এভাবে বিজ্ঞান ও বাধাহীন যুক্তিবাদ একসাথে সামনে অগ্রসর হওয়ার এমন একটা সময়ে মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিথলজিহীন বাস করতে বাধ্য হওয়া বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কাছে জীবন হয়ে পড়ছিল অর্থহীন। ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর একজন ছিলেন, কিন্তু সকল বাস্তবসঙ্গত কারণেই ঈশ্বর নাও থাকতে পারেন। লুথারের মতো হবস ভৌত বিশ্বকে ঈশ্বরহীন মনে করেছেন। হবস বিশ্বাস করতেন, মানব ইতিহাসের উষা লগ্নে ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন, আবার একেবারে অন্তিমে তাই করবেন। কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত আমাদের তাঁকে ছাড়াই এগিয়ে যেতে হবে, যেমন বলা হয়েছে, অপেক্ষা করতে হবে, অন্ধকারে।” প্রচণ্ডভাবে ধার্মিক মানুষ ফরাসি দার্শনিক ব্লেইজ পাসকার্ল (১৬২৩-৬২)-এর চোখে আধুনিক বিজ্ঞানের হাতে উন্মুক্ত অসীম বিশ্বজগতের শূন্যতা ও ‘চিরন্তন নীরবতা’ নিখাঁদ ভীতির জাগরণ ঘটিয়েছে:
যখন মানুষের অন্ধ ও করুণ অবস্থা দেখি, যখন গোটা মহাবিশ্বকে মৃতের মতো ও মানুষকে আলোহীন দেখি, যেন তাকে মহাবিশ্বের এক কাণে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, যেন কে তাকে ওখানে নিয়ে গেছে তার জানা নেই, তাকে কী করতে হবে, মৃত্যুর পর কী পরিণতি হবে, কোনও কিছুই জানার মতো ক্ষমতা তার নেই, ঘুমের ভেতর কোনও ভয়াল নির্জন দ্বীপে নিয়ে যাওয়া কারও মতো সত্রাসে আলোড়িত হই আমি, পালানোর কোনও উপায় ছাড়াই জেগে উঠে দিশাহারা অবস্থা হয় যার। তখনই এমন করুণ অবস্থাও মানুষকে হতাশায় ঠেলে দেয় না দেখে বিস্মিত হই।১৯
এক বিশাল বাস্তব উপায়ে আধুনিক বিশ্বে যুক্তি ও লোগোস নারী-পুরুষের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাচ্ছিল, কিন্তু মানবীয় প্রকৃতির কারণেই এপর্যন্ত মিথোসের এখতিয়ারে থাকা উদ্ভূত বিভিন্ন চূড়ান্ত প্রশ্নের মোকাবিলা করার যোগ্যতা মানুষের ছিল না। এর ফলে পাসকাল বর্ণিত হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা আধুনিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তবে সবার জন্যে নয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিক আলোকনের অন্যতম পথিকৃৎ জন লক (১৬৩২-১৭২৪)-এর পাসকালের মতো অস্তিত্বমূলক কোনও উদ্বেগ ছিল না। জীবন ও মানুষের যুক্তির উপর তাঁর বিশ্বাস ছিল প্রশান্ত ও আস্থাময়। ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে কোনও সন্দেহ ছিল না তাঁর মনে, যদিও তিনি বুঝতেন আমাদের ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার বাইরে অবস্থানকারী একজন উপাস্যের বাস্তবতা প্রমাণ করা বেকনের অভিজ্ঞতাজাত পরীক্ষায় উতরে যায় না। সম্পূর্ণ যুক্তির উপর নির্ভরশীল লকের ধর্ম কোনও কোনও মারানোর উদ্ভাবিত ডেইজম-এর অনুরূপ ছিল। তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন, স্বাভাবিক প্রকৃতি একজন স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ তুলে ধরে এবং যুক্তিকে ঠিক মতো মুক্তভাবে প্রকাশিত হতে দেওয়া হলে সবাই নিজ থেকেই সত্যি আবিষ্কার করতে পারবে। মিথ্যা ও কুসংস্করাচ্ছন্ন বিভিন্ন ধারণা এই পৃথিবীতে অনুপ্রবেশ করার একমাত্র কারণ পুরোহিতরা তাঁদের অর্থডক্সি মানুষের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে ইনকুইজিশনের মতো নিষ্ঠুর ও স্বেচ্ছাচারী বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করেছেন। সুতরাং, সত্যিকারের প্রকৃত ধর্মের খাতিরে রাষ্ট্রকে অবশ্যই সকল ধরনের বিশ্বাসকে সহ্য করতে হবে এবং স্রেফ বাস্তব প্রশাসন ও সরকার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। চার্চ ও রাষ্ট্রকে অবশ্যই আলাদা থাকতে হবে। একজনের কাজে আরেকজন হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এটা ছিল যুক্তির কাল। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, বিশ্বাস করেছিলেন লক, নারী-পুরুষ স্বাধীন হয়ে উঠবে এবং সত্য উপলব্ধি করতে পারবে।২০
এমনি উদার দৃষ্টিভঙ্গি আলোকনের সুর স্থির করে দিয়েছিল, আধুনিক, সেক্যুলার, সহিষ্ণু রাষ্ট্রের অনুপ্রেরণাদানকারী আদর্শে পরিণত হয়েছিল। ফরাসি ও জার্মান আলোকন দার্শনিকরাও ডেইজমের যৌক্তিক ধর্মে অবদান রেখেছেন, প্রাচীন পৌরাণিক প্রত্যাদিষ্ট ধর্মগুলোকে সেকেলে বিবেচনা করেছেন তাঁরা। যুক্তিই যেহেতু সত্যির একমাত্র কষ্টিপাথর, ‘প্রত্যাদেশে’র কাল্পনিক ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত পুরোনো ধর্মগুলো এইসব প্রাকৃতিক ধর্মের আনাড়ী ভাষ্য বলে সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। বিশ্বাসের যৌক্তিক হওয়া উচিত, যুক্তি দেখিয়েছেন ব্রিটিশ ধর্মবেত্তা ম্যাথ্যু টিন্ডাল (১৬৫৫-১৭৩৩) ও রোমান ক্যাথলিক থেকে ডেইস্টে পরিণত আইরিশ জন টোল্যান্ড (১৬৭০-১৭২২)। আমাদের স্বাভাবিক যুক্তিই পবিত্র সত্যে পৌছানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়, ক্রিশ্চান ধর্মকে অবশ্যই রহস্যময়, অতিপ্রাকৃত ও অলৌকিক থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রত্যাদেশের কোনও প্রয়েজন নেই, কারণ যে কোনও সাধারণ মুনষের পক্ষেই স্বাধীন যুক্তিজ্ঞানের বদৌলতে সত্যে উপনীত হওয়া খুবই সম্ভব।২১ নিউটন যেমন তুলে ধরেছেন, ভৌত মহাবিশ্বের পরিকল্পনা নিয়ে বাইবেলেই একজন স্রষ্টা ও প্রথম কারণের অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলে। মহাদেশে জার্মান ইতিহাসবিদ হারমান স্যামুয়েল রেইমারাস (১৬৯৪- ১৭৬৮) যুক্তি দেখিয়েছেন যে, জেসাস কখনওই নিজেকে ঐশী সত্তা বলে দাবি করেননি। তাঁর লক্ষ্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ছিল। একটি ‘অসাধারণ, সরল, মহান ও বাস্তব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা’ জেসাসকে স্রেফ একজন মহান নেতা হিসাবে শ্রদ্ধা করা উচিত। ২২
