কিন্তু চার্চের লোকেরা রাজনীতিকে সেক্যুলারাইজ করে থাকলেও সেক্যুলার নেতৃবৃন্দ ক্রিশ্চান ইউটোপিয়বাদের ভাষা ব্যবহার করেছেন। জন অ্যাডামস আমেরিকার বসতিকে গোটা মানবজাতির আলোকনের জন্যে ঈশ্বরের পরিকল্পনা মনে করেছেন।৫৫ টমাস পেইন নিশ্চিত ছিলেন যে, ‘পৃথিবীর নতুন করে শুরু করার মতো ক্ষমতা আমাদের আছে। সেই নোয়াহর আমল থেকে এই পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি আর সৃষ্টি হয়নি। নতুন বিশ্বের জন্মলগ্ন এলো বলে।৫৬ কেবল নেতৃবৃন্দের প্রয়োগবাদ সাধারণ লোকজনকে অজানা ভবিষ্যতের পথে যাত্রা ও মাতৃভূমির সাথে সম্পর্কচ্ছেদে সাহায্য করতে পারেনি। ক্রিশ্চান পরকালতত্ত্বের উৎসাহ, ইমেজারি ও মিথলজি বিপ্লবী সংগ্রামে অর্থ যুগিয়েছে ও সেক্যুলারিস্ট ও কালভিনিস্টদের ট্র্যাডিশনের সাথে চূড়ান্ত স্থানচ্যুতকারী বিচ্ছেদ ঘটাতে সমানভাবে সাহায্য করেছে।
সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধের সময় বিস্ফোরিত ঘৃণাও একই কাজ করেছে। মোটামুটি একই ভাষায় ইরানিরা ইসলামি বিপ্লবের সময় আমেরিকাকে যেভাবে ‘মহাশয়তান’ আখ্যায়িত করেছে বিপ্লবী সংকটকালে ঠিক সেভাবেই ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শয়তানের সাথে হাত মেলানোর অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কুখ্যাত স্ট্যাম্প অ্যাক্ট পাশ হওয়ার পর দেশাত্মবোধক কবিতা ও গানে এর প্রবক্তা লর্ডস বুট, গ্রেনভিল ও নর্থকে আমেরিকানদের শয়তানের চিরন্তন রাজ্যে প্রলুব্ধ করার ষড়যন্ত্রকারী শয়তানের চ্যালা হিসাবে তুলে ধরেছিল। স্ট্যাম্পকে ‘পশুর চিহ্ন’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বুক অভ রেভেলেশন অনুযায়ী যা শেষ দিবসে সাজাপ্রাপ্তদের উপর খোদাই করা হবে। রাজনৈতিক মিছিলে শয়তানের ছবির পাশে ব্রিটিশ মন্ত্রীদের কুশপুত্তলিকা বহন করা হয় আর গোটা উপনিবেশ জুড়ে ‘স্বাধীনতা বৃক্ষে’ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ১৭৭৪ সালে রাজা তৃতীয় জর্জ সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডের অধিকৃত কানাডিয় এলাকার ফরাসি ক্যাথলিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দান করলে তাঁকে অ্যন্টিক্রাইস্টের সাথে সম্পর্কিত করা হয়। এবার তাঁর ছবিও পাপাল অ্যান্টিক্রাইস্ট ও শয়তানের সাথে স্বাধীনতা বৃক্ষে শোভা পেতে থাকে।৫৮ এমনকি অধিকতর শিক্ষিত উপনিবেশবাসীরা এই গোপন মহাজাগতিক ষড়যন্ত্রের ভীতিতে আক্রান্ত হয়েছিল। হার্ভার্ড ও ইয়েলের প্রেসিডেন্টদ্বয় বিশ্বাস করতেন যে, উপনিবেশগুলো শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে; ‘স্বেচ্ছাচারী শক্তির পছন্দনীয় ধর্ম’ পাপাসির আসন্ন পরাজয়ের অপেক্ষা করেছেন তাঁরা। পাপাল অ্যান্টিক্রাইস্টকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে ঈশ্বরের বিধানকৃত পরিকল্পনার অংশে পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ, নিশ্চিতভাবেই যা আমেরিকায় ঈশ্বরের মিলেনিয়াল রাজ্যের আবির্ভাব ঘোষণা করবে। ব্যাপক বিস্তৃত এই ভ্রমাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধকে শুভ ও অশুভ শক্তির মহাজাগতিক সংঘাত হিসাবে দেখার প্রবণতা দুর্ভাগ্যক্রমে মানুষ নুতন বিশ্বে পা রাখতে গিয়ে বিপ্লবী সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করার সময় প্রায়শঃই ঘটে। এই শয়তানি মিথলজি উপনিবেশবাসীদের প্রাচীন বিশ্ব থেকে নিশ্চিতভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিতে সাহায্য করেছে, যার প্রতি তখন ও তাদের একটা জোরাল দুর্বলতার অবশেষ রয়ে গিয়েছিল। ইংল্যান্ডকে দানবায়িতকরণ, একে প্রতিপক্ষমূলক ‘অপর’, আমেরিকার বিপরীত মেরুতে পরিণত করে উপনিবেশবাসীদের নিজেদের জন্যে একটা স্পষ্ট পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম করে তুলেছে এবং যে নতুন ব্যবস্থাকে বাস্তব রূপ দিতে তারা যুদ্ধ করছিল তাকে ভাষা দিতে সাহায্য করেছে।
এভাবে ধর্ম প্রথম আধুনিক সেক্যুলার প্রজাতন্ত্রের পত্তনে মুল ভুমিকা পালন করেছে। বিপ্লবের পর অবশ্য, সদ্য স্বাধীন রাজ্যসমূহ তাদের সংবিধান প্রণয়ন করার সময় ঈশ্বরের নাম সেখানে নেহাতই দায়সারাভাবে উল্লেখ করা হয়। ১৭৮৬ সালে টমাস জেফারসন ভার্জিনিয়ার অ্যাংলিকান চার্চ ভেঙে দেন; তাঁর বিলে ঘোষণা করা হয় যে, ধর্মের ব্যাপারে নিপীড়ন ‘পাপপূর্ণ ও স্বেচ্ছাচারমূলক,’ জনগণকে তাদের নিজস্ব মতামত ধারণ করতে দিলে সত্য বিজয়ী হবে এবং ধর্ম ও রাজনীতির ভেতর একটা ‘বিচ্ছিন্নতার দেয়াল থাকবে’। এই বিলে ভার্জিনিয়ার ব্যাপ্টিস্ট, মেথডিস্ট ও প্রেসবিটারিয়ান চার্চ সমর্থন দেয়, রাষ্ট্রে চার্চ অভ ইংল্যান্ডের সুবিধাজনক অবস্থানে অসন্তুষ্ট ছিল এরা। পরে অন্যান্য রাজ্য ভার্জিনিয়াকে অনুসরণ করে তাদের নিজস্ব চার্চগুলো ভেঙে দেয়, ১৮৩৩ সালে ম্যাসাচুসেটস সবার শেষে এ কাজটি করে। ১৭৮৭ সালে ফিলাদেলফিয়া সম্মেলনে ফেডারেল সংবিধান গৃহীত হলে সেখানে ঈশ্বরের কোনও উল্লেখই ছিল না; সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বিল অভ রাইটস (১৭৮৯) আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে: ‘কংগ্রেস ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কোনও আইন প্রণয়ন করবে না বা এর স্বাধীন চর্চায় বাধাও দেবে না। এর পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মবিশ্বাস একটি ব্যক্তিগত স্বেচ্ছাকৃত বিষয়ে পরিণত হবে। বিপ্লবী পদক্ষেপ ছিল এটা, যুক্তির কালের অন্যতম সাফল্য হিসাবে তা প্রশংসিত হয়েছে। এর পেছনের ভাবনাচিন্তা অবশ্যই আলোকনের সহিষ্ণু দর্শনে অনুপ্রাণিত ছিল, কিন্তু ফাউন্ডিং ফাদারগণ আবার অধিকতর বাস্তব বিবেচনায়ও আলোড়িত হয়েছেন। তাঁরা জানতেন, রাজ্যসমূহের ঐক্য ধরে রাখতে ফেডারেল সংবিধান খুবই জরুরি, তবে তাঁরা এও বুঝতে পেরেছিলেন যে, সরকার কোনও একটি বিশেষ প্রটেস্ট্যান্ট গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রধর্মে পরিণত করলে সংবিধান অনুমোদন পাবে না। উদাহরণ স্বরূপ, কংগ্রেশনাল ম্যাসাচুসেটস কোনওদিনই অ্যাংলিকান চার্চ প্রতিষ্ঠাকারী সংবিধানে সম্মতি দেবে না। এটাও সংবিধানের ধারা-৬; উপধারা-৩- এর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অফিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরীক্ষা বাতিল করার কারণ। ধর্মকে আসনচ্যুত ও রাজনীতিকে সেকুলার করার ব্যাপারে ফাউন্ডার ফাদারদের সিদ্ধান্তে আদর্শ ছিল, কিন্তু নতুন জাতি কোনও একটি উপদলীয় গোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে পরিচয় নির্ধারণ করে বাকি সব প্রজার আনুগত্য ধরে রাখতে পারত না। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রয়োজন একে সহিষ্ণু এবং সেই সুবাদে সেক্যুলার হওয়ার দাবি করেছে।৬১
