দ্বিতীয় মহাজাগরণের পয়গম্বরগণ শাসক গোষ্ঠীর বিজ্ঞ যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিলেন এবং অধিকতর ধর্মীয় পরিচয়ের উপর জোর দিয়েছেন। একই সময়ে তাঁরা দেকার্তে, নিউটন বা জন লকের রচনা পড়ার সুযোগ পায়নি এমন মানুষের কাছে আধুনিকায়নের রীতিনীতি বোধগম্য করে তুলেছেন। এই আমেরিকান পয়গম্বরদের ভবিষদ্বাণীসুলভ বিদ্রোহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একাধারে স্থায়ী ও সফল হয়েছিল, এর মানে, বর্তমানে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অধীন সমাজগুলোয় আধুনিক মৌলবাদী আন্দোলনসমূহ স্বল্পস্থায়ী বা বিদায়ী ‘পাগলামি’ বলে আশা করা উচিত হবে না আমাদের। নতুন আমেরিকান গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিষ্ঠানের চোখে অদ্ভুত ঠেকে থাকতে পারে, কিন্তু এগুলো আবিশ্যিকভাবে আধুনিক ও নতুন বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এটা নিশ্চিতভাবেই নিউ ইয়র্ক কৃষক উইলহেম মিলারের প্রতিষ্ঠিত মিলেনিয়াল আন্দোলানের বেলায় সত্যি; তিনি বাইবেলিয় ভবিষ্যদ্বাণী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাঠ করে সতর্ক হিসাবের পর ১৮৩১ সলে প্রকাশিত একটি প্যামফ্লেটে ‘প্রমাণ’ করেছিলেন যে ক্রাইস্টের দ্বিতীয় আগমন ঘটবে ১৮৪৩ সালে। মিলার বাইবেলকে চিরন্তন বাস্তবতার পৌরাণিক, প্রতীকী বিবরণ হিসাবে না দেখে আবিশ্যিকভাবেই আধুনিক দৃষ্টিতে দেখেছেন। মিলার ধরে নিয়েছিলেন, বুক অভ রেভেলেশনের এই ধরনের বিবরণ আসন্ন ঘটনাবলীর নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী, যা বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক নির্ভুলতার সাথে হিসাব কষে বের করা সম্ভব। লোকে এখন তথ্যের জন্যে টেক্সট পাঠ করছিল। সত্যকে অবশ্যই যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক প্রকাশের উপযুক্ত হতে হবে। মিলার ঐশীগ্রন্থের মিথোসকে এমনভাবে দেখছিলেন যেন তা লোগোস; যাকে তিনি ও তাঁর সহকারী জোশুয়া হাইনস মিলারের অনুসন্ধানের পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক প্রকৃতি বলে চাপ দিচ্ছিলেন। আন্দোলন গণতান্ত্রিকও ছিল: যেকেউ নিজে বাইবেলের ব্যাখ্যা করতে পারে। মিলার অনুসারীদের তাঁর হিসাব চ্যালেঞ্জ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন, নিজস্ব তত্ত্ব খাড়া করতে বলেছেন।
