যিউইংলি ও কালভিনও তাঁদের মাঝে নবজন্ম লাভ করার বোধ জাগানো এক নতুন ধর্মীয় দর্শনের দেখা পাওয়ার আগে চরম অক্ষমতার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা দুজনই নিশ্চিত ছিলেন যে নিজেদের নিস্তার লাভের জন্যে তাঁদের করার মতো কিছুই নেই, মানবীয় অস্তিত্বের দুঃখকষ্টের সামনে তাঁরা সম্পূর্ণ অসহায়। দুজনই ঈশ্বরের পরম সার্বভৌমত্বের উপর জোর দিয়েছেন, আধুনিক মৌলবাদীরা পরবর্তী সময়ে প্রায়ই যেমন করবে। লুথারের মতো যিউইংলি ও কালভিনকে নিজেদের ধর্মীয় জগৎ পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছে। এমনকি অলক্ষে কিন্তু অপরিবর্তনীয়ভাবে ব্যাপক পরিবর্তনের অধীন হয়ে পড়া বিশ্বের পরিস্থিতির সাথে ধর্মকে মানানসই করে তোলার জন্যে অনেক সময় চরম ব্যবস্থার আশ্রয়ও নিতে হয়েছে তাঁদের।
সেই সময়ের মানুষ হিসাবে সংস্কারকগণ ঘটে যাওয়া পরিবর্তনসমূহকে তুলে ধরেছেন। রোমান ক্যাথলিক চার্চ ত্যাগ করে তাঁরা এই পর্যায় থেকে পাশ্চাত্য ইতিহাসকে তুলে ধরা অন্যতম প্রাথমিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা যেমন দেখব, নতুন রীতি স্বায়ত্তশাসন ও পূর্ণাঙ্গ মুক্তির দাবি করেছে এবং এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারকগণও ক্রিশ্চানদের পক্ষে একই দাবি করেছেন, যাদের অবশ্যই চার্চের শাস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই পছন্দ মোতাবেক বাইবেল পাঠ ও ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা থাকতে হবে। (অবশ্য তাঁদের শিক্ষার বিরোধিতাকারীর বেলায় তিন জনই অনমনীয় হয়ে উঠতে পারতেন: লুথার বিশ্বাস করতেন যে ‘ধর্মদ্রোহমূলক’ বই পুড়িয়ে ফেলা উচিত, আর কালভিন ও যিউইংলি ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা করতে প্রস্তুত ছিলেন)। তিনজনই দেখিয়েছেন যে, এই যুক্তির কালে ধর্মের প্রাচীন প্রতীকী উপলব্ধি ভেঙে পড়তে যাচ্ছিল। রক্ষণশীল আধ্যাত্মিকতায় কোনও প্রতীক ঈশ্বরের বাস্তবতায় অংশ গ্রহণ করত, নারী-পুরুষ পার্থিব বস্তুতে পবিত্রকে অনুভব করত; প্রতীক ও পবিত্র এভাবে ছিল অবিচ্ছেদ্য। মধ্যযুগে ক্রিশ্চানরা সাধুদের রেলিক্সে স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা লাভ করেছে ইউক্যারিস্টিক রুটি ও মদকে অতীন্দ্রিয়ভাবে ক্রাইস্টের সাথে অবিচ্ছেদ্য মনে করেছে। কিন্তু এখন সংস্কারগণ ঘোষণা দিয়েছেন যে, রেলিক্সগুলো আসলে প্রতিমা, ইউক্যারিস্ট ‘স্রেফ’ প্রতীক, ধর্মসভা একে অতীন্দ্রিয়ভাবে উপস্থিত করা ক্যালভারির উৎসর্গের স্মারক নয়, বরং একটা সাধারণ স্মৃতিচিহ্নমাত্র। তাঁরা এমনভাবে ধর্মের মিথ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিলেন যেন সেগুলো লোগোই; মানুষ যেমন দ্রুততার সাথে সংস্কারকদের অনুসরণ করেছে তাতে বোঝা যায় ইউরোপের ক্রিশ্চানদের অনেকেই অতীন্দ্রিয় সংবেদনশীলতা খোয়াতে শুরু করেছিল।
ধীরে ধীরে সেক্যুলারাইজ হতে শুরু করেছিল ইউরোপের জীবন। প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারকগণ ধর্মীয় প্রয়াসের প্রাবল্য সত্ত্বেও সেক্যুলারাইজ হতে চলছিলেন। সংস্কারকগণ রক্ষণশীলের মতোই প্রাথমিক উৎস অর্থাৎ বাইবেলে ফিরে যাবার দাবি করলেও আধুনিক কায়দায় ঐশীগ্রন্থ পাঠ করছিলেন তাঁরা। সংস্কৃত ক্রিশ্চানদের স্রেফ নিজের বাইবেলের উপর ভরসা করে একাকী ঈশ্বরের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে, কিন্তু মুদ্রণের উদ্ভাবনের ফলে প্রত্যেকের পক্ষে একটা বাইবেল যোগাড় সহজ হয়ে ওঠা ও তাদের বাইবেল পাঠে সক্ষম করে তোলা সেই সময়ের বিকাশ লাভ করা সাহিত্যের আগে এটা সম্ভব ছিল না। ক্রমবর্ধমান হারে তথ্যের অনুসন্ধানে ঐশীগ্রন্থসমূহ আক্ষরিকভাবে পাঠ করা হচ্ছিল, ঠিক যেভাবে আধুনিকায়িত প্রটেস্ট্যান্টরা অন্যান্য টেক্সট পাঠ শিখছিল। নীরব, একাকী পাঠ ক্রিশ্চানকে ব্যাখ্যার ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতি ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করবে। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উপর গুরুত্বারোপ সত্যকে আধুনিক পাশ্চাত্য মানসিকতার বৈশিষ্ট্য অধিকতর ভাবগত করে তুলতে সাহায্য করবে। কিন্তু বিশ্বাসের গুরুত্বের প্রতি জোর দিলেও লুথার ভীষণভাবে যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি যেন বুঝতে পেরেছিলেন যুক্তি আসন্ন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের প্রতি বৈরী হয়ে উঠতে পারে। তাঁর রচনায়-যদিও কালভিনের রচনায় নয়-আমরা দেখতে পাই, যুক্তি ও মিথলোজির প্রাচীন সম্পূরকতার দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষয়ে যাচ্ছিল। স্বভাবজাত ঝগড়াটে কায়দায় লুথার সঘৃণায় অ্যারিস্টটল সম্পর্কে কথা বলেছেন, ইরাসমাসের বিরুদ্ধে নিন্দা ঝেড়েছেন, যাকে তিনি যুক্তির মূর্ত রূপ মনে করতেন, তিনি নিশ্চিত ছিলেন যুক্তি কেবল নাস্তিক্যবাদের দিকেই ঠেলে দিতে পারে। যুক্তিকে ধর্মীয় বলয় থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করতে গিয়ে লুথারই ছিলেন একে সেকুলারাইজকারী অন্যতম প্রথম ইউরোপিয়।
লুথারের চোখে ঈশ্বর যেহেতু চরম রহস্যময় ও গোপন, সুতরাং জগৎ ঐশী অস্তিত্ব হতে শূন্য। লুথারের দিউস অ্যাবসকন্দিতাসকে মানবীয় প্রতিষ্ঠান বা ভৌত বাস্তবতায় আবিষ্কার করা যাবে না। মধ্যযুগীয় ক্রিশ্চানরা চার্চে পবিত্রের অনুভূতি লাভ করেছিল, লুথার যাকে এখন অ্যান্টিক্রাইস্ট ঘোষণা করেছেন। এখন কি স্কলাস্টিক ধর্মতত্ত্ববিদদের (লুথারের তীব্র ক্রোধের লক্ষ্যও বটে) মতো করে মহাবিশ্বের অলৌকিক শৃঙ্খলা লক্ষ করে ঈশ্বরের জ্ঞান লাভ করা যাবে?’ লুথারের রচনায় ঈশ্বর এখন ধর্মীয় তাৎপর্যহীন হয়ে ওঠা ভৌত জগৎ থেকে সরে যেতে শুরু করেছিলেন। লুথার রাজনীতিকেও সেক্যুলারাইজ করেছেন। জাগতিক বাস্তবতা যেহেতু আধ্যাত্মিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিরোধী, চার্চ ও রাষ্ট্রকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে, প্রত্যেককে অন্যের সঠিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রকে সম্মান করতে হবে। লুথারের আন্তরিক ধর্মীয় দর্শন তাঁকে চার্চ ও রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতার পক্ষে কথা বক্তব্য দানকারী অন্যতম প্রথম ইউরোপিয়তে পরিণত করেছিল। কিন্তু তবু ধার্মিক হওয়ার এক নতুন উপায় হিসাবেই রাজনীতির সেক্যুলাইজেশন শুরু হয়েছিল।
