ক্রিশ্চানরা বিভক্ত হতে শুরু করেছিল: কেউ কেউ ফিলোসফসদের অনুসরণ করে ধর্মবিশ্বাসকে রহস্যমুক্ত ও যৌক্তিক করার প্রয়াস পাচ্ছিল, অন্যরা যুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছিল। এটা ছিল উদ্বেগজনক একটা ব্যাপার, বিশেষ করে আমেরিকান কলোনিগুলোতে বেশি দৃশ্যমান ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৌলবাদের বিকাশ এই বিভাজনের অন্যতম প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠবে। প্রথম দিকের বছরগুলোতে পিউরিটান নিউ ইংল্যান্ড ছাড়া অধিকাংশ কলোনি ধর্মের প্রতি নিস্পৃহ ছিল; মনে হয়েছিল যেন সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ কলোনিগুলো বুঝি সম্পূর্ণ সেকুলারাইজড হয়ে উঠবে। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আবার প্রটেস্ট্যান্টদের আধিপত্য পুনরুজ্জীবিত হয়, পুরোনো পৃথিবীর তুলনায় নুতন বিশ্বে ক্রিশ্চানদের জীবনধারা অনেক বেশি আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। মূলত যাজকীয় কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে যার যার নিজস্ব নেতৃত্ব অনুসরণের উপর জোরদানকারী কোয়াকার, ব্যাপ্টিস্ট ও প্রেসবিটারিয়ানদের মতো উপদলগুলো ফিলাদেলফিয়া অ্যাসেম্বলি স্থাপন করেছিল। এই অ্যাসেম্বলি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখত, যাজক সম্প্রদায়কে নির্দেশনা দিত ও যেকোনও রকম ধর্মদ্রোহীতাকে দমন করত। এই নির্যাতনমূলক অথচ আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার ফলে তিনটি গোষ্ঠীই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ও এদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। একই সময়ে মেরিল্যান্ডে চার্চ অভ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়, জাঁকাল দর্শন চার্চ নিউ ইয়র্ক সিটি, বস্টন ও চার্লসটনের দিগন্ত রেখাকে আমূল বদলে দেয়।৩৫
কিন্তু একদিকে যখন বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা আরোপের লক্ষ্যে প্রয়াস চলছিল, তখন এই যৌক্তিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায়ে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি হয়েছিল। রক্ষণশীল ধর্ম সব সময়ই মিথলজি ও যুক্তিকে পরিপূরক হিসাবে দেখেছে, একটি ছাড়া অন্যটি হীন হয়ে পড়বে। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই ছিল, যেখানে যুক্তিকে প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করার সুযোগ করে দেওয়া হত। কিন্তু কোনও কোনও নতুন প্রটেস্ট্যান্ট আন্দোলনে (এই পরিবর্তনকে মার্টিন লুথারের সময় পর্যন্ত টেনে নেওয়া যেতে পারে) যুক্তিকে সাইড লাইনে ঠেলে দেওয়ার বা এমনকি পুরোপুরি বাতিল করার প্রবণতা অস্বস্তিকর যুক্তিহীনতার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। কোয়াকারদের এ নামে অভিহিত করার কারণ ছিল গোড়ার দিকে প্রায়শঃই তারা তাদের ধর্মীয় পরিবর্তন প্রকাশ করার জন্যে কাঁপত, হুঙ্কার ছাড়ত আর চিৎকার করত—জনৈক পর্যবেক্ষক লক্ষ করেছেন-ফলে কুকুর ডেকে উঠত, গরুছাগল পাগলের মতো ছোটাছুটি করত আর শুয়োরের পাল আতঙ্কে চেঁচামেচি জুড়ে দিত। রেডিক্যাল কালিভিনিস্ট পিউরিটানদেরও-চার্চ অভ ইংল্যান্ডের ‘সম্পত্তি’ বলে তাদের ধরণার সবকিছুর বিরোধিতা করে যাদের শুরু হয়েছিল—একই ধরনের চরম, কোলাহলময় আধ্যাত্মিকতা ছিল। তাদের ‘নতুন জন্মে’র খিঁচুনী প্রায়শঃই আচ্ছন্ন ধরনের ছিল, আনন্দের সাথে ঈশ্বরের বাহুতে ডুব দিয়ে সফল হওয়ার আগে অনেকেই অপরাধরোধ, ভীতি ও অবশ করা সন্দেহের যন্ত্রণা বোধ করেছে। ধর্মান্তরকরণ বিপুল শক্তিতে আদি আধুনিককালে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম করে তুলেছিল তাদের। তারা ভালো পুঁজিবাদী ও প্রায়শঃই ভালো বিজ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু অনেক সময় মহত্বের প্রভাব ফুরিয়ে যেত, পিউরিটানরা তখন এক ধরনের পুনঃপতনে আক্রান্ত হত, অবিরাম বিষণ্ণতার চক্রে পড়ে যেত তারা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনকি তারা আত্মহত্যাও করেছে। ৩৭
এইদিক থেকে রক্ষণশীল ধর্ম উন্মাদনাগ্রস্ত ছিল না। মানুষকে আস্থার সাথে সম্পর্কিত করে তোলার জন্যেই এর আচারানুষ্ঠান ও কাল্টের পরিকল্পনা করা হত। বাকানালিয় কাল্ট ও উন্মত্ত পরমানন্দের ঘটনা নিশ্চিতভাবেই ঘটেছে বটে, কিন্তু তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের চেয়ে বরং অল্প কিছু লোক প্রভাবিত হয়েছে। অতীন্দ্রিয়বাদ ব্যাপক জনসাধারণের জন্যে ছিল না। সর্বোচ্চ অবস্থায় এটা এক থেকে অন্যকে শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি: এখানে শিক্ষাব্রতীতে সযত্নে তত্ত্বাবধান করা হয় যাতে সে কোনও মানসিক অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় না পড়ে। অবচেতনে অবতরণের ব্যাপারটি এক ধরনের নৈপূণ্য; ব্যাপক দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও শৃঙ্খলা দাবি করে। দক্ষ নির্দেশক পাওয়া না গেলে ফল নিন্দনীয় হয়ে উঠতে পারে। প্রায়শঃই পর্যাপ্ত আধ্যাত্মিক নির্দেশনার অভাবে কারণে ঘটে যাওয়া মধ্যযুগীয় ক্রিশ্চান সাধুদের উন্মত্ত ও পাগলামিসুলভ আচরণ মনের বিকল্প অবস্থার চর্চার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাহীনতার বিপদই তুলে ধরেছে। এই ধরনের অপচয় রোধ করার জন্যেই তেরেসা অভ আভিলা ও জন অভ দ্য ক্রসের সংস্কার পরিকল্পিত ছিল। অতীন্দ্রিয় যাত্রা গণহারে হাতে নেওয়া হলে শাব্বেতিয়দের নিশ্চিহ্নবাদ বা কিছু সংখ্যক পিউরিটানের মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো সমবেত হিস্টিরিয়ায় পর্যবসিত হতে পারে।
আবেগীয় বাড়াবাড়ি অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার ধর্মীয় জীবনের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। প্রথম মহাজাগরণে এই বিষয়টি বিশেষভাবে স্পষ্ট ছিল। ১৭৩৪ সালে কানেক্টিকাটের নর্থদাম্পটনে বিস্ফোরিত হয়েছিল এই আন্দোলন; বিজ্ঞ কালভিনিস্ট যাজক জোনাথান এডওয়ার্ডস (১৭০৩-৫৮) এর বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। মহাজাগরণের আগে, ব্যাখ্যা করেছেন এডওয়ার্ডস, নর্দাম্পটনের লোকেরা তেমন ধার্মিক ছিল না, কিন্তু ১৭৩৪ সালে সহসা দুই তরুণ মারা যায়। এর ধাক্কা, (এডওয়ার্ডসের নিজস্ব আবেগ প্রবণ প্রচারণার সমর্থনে) গোটা শহর উন্মত্ত ধার্মিকতায় পতিত হয়, মহামারীর মতো ম্যাসাচুসেটস ও লঙ আইল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে তা। লোকজন কাজ ফেলে সারাদিন বাইবেল পড়ে সময় কাটাতে শুরু করে। ছয় মাসের মধ্যেই শহরের তিনশো লোক বেদনাদায়ক ‘পুনর্জন্মের দীক্ষা লাভ করে। পরম আনন্দ ও ভীষণ বিষণ্নতার মাঝে ওঠানামা করছিল তারা; অনেক সময় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ত আর ‘তারা ঈশ্বরের ক্ষমা লাভের অযোগ্য ভাবতে তৈরি হয়ে যাওয়ার মতো অপরাধবোধের অনুভূতিতে ডুবে যেত।’ অন্যান্য সময়ে তারা ‘হাসিতে ফেটে পড়ত, একই সময়ে আবার স্রোতের মতো চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত, মাঝেমাঝে প্রচণ্ড বিলাপে ফেটে পড়ত।৩৮ এই পুনর্জাগরণ মিলিয়ে যেতে শুরু করেছিল, এমন সময় এক ইংরেজ মেথডিস্ট যাজক জর্জ হুইটফিল্ড (১৭১৪- ৭০) বিভিন্ন উপনিবেশে সফর করে দ্বিতীয় দফা জোয়ার সৃষ্টি করেন। তাঁর সারমনের সময় লোকে অচেতন হয়ে যেত, কাঁদত, চিৎকার ছাড়ত; যারা রক্ষা পেয়েছে মনে করত তাদের চিৎকারে কেঁপে উঠত চার্চের অন্দর মহল আর নিজেদের নিশ্চিত সাজাপ্রাপ্ত ধরে নেওয়া দুর্ভাগাদের গোঙানি শোনা যেত। কেবল সাধারণ ও অশিক্ষিতরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হার্ভার্ড ও ইয়েলে আনন্দমুখর সংবর্ধনা লাভ করেন হুইটফিল্ড। ১৭৪০ সালে একটি গণমিছিলের মাধ্যমে তাঁর সফরের সমাপ্তি টানেন তিনি, সেখানে বস্টন কমনের ৩০,০০০ লোকের সামনে সারমন দিয়েছিলেন।
