ব্যবহারের সাহায্যে পূর্বসুরিদের আবিষ্কারসমূহের সংশ্লেষ ঘটিয়েছিলেন। অভিকর্ষের ধারণাকে গোটা সৃষ্টিকে একসাথে ধরে রাখা এবং স্বর্গীয় বস্তুগুলোকে পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরতকারী বিশ্বজনীন শক্তি ধরে নিয়েছিলেন নিউটন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এই ব্যবস্থা ঈশ্বর, অর্থাৎ মহান ‘মেকানিকের’ অস্তিত্বের প্রমাণ রাখে, যেহেতু মহাবিশ্বের জটিল পরিকল্পনা দুর্ঘটনাক্রমে আবির্ভূত হয়নি।১২ প্রাক আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতো নিউটন মানুষের কাছে তাঁর ধারণামতে জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ও নিশ্চিত ধারণা পৌছে দিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁর ‘ব্যবস্থা’ বস্তুগত বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ মিলে গেছে এবং মানবীয় জ্ঞানকে আগের চেয়ে বহুদূর নিয়ে গেছে। কিন্তু লোগোসের জগতে সম্পূর্ণ মগ্ন নিউটনের পক্ষে মানুষকে এক ধরনের সত্যির পথ দেখানোর মতো অন্য আরও কোনও স্বজ্ঞা প্রসূত ধারণার অস্তিত্বে বিশ্বাস করা কঠিন করে তুলেছিল। তাঁর চোখে মিথলজি ও রহস্য ছিল চিন্তার আদিম ও বর্বর কায়দা। ‘এটা ধর্মের ক্ষেত্রে মানবজাতির উত্তপ্ত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশ,’ বিরিক্তর সাথে লিখেছেন তিনি। ‘সব সময়ই রহস্য প্রিয় হওয়ায় যেটা তারা সবচেয়ে কম বোঝে তাকেই বেশি পছন্দ করে। ১৩
ক্রিশ্চান ধর্মবিশ্বাস থেকে পৌরাণিক মতবাদসমূহকে উৎখাত করার প্রশ্নে এক রকম বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন নিউটন। তিনি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, ট্রিনিটি ও ইনকারনেশনের অযৌক্তিক মতবাদ ষড়যন্ত্র, জালিয়াতি ও প্রতারণার ফলমাত্র। তাঁর মহান গ্রন্থ ফিলোসোফিয়া নেচারালিস প্রিন্সিপিয়া (১৬৮৭) রচনার সময় ফিলোসফিকাল অরিজিন অভ জেন্টাইল ফিলোসফি নামে এক বিচিত্র নিবন্ধ লিখতে শুরু করেছিলেন নিউটন, যেখানে যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, নোয়াহ এক কুসংস্কারমুক্ত ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে কোনও প্রত্যাদিষ্ট ঐশীগ্রন্থ, রহস্য ছিল না, বরং কেবল একজন উপাস্য ছিলেন যাঁকে প্রাকৃতিক বিশ্বের যৌক্তিক ধ্যানের সাহায্যে জানা সম্ভব ছিল। পরের প্রজন্মসমূহ এই খাঁটি ধর্মকে কলুষিত করেছে। চতুর্থ শতাব্দীতে বিবেকহীন ধর্মবেত্তাদের হাতে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ট্রিনিটি ও ইনকারনেশনের মতবাদ যোগ হয়েছে এতে। প্রকৃতপক্ষেই, বুক অভ রেভেলেশন ট্রিনিটি মতবাদের উদ্ভবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছে—‘তোমাদের পাশ্চাত্যের এই অদ্ভুত ধর্ম,’ ‘তিনটি সমান ঈশ্বরের কাল্ট’–ধ্বংসের অশ্লীলতা।” কিন্তু তারপরেও ধার্মিক লোক ছিলেন নিউটন এবং তখনও একটি যৌক্তিক আদিম ধর্মের অনুসন্ধানে একটা মাত্রা পর্যন্ত রক্ষণশীল চেতানায় বন্দি ছিলেন। কিন্তু আগের প্রজন্মের মতো নিজের ধর্ম বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারছিলেন না তিনি। চতুর্থ শতাব্দীর গ্রিক অর্থডক্স ধর্মবিদগণ যে পরবর্তীকালের ইহুদি কাব্বালিস্টরা যেভাবে মিথোস তৈরি করেছিল ঠিক সেভাবে ট্রিনিটি মতবাদ সৃষ্টি করেছিলেন, এটা বুঝতে অক্ষম ছিলেন তিনি। গ্রেগরি অভ নিসা যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার তিনটি হিপোস্তাসে কোনও বস্তুগত সত্য নয়, বরং স্রেফ স্বর্গীয় প্রকৃতি (অউসা) মানবীয় মনের সীমাবদ্ধতার সাথে যেভাবে খাপ খাইয়ে নেন তাকে বর্ণনা করার জন্যে ‘আমাদের ব্যবহৃত পরিভাষা’ মাত্র।১৫ প্রার্থনা, ধ্যান ও লিটার্জির কাল্টিক পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে এটা কোনও অর্থ প্রকাশ করে না। কিন্তু নিউটন কেবল ট্রিনিটিকে যৌক্তিক পরিভাষায় দেখেছেন, মিথের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণা ছিল না, তাই এই মতবাদকে বাদ দিতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন তিনি। আজকের দিনে বহু ক্রিশ্চানের ট্রিনিটির ধর্মতত্ত্ব নিয়ে সমস্যার মুখে পড়ার বিষয়টি দেখায় যে, যুক্তির দিক দিয়ে তারা নিউটনের পক্ষপাতিত্বের অংশীদার। নিউটনের অবস্থান সম্পূর্ণ বোধগম্য। তিনি ছিলেন পশ্চিমের অন্যতম প্রথম সারির ব্যক্তি যিনি বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের পদ্ধতি ও অনুশীলন সম্পূর্ণ আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। তাঁর সাফল্য ছিল আকাশ-ছোঁয়া আর এর ফল ছিল যেকোনও ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মতোই আচ্ছন্নকারী। তিনি গবেষণার সময় বলতে অভ্যস্ত ছিলেন যে, ‘হে ঈশ্বর, আমার ধারণা আপনিই আপনার কথা ভাবেন!’১৬ আক্ষরিকভাবেই স্বজ্ঞাপ্রসূত অতীন্দ্রিয় সচেতনতার পক্ষে কোনও সময় ছিল না, যেটা হয়তো তাঁর প্রগতিকে ব্যাহত করতে পারত। পাশ্চাত্য পরীক্ষানিরীক্ষার চোখ ধাঁধানো ও প্রবল সাফল্যের কারণে মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তি ও মিথ পরস্পরের বেমানান হয়ে উঠছিল।
সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ প্রগতি এতটাই নিশ্চত হয়ে ওঠে যে, বহু ইউরোপিয়ই তখন সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎমুখী হয়ে উঠেছিল। অতীতকে সম্পূর্ণ নাকচ করে নতুন করে শুরু করার জন্যে প্রস্তুত থাকার বিষয়টি আবিষ্কার করছিল তারা। আগ্রসর হওয়ার গতিবেগ ছিল রক্ষণশীল চেতনার ভিত্তিভূমি পৌরাণিক পশ্চাদপসরণের ঠিক বিপরীত। নতুন বিজ্ঞানকে ভবিষ্যৎমুখী হতে হয়েছে: এভাবেই তা কাজ করে। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব কার্যকরভাবে প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পর টলেমিয় সৃষ্টি ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব ছিল না। পরে নিউটনের নিজস্ব ব্যবস্থা না হলেও তাঁর নিজের পদ্ধতি বাদ পড়ে যাবে। ইউরোপিয়রা সত্যি সম্পর্কে এক নতুন ধারণা গড়ে তুলছিল। নতুন নতুন আবিষ্কার সব সময়ই পুরোনো সত্যিকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে বলে সত্য কখনওই পরম হতে পারে না; একে অবশ্যই বাস্তবে, বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল এবং বাস্তব জীবনে এর কার্যকারিতা দিয়ে পরিমাপ করতে হত। প্রাথমিক কালের বিজ্ঞানের সাফল্য একে এমন কর্তৃত্ব দান করেছিল যা পৌরাণিক সত্যের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করেছিল, যা এই যোগ্যতার কোনওটাই পূরণ করতে পারেনি।
