বিপ্লবী সংগামের প্রথম দশকে সাধারণ লোক অতীতের সাথে রেডিক্যাল বিচ্ছেদ ঘটানো ঘৃণা করছিল। ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কচ্যুতি অচিন্তনীয় মনে হয়েছে। অনেকেই আশা করেছিল যে ব্রিটিশ সরকার তাদের নীতির পরিবর্তন ঘটাবে। কেউই উত্তেজনার সাথে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ছিল না বা এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছিল না। বেশির ভাগ আমেরিকান তখনও সহজাতভাবে প্রাচীন প্রাক আধুনিক কায়দায় সংকটের প্রতি সাড়া দিচ্ছিল: নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এক আদর্শ অতীতের শরণাপন্ন হচ্ছিল তারা। বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ ও যাঁরা আরও সেক্যুলার রেডিক্যাল হুইগ আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা ১০৬৬ সালে আগ্রাসী নরমানদের বিরুদ্ধে সাক্সনদের সংগ্রাম বা ইংরেজদের গৃহযুদ্ধকালীন পিউরিটান পার্লামেন্টারিয়ানদের সাম্প্রতিক সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছিলেন। কালভিনিস্টরা নিউ ইংল্যান্ডে পুরোনো ইংল্যান্ডে স্বৈরাচারী অ্যাংলিকান প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পিউরিটান সংগ্রামের কথা স্মরণ করে তাদের সোনালি অতীতের শরণাপন্ন হয়েছে; আমেরিকার বুনো এলাকায় একটি ধর্মনিষ্ঠ সমাজ গড়ে তোলার ভেতর দিয়ে নতুন বিশ্বে নির্যাতন থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতার সন্ধান করেছিল তারা। এই সময়ের (১৭৬৩-৭৩) সারমন ও বিপ্লবী বক্তৃতা-বিবৃতি অতীতের নাজুক সাফল্যকে ধরে রাখার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। রেডিক্যাল পরিবর্তনের চিন্তা অবনতি ও ধ্বংসের ভীতি জাগিয়ে তুলেছে। পুরোনো রক্ষণশীল চেতনা অনুযায়ী উপনিবেশবাসীরা ঐতিহ্য রক্ষা করতে চেয়েছিল। অতীতকে খুবই সহজ সরল হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে, ভবিষ্যৎকে উৎসগতভাবে ভীতিকর। বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেছিলেন যে, ট্র্যাডিশন থেকে প্রবলভাবে বিচ্ছিন্ন হলে অনিবার্যভাবে আবির্ভূত বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্যেই তাঁদের কর্মপরিকল্পনার নকশা করা হয়েছে। বাইবেলের প্রলয়বাদী ভাষা ব্যবহার করে ভীতির সাথে ব্রিটিশ নীতিমালার সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলেছেন তাঁরা।°
তবে এর পরিবর্তন ঘটেছিল। ব্রিটিশরা নাছোড়বান্দার মতো সাম্রাজ্যবাদী নীতিমালা আঁকড়ে থাকলে উনিবেশবাসীরা তাদের নৌকা পুড়িয়ে দিয়েছিল। বস্টন টি পার্টি (১৭৭৩) ও লুক্সমবার্গ এবং কনকর্ডের যুদ্ধের (১৭৭১) পর আর পেছনে যাবার উপায় ছিল না। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রাচীন ব্যবস্থার সাথে সম্পর্ক চ্যুতি ঘটিয়ে এক নজীরবিহীন ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরুর সাহসী প্রতিজ্ঞা প্রকাশ করেছে। এই দিক থেকে ঘোষণাটি ছিল আধুনিকায়নের দলিল, রাজনৈতিক পরিভাষায় ইউরোপে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও প্রতিমাবিরোধিতাকে প্রকাশ করেছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ উপনিবেশবাসী জন লকের চেয়ে বরং ক্রিশ্চান ভবিষ্যদ্বাণীর বিভিন্ন মিথে বেশি অনুপ্রাণিত ছিল। পরিচিত, তাদের গভীরতর বিশ্বাসের সাথে অনুরণিত এবং এই কঠিন যাত্রাকে সফল করে তোলা মনস্তাত্ত্বিক শক্তি খুঁজে পেতে সক্ষম করে তোলা পৌরাণিক মোড়কে আধুনিক রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দিকে চালিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল তাদের। আমরা যেমন প্রায়শঃই আবিষ্কার করব, ধর্ম প্রায়শঃই আধুনিকতার বেদনাদায়ক অভিযাত্রায় প্রয়োজনীয় উপকরণ যোগান দেয়।
এভাবে মুলধারার চার্চের বহু যাজক (এমনকি অ্যাংলিকানরাও স্যাম অ্যাডামসের মতো জনপ্রিয় নেতাদের বিপ্লবী বাগাড়ম্বরকে ক্রিশ্চান রূপ দিয়েছেন। তাঁরা সরকারে সদগুণ ও দায়িত্বের গুরুত্বের কথা বলার সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের দুনীতির বিরুদ্ধে অ্যাডামসের জ্বালাময়ী প্রত্যাখ্যান অর্থপূর্ণ হয়ে উঠত। ১ মহাজাগরণের আগেই নিউ লাইটস কালভিনিস্টদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি সতর্ক এবং পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে নিজেদের ক্ষমতায় আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। বিপ্লবী নেতারা ‘স্বাধীনতা’র কথা বলার সময় এমন পরিভাষা ব্যবহার করতেন যেটা আগেই ধর্মীয় অর্থে সম্পৃক্ত ছিল: এটা মহত্ম, গস্পেলের স্বাধীনতা ও ঈশ্বর পুত্রের সমাবেশ ধারণ করত। এটা ঈশ্বরের রাজ্যের মতো, যেখানে সকল নিপীড়নের অবসান ঘটবে, এবং মনোনীত জাতির মিথ, যারা বিশ্বের পবির্তনের বেলায় ঈশ্বরের অস্ত্রে পরিণত হবে, এমনি সব ধারণার সাথে সম্পর্কিত ছিল।৫২ ইয়েল ইউনির্ভার্সিটর প্রেসিডেন্ট টিমোথি ডিউইট (১৭৫২-১৮১৭) সোৎসাহে ‘ইম্যানুয়েল ল্যান্ডে’র আগমন ঘোষণাকারী বিপ্লব ও আমেরিকার ‘সেই নতুন, সেই বিচিত্র রাজ্যের প্রধান ঘাঁটি হওয়ার’ কথা বলতেন যা ‘পরম ঈশ্বরের সাধুদের প্রদান করা হবে।’৫৩ ১৭৭৫ সালে কানেক্টিকাটের যাজক ইবেনেযার বল্ডউইন জোর দিয়ে বলেছিলেন, যুদ্ধের বিপর্যয়ই কেবল ঈশ্বরের নতুন বিশ্বের পরিকল্পনাকে তরান্বিত করতে পারে। জেসাস আমেরিকায় মহান রাজ্যের গোড়াপত্তন করবেন: স্বাধীনতা, ধর্ম ও শিক্ষাকে ইউরোপ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, আটলন্টিক পাড়ি দিয়ে সেসব পশ্চিমে যাত্রা করেছে। বর্তমান সঙ্কট বর্তমান দুনীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার শেষ দিনের জন্যে পথ তৈরি করে দিচ্ছে। ফিলাদেলফিয়ার প্রোভোস্ট উইলিয়াম স্মিথের চোখে উপনিবেশবাসীরা ছিল ‘মুক্তি, শিল্পকলা ও স্বর্গীয় জ্ঞানের’৫৪ ঈশ্বর মনোনীত স্থান।
