অবশ্য বৈপরীত্যমূলকভাবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নতুন সেক্যুলারিস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবলভাবে ক্রিশ্চান রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৭৮০-র দশক এবং ১৭৯০-র দশকে আরও বেশি করে সমস্ত চার্চ নতুন সমৃদ্ধির অভিজ্ঞতা লাভ করে ও ফাউন্ডিং ফাদারদের আলোকন আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। এবার আমেরিকান স্বাধীনতাকে পবিত্র করণ করে তারা: নতুন প্রজাতন্ত্রকে ঈশ্বরের সাফল্য বলে যুক্তি দেখায় তারা। বিপ্লবী লড়াই স্বর্গের বিরুদ্ধে নরকের আদর্শ ছিল কেবল প্রাচীন ইসরায়েলই ইতিহাসে এমন প্রত্যক্ষ স্বর্গীয় হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। সংবিধানে ঈশ্বরের নাম উল্লেখ না হয়ে থাকতে পারে, তীর্যক ভাষায় উল্লেখ করেছেন টিমোথি ডিউইট, কিন্তু ছাত্রদের তাগিদ দিয়েছেন, ‘তোমাদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকাও [তাহলেই]…মিশরে ইসরায়েল জাতিকে দেখানো স্বর্গীয় প্রতিরক্ষা ও নিস্তারের তুলনায় কম মহান ও বিস্ময়কর প্রমাণ দেখবে না।’৬৪ যাজকগোষ্ঠী আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছিল, আমেরিকার জনগণ আরও ধার্মিক হয়ে উঠবে; সীমানার বিস্তারকে রাজ্যের আগমনের আভাস হিসাবে দেখেছে তারা। গণতন্ত্র মানুষকে সার্বভৌম করে তুলেছিল, সুতরাং নতুন রাজ্যসমূহকে জনপ্রিয় শাসনের সহজাত বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে তাদের আরও ধার্মিক হয়ে উঠতে হবে। আমেরিকান জনগণকে অবশ্যই রাজনৈতিক নেতাদের অধার্মিক ‘ডেইজম’ থেকে রক্ষা করতে হবে। চার্চের লোকেরা ‘ডেইজম’কে শয়তানি শত্রু হিসাবে দেখেছে, শিশুরাষ্ট্রের সব ধরনের ব্যর্থতার দায় এর উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। ডেইজম, জোরের সাথে বলেছেন তারা, নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুবাদের বিকাশ ঘটাবে; জেসাস ক্রাইস্টের বদলে এটা প্রকৃতি ও যুক্তির পুজা করেছে। “বাভারিয়ান ইল্লিউমিনাতি’ নামে এক রহস্যময় গুপ্ত সংগঠন থেকে ষড়যন্ত্রের ভীতির বিভ্রম বিকাশ লাভ করে; এরা নাস্তিক ও ফ্রিম্যাসন ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিশ্চান ধর্মকে বিতাড়িত করার প্রয়াস পাচ্ছিল। ১৮০০ সালে টমাস জেফারসন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় দ্বিতীয়বারের মতো অ্যান্টিডেইস্ট আন্দোলন হয়, এই আন্দোলন জেফারসন ও ঈশ্বরবিহীন ফরাসী বিপ্লবের নাস্তিক্যবাদী ‘জ্যাকোবিনদের’ ভেতর একটা সম্পর্ক আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে।
নতুন রাজ্যসমূহের ঐক্য ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। আমেরিকানরা-সেক্যুলারিস্ট ও প্রটেস্ট্যান্ট-উভয়ই নতুন জাতির জন্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন আশা লালন করেছিল। দুটোই সমানভাবে স্থায়ী প্রমাণিত হয়েছিল। আমেরিকানরা তখনও তাদের সংবিধানকে সম্মান ও ফাউন্ডিং ফাদারদের শ্রদ্ধা করছিল, কিন্তু আমেরিকাকে ‘ঈশ্বরের নিজ রাষ্ট্র’ হিসাবেও দেখেছে তারা; আমরা যেমন দেখব, কোনও কোনও প্রটেস্ট্যান্ট ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’কে প্রায় শয়তানি ধরনের অশুভ বিবেচনা করা অব্যাহত রাখবে। বিপ্লবের পর জাতি তিক্তভাবে বিভক্ত ছিল। সংস্কৃতি কী হওয়া উচিত সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমেরিকানদের অভ্যন্তরীণ বিবাদে জাড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। কার্যত উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোতে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ সংঘটিত করেছিল তারা। বহু কষ্ট ও সাহসের সাথে আমেরিকানরা অতীতকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে; একটি পরিবর্তনকারী সংবিধান রচনা করেছিল তারা, একটি নতুন জাতির জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু চাপ, টানাপোড়েন ও বৈপরীত্য জড়িত ছিল তাতে। জনগণ তখনও ঠিক করে উঠতে পারছিল না কোনও শর্তে তারা আধুনিক বিশ্বে প্রবেশ করবে, কম সুবিধাপ্রাপ্ত উপনিবেশবাসীদের অনেকেই অভিজাত আলোকন গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত ছিল। ব্রিটিশদের পরাস্ত করার পর তখনও সাধারণ আমেরিকানদের বিপ্লব কী অর্থ বহন করে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। তাদের কি ফাউন্ডারদের শীতল, মার্জিত যুক্তিবাদ মেনে নিতে হবে নাকি অধিকতর কর্কশ ও বেশি জনপ্রিয় প্রটেস্ট্যান্ট পরিচয় বেছে নেবে?
ফাউন্ডিং ফাদার ও মূলধারার চার্চের যাজকগোষ্ঠী একটি আধুনিক, সেক্যুলার প্রজাতন্ত্র সৃষ্টিতে পরস্পরের সহযোগিতা করেছিলেন, কিন্তু উভয়ই তখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়ে প্রাচীন রক্ষণশীল বিশ্বের মানুষ ছিলেন। তাঁরা ছিলেন অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত গোষ্ঠী। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, আলোকিত রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে জাতিকে উপর থেকে নেতৃত্ব দান করা তাঁদের দায়িত্ব। নিচ থেকে পরিবর্তন আসার কথা ভাবেননি তাঁরা। তখনও মহান ব্যক্তিদের হাতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধিত হওয়ার কথা ভেবেছেন, যাঁরা অতীতের পয়গম্বরদের মতো মানবজাতির পথনির্দেশক হিসাবে কাজ করেন ও ইতিহাস ঘটতে বাধ্য করেন। তারা তখনও বুঝতে পারেননি যে, একটা সমাজ অনেক সময় নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়ায়ও সামনে অগ্রসর হতে পারে: পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিসমূহ সবচেয়ে কার্যকর নেতাদের পরিকল্পনা ও প্রকল্প বিনাশ করে দিতে পারে।৬৭ ১৭৮০ ও ১৭৯০-র দশকে গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়ে ঢের আলোচনা হয়েছে। জনগণের কতখানি ক্ষমতা থাকা উচিত? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস উচ্ছৃঙ্খল শাসনের দিকে চালিত করতে পারে ও ধনীদের সম্পদ হ্রাস করতে পারে এমন যেকোনও রাজনীতির ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন।৬৮ কিন্তু অধিকতর চরমপন্থী জেফারসনবাদীরা অভিজাত গোষ্ঠী কীভাবে বহুজনের পক্ষে কথা বলতে পারে সেটা জানতে চেয়েছে। অ্যাডামস সরকারের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে তারা এবং যুক্তি দেখিয়েছে যে, জনগণের কথা অবশ্যই শুনতে হবে। বিপ্লবের সাফল্য বহু আমেরিকানকে এক ধরনের ক্ষমতায়নের বোধ দিয়েছিল; এটা তাদের দেখিয়ে দিয়েছিল যে প্রতিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষ পতনযোগ্য এবং কোনওভাবেই অপরাজেয় নয়। দৈত্যকে আর বোতলে ভরে রাখা সম্ভব ছিল না। জেফারসনপন্থীরা বিশ্বাস করত যে, সাধারণ জনগণেরও ফিলোসফদের প্রচারিত স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করা উচিত। নতুন পত্রপত্রিকায় ডাক্তার, আইনজীবী, যাজককুল ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের পরিহাস করা হত। এইসব তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞ’দের যেন কেউ বিশ্বাস না করে। আইন, ওষুধ বিজ্ঞান ও ধর্মের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ব্যাপার সকলের নাগালে থাকা হওয়া উচিত। ৬৯
