মিথোসের প্রাচীন সত্যসমূহকে এখন এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল যেন সেগুলো লোগোই, এটা ছিল সম্পূর্ণ নতুন পরিবর্তন, শেষ পর্যন্ত হতাশ করতে বাধ্য।
কারণ ঠিক যে সময়ে এই ধর্মবেত্তা, দার্শনিক ও ইতিহাসবিদগণ যুক্তির প্রাধান্য দাবি করছিলেন, ঠিক তখন জার্মান যুক্তিবাদী ইম্যানুয়েল কান্ট (১৭২৩-১৮০৪) গোটা আলোকনের প্রকল্পকেই খাট করে দেন। কান্ট একদিকে প্রাথমিক আধুনিকতার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মানুষকে অবশ্যই শিক্ষক, চার্চ ও কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভরশীলতা ছুঁড়ে ফেলে নিজে থেকেই সত্যি সন্ধান করতে হবে। ‘আলোকন হচ্ছে মুনষের নিজে থেকে সৃষ্টি করা অভিভাবকত্ব থেকে মুক্তি, ‘ লিখেছেন তিনি। ‘অভিভাবকত্ব হচ্ছে অন্যের কাছ থেকে নির্দেশনা না পেয়ে নিজের মতো করে নিজের বোধকে কাজে লাগানোর অক্ষমতা। ২৩ কিন্তু আবার অন্যদিকে ক্রিটিক অভ পিউর রিজন (১৭৮১)-এ কান্ট যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আমরা প্রকৃতিতে যে শৃঙ্খলা আবিষ্কার করি বলে ভাবি তার সাথে বাইরের কোনও বাস্তবতার সম্পর্ক থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব। এই শৃঙ্খলা’ আমাদের নিজস্ব মনের সৃষ্টি মাত্র, এমনকি নিউটনের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক নিয়মকানুনও সম্ভবত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চেয়ে বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কেই বেশি তথ্য যোগায়। মন বিভিন্ন ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার সাহায্যে তার বাইরের কেনও তথ্য সংগ্রহ করার সময় এর ভেতর থেকে একটা অর্থ বের করতে একে তার নিজস্ব অন্তস্থঃ কাঠামো অনুযায়ী শনাক্ত করতে হয়। নিজের জন্যে একটি টেকসই যৌক্তিক দর্শন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মনের ক্ষমতার উপর দরুণ আস্থাশীল ছিলেন কান্ট। কিন্তু বাস্তবে মানুষের পক্ষে তার মনস্তত্ত্ব থেকে পালানো অসম্ভব দেখিয়ে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পরম সত্য বলে কিছু নেই। আমাদের সব ধারণাই আবিশ্যিকভাবে বস্তুনিষ্ঠ ও ব্যাখ্যামূলক। দেকার্তে যেখানে মানুষের মনকে এক মৃত পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ নাগরিক হিসাবে দেখেছেন, কান্ট জগৎ ও মানুষের ভেতরের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করে দিয়ে তাকে আমাদের নিজেদের মাথার ভেতর বন্দি করেছেন।২৪ মানুষকে অভিভাবকত্ব থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি এক বন্দিশালায় আটক করেছেন। প্রায়শঃই আধুনিকতা এভাবে এক হাতে কিছু দিয়ে আরেক হাতে কেড়ে নিয়েছে। যুক্তি আলোক ও মুক্তিদায়ী ছিল, কিন্তু তা নারী-পুরুষকে যে জগৎ তারা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছিল সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল।
পরম সত্যি বলে কিছুই যদি না থাকবে তাহলে ঈশ্বরের কী হবে? অন্যান্য ডেইস্টদের বিপরীতে কান্ট বিশ্বাস করতেন যে, উপাস্য ইন্দ্রিয়র নাগালের বাইরে অবস্থান করেন বলে মানুষের মনের অগম্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা অসম্ভব।২৫ পরমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুক্তির আসলে একাকী কিছুই করার থাকে না। একমাত্র যে সান্ত্বনা কান্ট যোগাতে পেরেছিলেন সেটা হলো, একই যুক্তিতে ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতা প্রমাণ করা অসম্ভব। কান্ট স্বয়ং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন, নিজের ধারণাসমূহকে ধর্মের প্রতি বৈরী মনে করেননি; তিনি ভেবেছিলেন, এসব ধারণা ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তির উপর নেহাত অযথার্থ নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করবে। ক্রিটিক অভ প্র্যাক্টিকাল রিজন-এর শেষে তিনি লিখেছেন, প্রত্যেক মানুষের অন্তরে নৈতিক বিধান খোদাই করার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন তিনি, স্বর্গের বিশালতার মতো যা তাঁকে বিস্ময় আর ভয়ে পরিপূর্ণ রাখে। কিন্তু ডেইস্ট ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে একমাত্র যে যৌক্তিক ভিত্তি তুলে ধরতে পেরেছিলেন তিনি সেটা খুবই সন্দেহজনক যুক্তি যে, এমন একজন উপাস্য ছাড়া ও পরকালের সম্ভাবনা না থাকলে আমাদের নৈতিক আচরণ করার কোনও কারণ দেখতে পান না তিনি। একেও প্রমাণ হিসাবে অসন্তোষজনকই বলতে হবে।২৬ কান্টের ঈশ্বর ছিলেন মানবীয় অবস্থায় জুড়ে দেওয়া পশ্চাদভাবনামাত্র। অন্তস্থঃ বিশ্বাস ছাড়া একজন যুক্তিবাদী কেন বিশ্বাস করতে যাবে তার কোনও প্রকৃত কারণ নেই। ডেইস্ট ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসাবে অতীত কালের নারী-পুরুষ যুক্তির উপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই কেবল প্রচলিত প্রতীক বা রেওয়াজের মাধ্যমে এক ধরনের পবিত্রের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারত- সেসবে কান্টের কোনও অবকাশ ছিল না। স্বর্গীয় আইনের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন কান্ট, তাঁর চোখে এটা ছিল মানুষের স্বায়ত্তশাসনের বর্বোরোচিত অস্বীকৃতি, তিনি অতীন্দ্রিয়বাদ, প্রার্থনা বা আচার অনুষ্ঠানের ভেতর যুক্তি খুঁজে পাননি।২৭ কাল্টের অস্তিত্ব ছাড়া ধর্ম ও স্বর্গের ধারণা ক্ষীণ, শুষ্ক ও সমর্থনের অযোগ্য।
কিন্তু তারপরেও পশ্চিমে, বৈপরীত্যমূলকভাবে সত্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে যুক্তির আবির্ভাব ধর্মীয় অযৌক্তিতার বিস্ফোরণের সাথে মিলে গিয়েছিল। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বহু প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক দেশ ও আমেরিকান কলোনিগুলোতে সংক্ষিপ্ত সময়ে জন্যে আবির্ভূত ব্যাপক উইচ ক্রেজ দেখিয়ে দিয়েছিল যে, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের কাল্টও সব সময় অন্ধকার শক্তিকে দূরে ঠেলে রাখতে পারে না। অতীন্দ্রিয়বাদ ও মিথলজি নারী-পুরুষকে অবচেতন বিশ্বের মোকাবিলা করতে শিখিয়েছিল। এটা দুর্ঘটনামূলক নাও হতে পারে যে, এমন একটা সময় ধর্মীয় বিশ্বাস এই ধরনের আধ্যাত্মিকতা বিসর্জন দিতে শুরু করলে অবচেতন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছিল। উইচ ক্রেজকে গোটা ক্রিশ্চান বিশ্বে নারী, পুরুষ ও ইনকুইজিটরদের সম্মিলিত ফ্যান্টাসি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। লোকে বিশ্বাস করে বসেছিল যে, দানোর সাথে তাদের যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে ও কোনও শয়তানি আচার আর বিকৃত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাতের অন্ধকারে তাদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছিল, ডাইনীরা ধর্মসভার বিকৃতিতে ঈশ্বরের বদলে শয়তানের উপাসনা করছে-প্রচলিত ধর্মের প্রতি ব্যাপকবিস্তারি অবচেতন বিদ্রোহ ফুটিয়ে তোলা পরিবর্তন হতে পারে। ঈশ্বরকে এত দূরবর্তী, অচেনা আর চাহিদা সম্পন্ন মনে হচ্ছিল যে, কারও কারও কাছে দানবীয় হয়ে উঠছিলেন তিনি; অবচেতেন ভীতি ও আকাঙ্ক্ষাসমুহ মানুষের দানবীয় রূপে ফুটিয়ে তোলা শয়তানের কাল্পনিক মূর্তিতে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে।২৮ খোদ ক্রেজের অবসান হওয়ার আগ পর্যন্ত উইচক্র্যাফটের দায়ে দণ্ডিত হাজার হাজার নারী-পুরুষকে হয় ফাঁসি দেওয়া হয়েছে নয়তো শূলে চড়িয়ে মারা হয়েছে। মনের এইসব গভীর স্তরসমূহকে বিবেচনায় না নেওয়া নতুন বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ এই বিকারগ্রস্ত বিস্ফোরণকে সামাল দিতে ছিল অক্ষম। এক বিশাল ভীতিকর ও ধ্বংসাত্মক যুক্তিহীনতাও আধুনিক অভিজ্ঞতার অংশ ছিল।
