এডওয়ার্ডস তাঁর বিবরণে এই ধরনের আবেগপ্রবণতার বিপদ তুলে ধরেছেন। নর্দাম্পটনে পুনর্জাগরণে ভাটা পড়লে একজন এতটাই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল যে পরমানন্দমূলক আনন্দের হারিয়ে যাওয়ার মানে হতে পারে কেবল তার অবশ্যাম্ভবী নরক বাস, এটা নিশ্চিত হয়ে আত্মহত্যা করে বসে সে। অপরাপর শহরেও ‘অসংখ্য মানুষ…জোরালভাবে এটা বুঝিয়েছে বলে মনে হয়েছে, ওদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যেন কেউ একজন তাদের উদ্দেশে বলছে, “তোমার গলা কেটে ফেল, এটাই সেরা সুযোগ। এখন!” দুজন লোক ‘অদ্ভুত উৎসাহভরা বিভ্রমে পাগল হয়ে গেছে। এডওয়ার্ডস জোরের সাথে বলেছেন যে অধিকাংশ লোক জাগরণের আগে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও চুপচাপ ছিল, কিন্তু তাঁর অ্যাপোলোজিয়া ধর্মকে কেবল হৃদয়ের একটা ব্যাপার কল্পনা করা কতখানি বিপজ্জনক হতে পারে সেটাই দেখিয়ে দেয়। ধর্মকে একবার অযৌক্তিক ধরে নিয়ে সেরা রক্ষণশীল আধ্যাত্মিকতার অন্তস্থঃ বাধাসমূহকে বাতিল করে দেওয়া হলে লোকে সব ধরনের বিভ্রমে পতিত হতে পারে। কাল্টের বিভিন্ন আচার আচরণ এমনভাবে পরিকল্পিত যাতে লোকে কোনও আঘাতের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে স্বাস্থ্যবান হয়ে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। লুরিয় কাব্বালাহয় এই বিষয়টি খুবই স্পষ্ট, এখানে অতীন্দ্রিয়বাদীকে বিষাদ ও পরিত্যাগ দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু আনন্দের সাথে অভিযাত্রা শেষ করানো হয়। একইভাবে হুসেইনের সম্মানে আয়োজিত প্রচলিত শিয়া মিছিল মানুষকে তাদের হতাশা ও ক্রোধ প্রকাশ করার একটা পথ তৈরি করে দেয়, তবে একটা আচরিক রূপে: অনুষ্ঠান শেষে তারা উন্মত্তের মতো ছোটাছুটি শুরু করে না, ধনী ও ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয় না। কিন্তু নর্দাম্পটনে লোকজনকে অগ্রসর হওয়ার পথে সাহায্য করতে কোনও পরিকল্পিত কাল্ট ছিল না। সবকিছু ছিল স্বতঃস্ফুর্ত ও বিশৃঙ্খল। লোকজনকে তাদের সম্পূর্ণ আবেগের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে এবং এমনকি তাতে জড়িত হতেও দেওয়া হয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের পক্ষে তা মারাত্মক প্রমাণিত হয়েছে।
তাসত্ত্বেও এডওয়ার্ডস নিশ্চিত ছিলেন যে, জাগরণ ঈশ্বরেরই কাজ ছিল। আমেরিকায় এক নতুন ভোরের সূচনা দেখিয়েছে তা, বিশ্বের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়বে এটা। প্রত্যেক পুনর্জাগরণের মাধ্যমে, এডওয়ার্ডস নিশ্চিত ছিলেন, ক্রিশ্চানরা পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে, সমাজে সত্য ও স্বয়ং ঈশ্বরের ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটাবে। জাগরণে রাজনৈতিকভাবে রেডিক্যাল কিছু ছিল না। এডওয়ার্ডস ও হুইটফিল্ড শ্রোতাদের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে, গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে প্রচারণা বা সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবি তোলার তাগিদ দিতে যাননি; তবে এই অভিজ্ঞতা আমেরিকান বিপ্লবের পথ তৈরিতে সাহায্য করেছে। পরমান্দময় অভিজ্ঞতা বিপ্লবী নেতাদের ডেইস্ট আলোকন আদর্শের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারবে না এমন বহু আমেরিকানকে এক ধরনের স্বাধীনতার আনন্দময় স্মৃতির অনুভূতি যুগিয়েছে। ‘মুক্তি’ শব্দটি দীক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনের ব্যথা ও বেদনা থেকে মুক্তির আনন্দ বোঝাতে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়েছে। হুইটফিল্ড ও এডওয়ার্ডস, উভয়ই যাঁর যাঁর সমাবেশকে যারা পুনর্জন্ম লাভ করেনি এবং উন্মত্ততাকে যুক্তিবাদী নিরাসক্ততার সাথে দেখেছে সেই অভিজাত গোষ্ঠীর চেয়ে তাদের পরমানন্দময় বিশ্বাসকে উঁচু মানের ভাবতে উৎসাহিত করেছেন। পুনর্জাগরণের নিন্দাকারী যাজকদের ঔদ্ধত্যের কথা যাদের মনে ছিল তাদের অনেকেই বহু আমেরিকান কালভিনিস্টের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতায় পরিণত হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের প্রতি দারুণ অবিশ্বাস গড়ে তুলেছিল। জাগরণ আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম গণআন্দোলন ছিল। সাধারণ লোকজনকে দুনিয়াবিদারী ঘটনাপ্রবাহে অংশ গ্রহণের হঠকারী অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দিয়েছিল যা ইতিহাসের ধারা পাল্টে দেবে বলে বিশ্বাস করেছিল তারা।
কিন্তু জাগরণ উপনিবিশের কালভিনিস্ট গোষ্ঠীগুলোকেও সরাসরি দ্বিধা বিভক্ত করে দিয়েছিল। বস্টন যাজক জনাথান মেহিউ (১৭২০-৬০) ও চার্লস চন্সি (১৭০৫-৮৭)-এর মতো ওল্ড লাইটস নামে পরিচিত হয়ে ওঠা ব্যক্তিগণ বিশ্বাস করতেন ক্রিশ্চান ধর্মকে যৌক্তিক, আলোকিত ধর্মবিশ্বাস হতে হবে পুনর্জাগরণবাদীদের উন্মত্ততায় ভীত হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা, তাদের বুদ্ধিবৃত্তি বিরোধী পক্ষপাতিত্বের প্রতি সন্দিহান ছিলেন।৪২ ‘ওল্ড লাইটস’দের সমাজের অধিকতর সমৃদ্ধ অংশ থেকে আসার প্রবণতা ছিল, অন্যদিকে নিচু শ্রেণীর লোকজন দলত্যাগী নিউ লাইট চার্চের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। ১৭৪০-এর দশকে দুই শোরও বেশি সমাবেশ বর্তমান গোষ্ঠী ত্যাগ করে নিজস্ব চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিল।৪৩ ১৭৪১ সালে প্রেসবিটারিয়ান নিউ লাইট প্রেসবিটারিয়ান সিনদ থেকে বের হয়ে গিয়ে যাজকদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রিন্সটনের নিউ জার্সিতে নাসান হলে নিজস্ব কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরে ভাঙন জোড়া লাগলেও মধ্যবর্তী সময়ে নিউ লাইটস একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় লাভ করে নিয়েছিল যা উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মৌলবাদী আন্দোলনের আবির্ভাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
