লুথারের ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণের বিষয়টি এসেছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চের নিপীড়নমূলক পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর চরম বিতৃষ্ণা থেকে, নিজস্ব বিধি ও অর্থডক্সি চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে চার্চ রাষ্ট্রকে ব্যবহার করছিল। ঈশ্বর বিহীন পৃথিবী সংক্রান্ত লুথারের দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার ছিলেন না কালভিন। যিউইংলির মতো তিনি বিশ্বাস করতেন, মঠে আশ্রয় নেওয়ার বদলে ক্রিশ্চানদের উচিত হবে রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে অংশ নিয়ে তাদের ধর্মবিশ্বাসকে প্রকাশ করা। কালভিন উদীয়মান পুঁজিবাদী শ্রমনীতিকে শ্রমকে পবিত্র আহ্বান আখ্যা দিয়ে ব্যাপ্টাইজ করেছিলেন, মধ্যযুগীয় ভাবনার মতো একে পাপের স্বর্গীয় শাস্তি হিসাবে দেখেননি। কালভিন স্বাভাবিক জগতের প্রতি লুথারের বিতৃষ্ণারও অংশীদার ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরকে তাঁর সৃষ্টির মাঝে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব; জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল ও প্রাণীবিদ্যা পাঠ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। প্রাথমিক আধুনিক কালের কালভিনবাদীরা প্রায়শঃই ভালো বিজ্ঞানী ছিলেন। কালভিন বিজ্ঞান ও ঐশীগ্রন্থের ভেতর কোনও বিরোধিতা লক্ষ করেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাইবেল ভূগোল বা বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে কোনও আক্ষরিক জ্ঞান প্রচার করছে না, বরং সীমাবদ্ধ মানুষের বোধগম্য ভাষায় অনির্বচনীয়কে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। বাইবেলিয় ভাষা হচ্ছে বালবাতিভ (‘বালসুলভকথা’), অন্য কোনওভাবে প্রকাশ করার পক্ষে যারপরনাই জটিল সত্যের পরিকল্পিত সরলীকরণ।
প্রাক আধুনিক কালের মহান বিজ্ঞানীরা কালভিনের আস্থার অংশীদার ছিলেন। নিজেদের গবেষণা ও আলোচনাকে তাঁরা পৌরাণিক, ধর্মীয় কাঠামোতে দেখেছেন। পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩) বিশ্বাস করতেন তাঁর বিজ্ঞান ‘মানুষের চেয়েও বেশি ঐশ্বরিক।১০ কিন্তু তাসত্ত্বেও তাঁর হেলিওসেন্ট্রিক বিশ্বের মতবাদ প্রাচীন পৌরাণিক ধারণার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড আঘাত ছিল। তাঁর বিস্ময়কর প্রকল্প এতটাই চরম ছিল যে, তাঁর নিজ সময়ে খুব অল্প সংখ্যক লোকই তা হজম করতে পেরেছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মহাবিশ্বের কেন্দ্ৰে অবস্থানের বদলে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ আসলে সূর্যের চারপাশে প্রচণ্ড গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি যে স্বর্গীয় বস্তুসমূহ চলছে, সেটা স্রেফ উল্টোদিকে পৃথিবীর ঘোরার প্রক্ষেপণ। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল, কিন্তু জার্মান পদার্থবিদ ইয়োহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০) এর সমর্থনে গাণিতিক প্রমাণ যোগাতে সক্ষম হন, অন্যদিকে পিসিয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গালিলিও গালিলি (১৫৬৪-১৬৪২) টেলিস্কোপের সাহয্যে গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে কোপার্নিকাসের প্রকল্প হাতে কলমে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি নিজেই এই যন্ত্রটির উন্নতি সাধন করেন। ১৬১২ সালে গালিলিও যখন তাঁর আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করলেন, বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। ইউরোপের সমস্ত লোক নিজেরা টেলিস্কোপ বানিয়ে স্বর্গ পর্যবেক্ষণ শুরু করেছিল।
ইনকুইজিশন গালিলিওকে স্তব্ধ করে দেয়। মত প্রত্যাহারে বাধ্য করে তাঁকে। কিন্তু তাঁর কিছুটা রগচটা স্বভাবও সাজা প্রাপ্তিতে কিছু অবদান রাখে। প্রাথমিক আধুনিক কালে মানুষ সহজাতভাবে বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেনি। কোপার্নিকাস যখন ভাটিকানে প্রথমবারের মতো তাঁর প্রকল্প পেশ করেন, পোপ একে অনুমোদন দিয়েছিলেন। এই তত্ত্বে কালভিনের কোনও সমস্যা হয়নি। বিজ্ঞানীগণ তাঁদের অনুসন্ধানকে আবিশ্যিকভাবে ধর্মীয় বিবেচনা করেছেন। এযাবত কোনও মানুষেরই জানার সুযোগ হয়নি, এমন সব রহস্য উন্মোচন করে চলার সময় কেপলার নিজেকে ‘স্বর্গীয় উন্মাদনায়’ আচ্ছন্ন মনে করেছেন, গালিলিও নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁর গবেষণা ঐশী অনুপ্রেরণাজাত।” তখনও তাঁরা নিজেদের বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মানানসই দেখতে পাচ্ছিলেন, মিথোস যেমন ছিল লোগোস-এর সম্পূরক।
তারপরেও বিপ্লবের সূচনা ঘটিয়েছিলেন কোপার্নিকাস। মানুষ আর কখনওই আর আগের মতো তাদের দেখতে বা তাদের ধারণাকে বিশ্বাস করতে পারবে না। এতদিন পর্যন্ত লোকে নিজেদের ইন্দ্রিয়জ প্রমাণের উপর নির্ভর করতে সক্ষম ভাবত। বিশ্বের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্যকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে তারা, তবে এইসব বাহ্যিক চেহারা একটি বাস্তবতার অংশ বলে নিশ্চিত ছিল। জীবনের মৌলিক বিধান সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করার জন্যে বিকশিত মিথসমূহ তাদের অভিজ্ঞতার সত্যের সাথে মানানসই ছিল। ইলিউসিসের গ্রিক উপাসকরা পারসেফোনের কাহিনীকে তাদের পালন উপযোগি ফসলের মৌসুমের সাথে মেলাতে পেরেছিল; কাবাহকে ঘিরে প্রতীকীভাবে দৌড়ে বেড়ানো আরবরা পৃথিবীকে ঘিরে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথের সাথে নিজেদের এক রেখায় নিয়ে আসতে পারত এবং এভাবে অস্তিত্বের মৌল নীতিমালার সাথে ছন্দবদ্ধ থাকার কথা ভাবত। কিন্তু কোপার্নিকাসের পর সন্দেহের বীজ রোপিত হয়েছিল। প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে, পৃথিবী, যাকে স্থির মনে হয়েছিল, আসলে প্রবল বেগে চলছে; গ্রহগুলোকে ঘুরছে মনে হওয়ার কারণ লোকে সেগুলোর প্রতি তাদের নিজস্ব দৃষ্টি প্রক্ষেপিত করছিল: যাকে বাস্তবভিত্তিক ধরে নেওয়া হয়েছিল তা আসলে সম্পূর্ণই ভাবগত ছিল। যুক্তি আর মিথ আর এক তলে রইল না; প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানীর আবিষ্কৃত নিবিড় লোগোস যেন সাধারণ মানুষের ধারণাকে অবমূল্যায়িত করতে শুরু করেছিল এবং ক্রবর্ধমান হারে তাদের শিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভরশীল করে তুলছিল। মিথ যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ড জীবনের অত্যাবশ্যক অর্থের সাথে আবদ্ধ হিসাবে দেখিয়েছে, নতুন বিজ্ঞান হঠাৎ করেই নারী-পুরুষকে মহাবিশ্বের এক প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছিল। তারা আর বস্তুনিচয়ের কেন্দ্রে ছিল না, বরং মহাবিশ্বের এক বৈশিষ্ট্যহীন গ্রহে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের, যা আর তাদের প্রয়োজনকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছিল না। এক বিষণ্ণ দৃশ্য ছিল এটা, যার সম্ভবত নতুন সৃষ্টিবিজ্ঞানকে পুরোনটির মতো অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্যে একটা মিথের প্রয়োজন ছিল কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান মিথলজিকে অপদস্থ করতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) পরীক্ষণ ও রহস্য উদ্ধারের বিকাশমান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবল ব্যবহারের
