মহাজাগরণ সবাইকে টলিয়ে দিয়েছিল। এর পর থেকে এমনকি ওল্ড লাইটস ও চলমান ঘটনাপ্রবাহে প্রলয়বাদী তাৎপর্য আরোপ করতে তৈরি ছিল। ১৭৫৫ সালের নভেম্বরে যুগপৎভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটলে জোনাথান মেহিউ বিশ্বাস করেছিলেন যে, ‘মহান বিপ্লব আসন্ন,’; ‘বিশ্বের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থায় লক্ষযোগ্য পরিবর্তনের’৪৪ অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। সহজাত প্রবৃত্তির বশেই মেহিউ সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধের সময় প্রটেস্ট্যান্ট ব্রিটেন ও ক্যাথলিক ফ্রান্সের আমেরিকায় উপনিবেশের অধিকার নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতকে পারলৌকিক দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছেন, এর ফলে অ্যান্টিক্রাইস্ট শেষ যুগের মহাভণ্ড পোপের ক্ষমতা হ্রাসের ভেতর দিয়ে ক্রাইস্টের দ্বিতীয় আগমন ত্বরান্বিত হবে।৫ সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধে নিউ লাইটস অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মহাজাগতিক লড়াইয়ে আমেরিকাকে সামনের কাতারে লড়াই করতে দেখেছে। মোটামুটি এই সময়ে পোপ দিবস (নভেম্বর ৫) ছুটির দিনে পরিণত হয়, তখন উচ্ছৃঙ্খল জনতা পান্টিফের অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল।৪৬ ভীতিকর ও সহিংস সময় ছিল এটা। আমেরিকানরা তখনও জীবনকে অর্থ যোগাতে ও তাদের উপর নেমে আসা ট্র্যাজিডির ব্যাখ্যা করতে প্রাচীন মিথলজির শরণাপন্ন হচ্ছিল। তবে যেন আসন্ন পরিবর্তনেরও আলামত টের পাচ্ছিল তারা। সেকারণে ফ্রান্স ও রোমান ক্যাথলিক চার্চকে ন্যায়নিষ্ঠ আমেরিকান রীতিনীতির প্রতি শয়তানি ও ভীষণভাবে বৈরী বিবেচনা করে ঘৃণার ধর্ম গড়ে তুলেছিল।৪৭ এইসব প্রলয়বাদী ফ্যান্টাসির বিকাশ ঘটানোর সময় তারা যেন বুঝতে শুরু করেছিল যে, যতক্ষণ না সম্পত্তির বিনাশ সাধন করা হচ্ছে ততক্ষণ আসলে কোনও নিষ্কৃতি, চূড়ান্ত নাজাত বা স্বাধীনতা ও মিলেনিয়াল শান্তি আসছে না। নতুন এই বিশ্বকে অস্তিত্ব দিতে হলে রক্তাক্ত শুদ্ধিকরণের প্রয়োজন হবে। আমরা দেখব যে, উদীয়মান আধুনিকতার প্রতি সাড়া হিসাবে প্রায়শঃই ক্রোধের ধর্মতত্ত্ব মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছিল, পরিবর্তন অত্যাসন্ন, কিন্তু তখনও প্রাচীন বিশ্বে বাস করছিল তারা। সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্রিটিশ সরকারকে আমেরিকান উপনিবেশগুলোর উপর নতুন করভার চাপাতে বাধ্য করে। বিপ্লবাত্মক সঙ্কট উস্কে দেয় তা যা ১৭৭৫ সালে আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। প্রলম্বিত এই যুদ্ধের সময় আমেরিকানরা আধুনিক রীতির ক্ষেত্রে কেন্দ্রিয় উপাদান অতীতের সাথে চরম বিচ্ছেদের সেই বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটিয়েছিল, তাদের ঘৃণার ধর্ম এই বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে।
বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ-যেমন, জর্জ ওয়াশিংটন, জন ও স্যামুয়েল অ্যাডামস, টমাস জেফারসন এবং বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন-বিপ্লবকে সেক্যুলার ঘটনা হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁরা ছিলেন যুক্তিবাদী, আলোকনের পুরুষ, জন লক, স্কটিশ কমনসেন্স দর্শন বা রেডিক্যাল উইং আদর্শের মতো আধুনিক আদর্শে অনুপ্রাণিত। ডেইস্ট হওয়ায় প্রত্যাদেশ ও ক্রাইস্টের ঐশ্বরিকতার ব্যাপারে অধিকতর অর্থডক্স ক্রিশ্চানদের চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে আলাদা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংযমী, বিচক্ষণ লড়াই পরিচালনা করছিলেন তাঁরা, ধীরে অনীহার সাথে বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। নিজেদের অবশ্যই অ্যান্টিক্রাইস্টের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে মহাজাগতিক সংঘাতে লিপ্ত ভাবেননি। ব্রিটেনের সাথে বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য হয়ে উঠলে, তাঁদের লক্ষ্য বাস্তব ভিত্তিক ও আঞ্চলিক উদ্দেশ্যে সীমিত ছিল: ‘সম্মিলিত উপনিবেশগুলো অধিকার বলে মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্র হবে।’ জন অ্যাডামস ও ফ্রাংকলিনের সাথে জেফারসন কর্তৃক খসড়া করা স্বাধীনতার ঘোষণা ৪ঠা জুলাই ১৭৭৬ তারিখে কলোনিয়াল কংগ্রেসে গৃহীত হয়, এটা ছিল লক-প্রচারিত স্ব- প্রকাশিত মানব অধিকারের আদর্শভিত্তিক একটি আলোকন দলিল। এইসব অধিকারকে ‘জীবন, মুক্তি ও সুখের সন্ধান’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই ঘোষণা প্রকৃতির ডেইস্ট ঈশ্বরের নামে স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও সাম্যের আধুনিক আদর্শের প্রতি আবেদন রেখেছে। অবশ্য রাজনৈতিকভাবে রেডিক্যাল ছিল না এই ঘোষণা। এখানে সমাজের সম্পদের পুনর্বণ্টনের বা মিলেনিয়াল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনও ইউটোপিয় কথাবার্তার স্থান ছিল না। এটা ছিল সুদূর প্রসারী স্থিতিশীল কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা বাস্তব, যৌক্তিক লোগোস।
কিন্তু আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের ফাউন্ডিং ফাদারগণ ছিলেন অভিজাত গোষ্ঠীর অংশ, তাঁদের ধারণা মামুলি ধরনের ছিল না। সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানরা কালভিনিস্ট ছিল, তারা এই যৌক্তিক রীতির সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষেই, তাদের অনেকেই ডেইজমকে শয়তানি আদর্শ মনে করেছে। ৮ প্রাথমিকভাবে অধিকাংশ উপনিবেশবাসী ঠিক তাদের নেতাদের মতোই ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কচ্যুতিতে অনীহ ছিল। সবাই বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দেয়নি। প্রায় ৩০,০০০ এর মতো ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধ করেছে এবং যুদ্ধের পর ৮০,০০০ থেকে ১০০,০০০-এর মতো নতুন রাষ্ট্র ছেড়ে কানাডা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা ব্রিটেনে চলে গেছে।৪৯ স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যারা, তারা একদিকে যেমন প্রাচীন মিথ ও ক্রিশ্চান ধর্মের মিলেনিয়াল স্বপ্নে প্রণোদিত হয়েছিল তেমনি ফাউন্ডারদের সেক্যুলারিস্ট আদর্শেও অনুপ্রাণিত ছিল। আসলে ধর্মকে রাজনৈতিক ডিসকোর্স থেকে আলাদা করা ছিল কঠিন। সেক্যুলারিস্ট ও ধর্মীয় আদর্শ সৃজনশীলভাবে মিশে গিয়ে আমেরিকার জন্যে নানামুখী আশার ধারক উপনিবেশবাসীদের ইংল্যান্ডের সাম্রাজ্যবাদী মহাশক্তি বিরোধী শক্তিতে যোগ দিতে সক্ষম করে তুলেছে। আমরা ইরানের ইসলামি বিপ্লবে (১৯৭৮-৭৯) একই ধরনের ধর্মীয় ও সেক্যুলারিস্ট মৈত্রী গড়ে উঠতে দেখব, এটাও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল।
