ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের কাউন্সিলর ফ্রান্সেস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) রচিত দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অভ লার্নিং-এ এটা ইতিম্যধ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বেকন জোরের সাথে বলেছেন সত্যি, এমনকি ধর্মের পবিত্রতম মতবাদকেও অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞানের কঠোর সমালোচনামূলক পদ্ধতির অধীনে নিয়ে আসতে হবে। প্রমাণিত তথ্যে ও আমাদের ইন্দ্রিয়জ প্রমাণের বিরোধিতা করলে তাকে অবশ্যই ছুঁড়ে ফেলতে হবে। মানবজাতির জন্যে এক সুমহান ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে অতীতের কোনও মহান দর্শনকেই বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না। বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার মানবজাতির সব রকম ভোগান্তির অবসান ঘটাবে বলে বিশ্বাস করতেন বেকন, তিনি মনে করতেন এভাবে এই মাটির পৃথিবীতেই পয়গম্বরদের ভবিষ্যদ্বাণীর সেই রাজ্যের উদ্বোধন ঘটবে। বেকনের রচনায় আমরা নতুন যুগের উত্তেজনার দেখা পাই। তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, বিজ্ঞান ও বাইবেলের ভেতর কোনও বিরোধই লক্ষ করেননি। গালিলিও নিন্দিত হওয়ার অনেক বছর আগেই বিজ্ঞানের কর্মীদের পক্ষে সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার দাবি তুলেছিলেন তিনি, যাদের কর্মকাণ্ড সাধারণ মনমানসিকতার যাজককুলের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার মতো তুচ্ছ ব্যাপার নয়। দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অভ লার্নিং মিথ থেকে মুক্তির সন্ধান ও কেবল বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদই মানবজাতিকে সত্যের পথে নিয়ে যাবার শক্তির কথা ঘোষণাকারী স্বাধীনতার ঘোষণার মতো ছিল।
এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল এটা, আজকের আধুনিক পশ্চিমে আমরা বিজ্ঞানকে যেভাবে জানি তার সূচনাকে তুলে ধরে। এর আগে পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ব্যাখ্যাকে সব সময়ই এইসব আবিষ্কারের ব্যাখ্যা তুলে ধরা এক ধরনের সামগ্রিক মিথলজির সীমানায় পরিচালনা করা হত। চলমান মিথ সব সময়ই এইসব আবিষ্কারের নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের প্রয়োগের উপর বাধা আরোপ করত, রক্ষণশীল সমাজের সীমাবদ্ধতার দাবি ছিল এমনই। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ ইউরোপিয় বিজ্ঞানীরা প্রাচীন বাধা থেকে নিজেদের মুক্ত করে নিতে শুরু করেছিলেন। কৃষিভিত্তিক সমাজকে পেছনে টেনে ধরা বিভিন্ন উপাদান ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হওয়ায় তাদের আর এসবের কোনও প্রয়োজন ছিল না। বেকন জোরের দিয়ে বলেছিলেন, বিজ্ঞানই একমাত্র সত্যি। একথা স্বীকার্য, বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর ধারণা আমাদের চেয়ে বেশ ভিন্ন ছিল। বেকনের চোখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছিল প্রধানত তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহের একটা ব্যাপার, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অনুমান ও প্রকল্পের গুরুত্ব হিসাবে নেননি তিনি। তবে সত্যি সম্পর্কে বেকনের সংজ্ঞা বিশেষ করে ইংরেজিভাষী দেশগুলাতে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কেবল আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে পাওয়া তথ্যের উপরই আমরা নিরাপদভাবে নির্ভর করতে পারি, বাকি সব স্রেফ কল্পনা। বাস্তব ক্ষেত্রে প্রমাণ করা সম্ভব নয় বলে দর্শন, মেটাফিজিক্স, ধর্মতত্ত্ব, শিল্পকলা, কল্পনা, অতীন্দ্রিয়বাদ এবং মিথলজিকে কুসংস্কার হিসাবে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল।
জীবনের এই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ধারায় বিশ্বাস করেও আবার ধার্মিক হতে চেয়েছে যারা, ঈশ্বর ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে চিন্তা করার নতুন পথ খুঁজে পেতে হয়েছে তাদের। আমরা ফরাসি বৈজ্ঞানিক রেনে দেকার্তের (১৫৯৬-১৬৫০) দর্শনে পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গির মৃত্যু প্রত্যক্ষ করি। তিনি কেবল লোগোই, যুক্তির ভাষায় কথা বলতে পারতেন। নিঃসঙ্গতার দর্শন ছিল তাঁর। দেকার্তের চোখে মহাবিশ্ব প্রাণহীন একটা যন্ত্র, ভৌত জগৎ অনড় ও মৃত। স্বর্গ সম্পর্কে কোনও সংবাদ দেওয়ার ক্ষমতা এর নেই। মহাবিশ্বে একমাত্র মানুষের মনই জীবিত বস্তু, কেবল নিজের উপর নির্ভর করেই তা নিশ্চয়তা খুঁজে পেতে পারে। এমনকি আমাদের নিজস্ব সন্দেহ ও ভাবনার বাইরে আর কোনও কিছুর অস্তিত্ব আছে কিনা সে ব্যাপারে ও আমরা নিশ্চিত হতে পারি না। নিবেদিত প্রাণ ক্যাথলিক ছিলেন দেকার্তে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নিজেকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন তিনি; কিন্তু মিথ ও কাল্টের আদিম কাল্পনিক অতীতে ফিরে যেতে অস্বীকার গেছেন। পয়গম্বর ও পবিত্র টেক্সটের দর্শনের উপরও নির্ভর করতে পারেননি তিনি। নতুন যুগের মানুষ হিসাবে চলমান ধারণা মেনে নিতে পারেননি, বৈজ্ঞানিককে অবশ্যই তাঁর মনকে তেবুলা রাসা-য় পরিণত করতে হবে। গণিত বা অনস্বীকার্যভাবে ঠিক ‘যা হয়ে গেছে তাকে আর বদলানো যাবে না’ ধরনের স্বতঃসিদ্ধ প্রস্তাব থেকে যা পাওয়া যেতে পারে সেটাই একমাত্র সত্যি। যেহেতু পেছনে যাবার পথ রুদ্ধ, দেকার্তে কেবল একটু একটু করে সমনেই যেতে পেরেছেন।
একদিন সন্ধ্যায় কাঠের চুলোর পাশে বসে থাকার সময় কোগিতো, এরগো সাম আপ্তবাক্যটি তৈরি করেন দেকার্তে। একে স্বপ্রকাশিত বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। আমরা কেবল আমাদের মনের সন্দেহের অভিজ্ঞতার বিষয়েই নিশ্চিত হতে পারি। কিন্তু এটা মানুষের মনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এবং ‘সীমাবদ্ধতার’ এই চিন্তা কোনও অর্থ প্রকাশ করবে না যদি আমাদের ‘সম্পূর্ণতা’ সম্পর্কে কোনও পূর্বধারণা না থাকে। অস্তিত্বহীন সম্পূর্ণতা তত্ত্বগতভাবে স্ববিরোধী হয়ে দাঁড়াবে। এরগো-চূড়ান্ত সম্পূর্ণতা-ঈশ্বর—অবশ্যই বাস্তব হতে বাধ্য।’ এই তথাকথিত প্রমাণে কোনও আধুনিক অবিশ্বাসীর সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। এখানে এই জাতীয় প্রসঙ্গের ক্ষেত্রে খাঁটি যুক্তির অক্ষমতাও দেখা যায়। জগতে আমাদের কার্যকর কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। দেকার্তের মতো কোনও বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্যে পরিচালিত হলে বা আমরা জাগতিক বিশ্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে যতদূর সম্ভব বস্তুনিষ্ঠভাবে কোনও কিছু বিবেচনা করতে চাইলে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রয়োগ সম্ভব। কিন্তু আমরা যখন জানতে চাই এই জগৎ কেন টিকে আছে (আদৌ থাকলে!) বা জীবনের কোনও অর্থ আছে কিনা, যুক্তি খুব বেশি অগ্রসর হতে পারে না, আর আমাদের চিন্তার বিষয়টিও আমাদের কাছে অদ্ভুত হয়ে উঠতে পারে। শীতল বিশ্বে চুলোর পাশে আপন অনিশ্চয়তায় বন্দি দেকার্তে এমন একটি ‘প্রমাণ’ উচ্চারণ করেছেন যা কিনা আধুনিক মানুষের আধ্যাত্মিক টানাপোড়েন তুলে ধরা মানসিক ধাঁধার চেয়ে সামান্য বেশি কিছু।
