অতলান্তিকের উভয় পাড়ের মানুষের জন্যেই ভীতিকর সময় ছিল এটা। সংস্কার ছিল ইউরোপকে ভয়ঙ্করভাবে বৈরী শিবিরে বিভক্ত করে দেওয়া ভীতিকর বিচ্ছেদ। ইংল্যান্ডে প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকরা পরস্পরের উপর নির্যাতন চালিয়েছে: ফ্রান্সে প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ঘটনা (১৫৬২-৬৩) এবং ১৫৭২ সালে দেশব্যাপী প্রটেস্ট্যান্টদের গণহারে হত্যা ঘটেছে। তিরিশ বছর মেয়াদী যুদ্ধ (১৬১৮-৪৮) একের পর এক দেশকে টেনে এনে ইউরাপকে ধ্বংস করে দিয়েছে, শক্তিশালী ধর্মীয় মাত্রায় পরিচালিত ক্ষমতার সংঘাত ইউরোপের ঐকবদ্ধ হওয়ার যে কোনও আশা তিরোহিত করে দিয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাও ছিল। ১৬৪২ সালে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড, এরই পরিণতিতে রাজা প্রথম চার্লস নিহত হন (১৬৪৯) এবং পিউরিটান সাংসদ অলিভার ক্রমওয়েলের অধীনে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে সংসদ কর্তৃক এর ক্ষমতা খর্ব করা হয়। পশ্চিমে আরও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের রক্তাক্ত ও বেদনাদায়ক আবির্ভাব ঘটছিল। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব আরও অনেক বেশি বিপর্যয়কর ছিল, এর অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়নের অধীনে শৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ত্রাস ও সামরিক স্বৈরাচারের একটা রাজত্ব চলেছে। আধুনিক বিশ্বে ফরাসি বিপ্লবের উত্তরাধিকার দ্বিমুখী: স্বধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আলোকন আদর্শের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি আবার সমানভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয়াবহ স্মৃতিও রেখে গেছে। আমেরিকান উপনিবেশগুলোতেও সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধ (১৭৩৬-৬৩)-যেখানে ফ্রান্স ও ব্রিটেন তাদের সাম্রাজ্যবাদী অধিকার নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল-আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, ভীতিকর ধ্বংসলীলার সৃষ্টি হয়েছে তাতে। এটা সরাসরি স্বাধীনতা যুদ্ধের পথে নিয়ে গেছে (১৭৭৫-৮৩) যার ফলে আধুনিক বিশ্বে সর্ব প্রথম সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পশ্চিমে আরও ন্যায়বিচারভিত্তিক ও সহিষ্ণু সামাজিক ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটছিল, কিন্তু সেটা অর্জন সম্ভব হয়েছিল প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী সহিংসতার পর।
এই টালমাতাল সময়ে মানুষ ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল এবং কেউ কেউ এমনি নতুন পরিস্থিতিতে বিশ্বাসের প্রাচীন ধরন আর কাজ করছে না বলে আবিষ্কার করেছিল। পরবর্তীকালে ইহুদি ধর্মের শ্যাব্বেতিয় আন্দোলনের মতো নৈতিকতা বিরোধী আন্দোলন অতীতের সাথে বন্ধন ছিন্ন করে সামঞ্জস্যহীনভাবে নতুন কিছু লাভ করার প্রয়াস পেয়েছিল। সপ্তম শতাব্দীর ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের পর জ্যাকব বথিউমলি ও লরেন্স ক্লার্কসন (১৬৩০) এক ধরনের প্রাথমিক নাস্তিক্যবাদের প্রচার চালান। একজন বিচ্ছিন্ন, দূরবর্তী উপাস্য বহুঈশ্বরবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়, দ্য লাইট অ্যান্ড ডার্ক সাইড অভ গড (১৬৫০)-এ যুক্তি দেখিয়েছেন ক্লার্কসন; জেসাস ছাড়াও অন্য ব্যক্তির মাঝে মানবরূপ গ্রহণ করেছিলেন ঈশ্বর; সবকিছুতেই, এমনকি পাপেও স্বর্গীয় সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। দ্য সিঙ্গল আই-তে ক্লার্কসনের চোখে পাপ মানবীয় কল্পনামাত্র, আর অশুভ ঈশ্বরের একটি প্রকাশ। রেডিক্যাল ব্যাপ্টিস্ট অ্যাবিয়েযার কোপে (১৬১৯-৭২) প্রকাশ্যে যৌনতার টাবু ভঙ্গ করবেন ও জনসমক্ষে খিস্তিখেউর করবেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘মহান সমতাবিধানকারী’ ক্রাইস্ট ফিরে এসে বর্তমানের পচা ভণ্ডামীপূর্ণ ব্যবস্থাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবেন। ২৯ নিউ ইংল্যান্ডের আমেরিকান কলোনিগুলোতেও নৈতিকতা বিরোধী মতবাদ চলছিল। ১৬৩৫ সালে ম্যাসাচুসেটসে পৌঁছানো জনপ্রিয় পিউরিটান যাজক জন কটন (১৫৮৫-১৬২৩) জোর দিয়ে বলেছেন, ভালো কাজের কোনও অর্থ নেই, সৎ জীবন যাপন অর্থহীন; এইসব মানব সৃষ্ট নিয়মনীতি ছাড়াই ঈশ্বর আমাদের উদ্ধার করার ক্ষমতা রাখেন। তাঁর শিষ্য অ্যানি হাচিনসন (১৫৯০-১৬৪৩) দাবি করেছিলেন, ঈশ্বরের কাছ থেকে ব্যক্তিগত প্রত্যাদেশ লাভ করেছেন তিনি, তাই বাইবেল পাঠ বা ভালো কাজ করার কোনও প্রয়োজন বোধ করেন না। এই বিদ্রোহীরা সম্ভবত জীবন মৌলিকভাবে বদলে যেতে থাকা নুতন বিশ্বব্যবস্থায় প্রাচীন বিধিনিষেধ আর কাজ না করার সেই অপরিণত ভাবনাই প্রকাশ করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন। অবিরাম উদ্ভাবনের একটা কালে কেউ কেউ ধর্মীয় ও নৈতিক স্বাধীনতার জন্যে পা বাড়িয়ে আবার উদ্ভাবন থেকেও নিস্তার চাইবে, এটাই স্বাভাবিক।
অন্যরা নতুন যুগের আদর্শসমূহকে ধর্মীয় ভঙ্গিতে প্রকাশের প্রয়াস পেয়েছে। সোসায়েটি অভ ফ্রেন্ডস-এর প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ফক্স (১৬২৪-৯১) এমন এক আলোকনের প্রচার করেছেন যা পরবর্তীকালের কান্টের মতবাদ থেকে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না। তাঁর কোয়াকারদের নিজের অন্তস্তলেই আলোর সন্ধান করতে হবে। ফক্স তাদের ‘অন্যের কাছে নির্দেশনা নেওয়ার বদলে নিজের মতো করে উপলব্ধি অর্জন করতে’৩১ শিখিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মকে এই বিজ্ঞানের যুগে অবশ্যই ‘পরীক্ষামূলক’ হতে হবে; কোনও কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সত্যায়িত হতে হবে।৩২ সোসায়েটি অভ ফ্রেন্ডস এক নতুন গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রচারণা চালিয়েছে: সব মানব সন্তানই সমান। কোয়াকারদের আর কারও সামনে মাথার টুপি খোলার প্রয়োজন নেই। অশিক্ষিত নারী-পুরুষকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী যাজকদের সমীহ করার প্রয়োজন নেই, বরং তাদের অবশ্যই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে হবে। একইভাবে জন ওয়েসলি (১৭০৩- ৯১) আধ্যাত্মিকতায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও ব্যবস্থার প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর ‘মেথডিস্ট’ অনুসারীরা প্রার্থনার কঠোর নিয়ম মেনে চলত: বাইবেল পাঠ, উপবাস পালন ও দান। কান্টের মতো ওয়েসলি যুক্তি থেকে ধর্মবিশ্বাসের মুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ধর্ম মস্তিষ্কের কোনও মতবাদ নয়, বরং হৃদয়ের বিশ্বাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিশ্চান ধর্মের যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহ ‘আবদ্ধ ও বন্দি’ হয়ে পড়াটা এমনকি এক ধরনের আশীর্বাদও হতে পারে। এটা নারী-পুরুষকে মুক্ত করবে, তাদের ‘নিজেদের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য করবে ও হৃদয়ের মাঝে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলন্ত আলোকে দেখতে বাধ্য করবে।’৩
