বিশেষত সীমান্ত এলাকায় এমনি অনুভূতি ছিল জোরাল, যেখানে সাধারণ মানুষ রিপাবলিকান সরকারের হাতে অপদস্থ হয়েছে বলে মনে করেছে। ১৭৯০ দশক নাগাদ মোটামুটি ৪০ শতাংশ আমেরিকান মাত্র তিরিশ বছর আগে শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদীদের বসতি স্থাপিত হওয়া এলাকায় বাস করত। সীমান্তবাসীরা শাসক অভিজাত গোষ্ঠীর উপর অসন্তুষ্ট বোধ করছিল, ওদের কষ্টের ভাগিদার ছিল না তারা, কিন্তু ব্রিটিশদের মতোই উচ্চহারে ওদের উপর কর আরোপ করেছে এবং পূর্ব উপকূলীয় আয়েস ও পরিমার্জিত সভ্যতা ছেড়ে আসার কোনও ইচ্ছা ছাড়াই সীমান্ত এলাকার জমিজিরাত বিনিয়োগের জন্যে কিনে নিচ্ছিল। তারা এক নতুন ধরনের যাজকের বক্তব্যে কান পাততে ইচ্ছুক হয়ে উঠেছিল যারা দ্বিতীয় মহাজাগরণ নামে পরিচতি পুনর্জাগরণ উস্কে দিতে সাহায্য করেছে। প্রথমটির চেয়ে রাজনৈতিকভাবে ঢের বেশি চরম ধরনের ছিল এটা। এইসব পয়গম্বর কেবল আত্মাকে রক্ষার প্রশ্নে উদ্বিগ্ন ছিলেন না, বরং এমনভাবে সমাজ ও ধর্মকে রূপ দিতে চেয়েছিলেন যা ফাউন্ডারদের কল্পিত যেকোনও কিছু থেকে ভিন্ন।
নব্য পুনর্জাগরণবাদীরা ইয়েল ও অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা জনাথান এডওয়ার্ডস ও জর্জ হুইটফিল্ডের মতো পণ্ডিত ছিলেন না। একাডেমিয়াকে ঘৃণা করতেন তাঁরা, জোর দিয়ে বলতেন ধর্মতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের কাছে নতজানু না হয়ে ক্রিশ্চানদের নিজেদের মতো করে বাইবেল ব্যাখ্যা করার অধিকার আছে। এই পয়গম্বরগণ সংস্কৃত মানুষ ছিলেন না; প্রচারণার সময় তাঁরা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় কথা বলতেন, প্রায়শঃই জাগতিক রসিকতা আর খিস্তিখেউরের সাথে অঙ্গভঙ্গি করতেন। তাঁদের বয়ান শোভন ও অলঙ্কারিক নয়, বরং শোরগোলময়, উচ্ছৃঙ্খল ও দারুণভাবে আবেগময় ছিল। তাঁরা এক ধরনের জনপ্রিয় কেতায় ক্রিশ্চান ধর্মকে রূপ দিচ্ছিলেন যা কিনা যুক্তির কালের পরিমার্জিত রীতিনীতি থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে। মশাল মিছিল আর জনসভা করেছেন তাঁরা, শহরের বাইরে বিশাল তাঁবু খাঁটিয়েছেন, যাতে পুনর্জাগরণ এক বিশাল ক্যাম্পসাইটের রূপ নিয়েছিল। গস্পেল সঙ্গীতের নতুন ধারা শ্রোতাদের পরমানন্দে পৌছে দিত, ফলে তারা কাঁদত, ভীষণভাবে সামনে পেছনে আন্দোলিত হত আর আনন্দে চিৎকার জুড়ে দিত। ধর্মকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার বদলে পয়গম্বরগণ স্বপ্ন ও দিব্যদর্শন, নিদর্শন ও অলৌকিক ঘটনার উপর নির্ভর করেছেন-আলোকন যুগের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকগণ যেসব বিষয়ের নিন্দা করেছেন। তারপরেও জেফারসনপন্থীদের মতো, রক্ষণশীল কায়দায় অতীতকে প্রজ্ঞার আধার হিসাবে দেখতে অস্বীকার গেছেন তাঁরা। আধুনিক ছিলেন তাঁরা। জনগণের প্রাজ্ঞ ট্র্যাডিশনে আটকে থাকা উচিত হবে না। ঈশ্বরপুত্রের স্বাধীনতা রয়েছে তাদের; কাণ্ডজ্ঞানের ভেতর দিয়ে ঐশীগ্রন্থের সাধারণ অর্থের উপর ভিত্তি করে নিজেরাই সত্য জানতে পারবে। অভিজাতগোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিত যাজকদের বিরুদ্ধে জোট পাকিয়েছেন এই নতুন যাজকগোষ্ঠী। নিউ টেস্টামেন্টের সাম্যবাদী প্রবণতার উপর জোর দিয়েছেন তাঁরা, যেখানে বলা হয়েছে যে ক্রিশ্চান কমনওয়েলথে শেষজন হবে প্রথম ও প্রথমজন শেষ। ঈশ্বর তাঁর অন্তর্দৃষ্টি পাঠিয়েছেন দরিদ্র ও নিরক্ষরদের কাছে: জেসাস ও তাঁর শিষ্যদের কোনও কলেজের ডিগ্রি ছিল না।
ধর্ম ও রাজনীতি ছিল একই দর্শনের দুটি অংশ। ঝাঁকড়া চুল আর ক্ষ্যাপা চকচকে চোখে লরেনসো দাউকে আধুনিক কালের জন দ্য ব্যাপ্টিস্টের মতো লাগত। ঝড়কে তিনি ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ কাজ হিসাবে দেখতেন, অন্তর্দৃষ্টির জন্যে স্বপ্ন ও দিব্যদর্শনের উপর নির্ভর করতেন। আবহাওয়ার কোনও পরিবর্তন আসন্ন প্রলয়ের কোনও রকম ‘নিদর্শন’ হয়ে থাকতে পারে; ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার ক্ষমতা থাকার দাবি করেছিলেন তিনি। মোট কথা তাঁকে মনে হত আধুনিকতার নতুন বিশ্বের ঠিক বিপরীত। কিন্তু তারপরেও তিনি জেফারসন বা টমাস পেইনের উদ্ধৃতি দিয়েই সারমন শুরু করতেন এবং প্রকৃত আধুনিকতাবাদীর মতো জনগণকে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার শেকল ছুঁড়ে ফেলার, পণ্ডিত প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব অস্বীকার ও নিজেদের মতো করে ভাবনা চিন্তা করার তাগিদ দিতেন। সংবিধানে যাই বলা হয়ে থাকুক না কেন, নতুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম ও রাজনীতি একই মুদ্রার দুই পিঠ বলে মনে হচ্ছিল, একটার সাথে অন্যটাকে সহজেই মিলিয়ে দেওয়া যেত। এভাবে এলিয়াস স্মিথ প্রথম জেফারসনের প্রেসিডেনশাল প্রচারণার সময় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, তিনি তখন রেডিক্যাল সাম্যবাদীতে পরিণত হন। কিন্তু এরপরই নতুন ও গণতান্ত্রিক চার্চ প্রতিষ্ঠা করতে অগ্রসর হন তিনি। একইভাবে জেমস ও’কেলি বিপ্লবে যুদ্ধ করেছিলেন, ব্রিটিশদের হাতে বন্দিত্ব বরণ করেছেন। আগাগোড়া রাজনৈতিক ছিলেন তিনি, অধিকতর সমান চার্চ চাইতেন ও নিজস্ব ‘রিপাবলিকান মেথডিস্ট’ চার্চ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মূল ধারা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। বার্টন স্টোন প্রেসবিটারিয়ানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তাঁর বিচ্ছেদকে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ আখ্যায়িত করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভকারী আলেকজান্দার ক্যাম্পবেল (১৭৮৮-১৮৬৬) আমেরিকায় অভিবাসনের পর তাঁর স্কটিশ প্রেসবিটারিয়ান মতবাদ ত্যাগ করেছিলেন এমন একটি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যা সাম্যবাদী আদিম চার্চের খুব কাছাকাছি ছিল।২ আরও বেশি রেডিক্যাল ছিলেন জোসেফ স্মিথ (১৮০৫-৪৪)। বাইবেল পাঠ করে সন্তুষ্ট হতে পারেননি তিনি, বরং সম্পূর্ণ নতুন এক ঐশীগ্রন্থ আবিষ্কারের দাবি তুলেছিলেন। দ্য বুক অভ মরমন ছিল উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রাঞ্জল সামাজিক প্রতিবাদ; ধনী, শক্তিশালী ও শিক্ষিতদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রত্যাখ্যান সূচিত করেছিল।৩ স্মিথ ও তাঁর পরিবার প্রায় দুস্থ দশায় বাস করেছিলেন, সাহসী নতুন প্রজাতন্ত্রে তাদের কোনও স্থান নেই বলে ধরে নিয়েছিলেন তাঁরা। প্রথম মরমন দীক্ষিতরাও সমান দরিদ্র, প্রান্তিকায়িত ও বেপরোয়া ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক্সোডাস ও প্রতীকী প্রত্যাখানে প্রস্তুত ছিল তারা। মরমনরা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল-প্রথমে ইলিনয়ে এবং শেষে ইউটাহয়।
