এই প্রক্রিয়ায় সামাজিক পরিবর্তন জড়িত ছিল। এজন্যে বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে বেশ নিচু স্তরে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করতে হয়েছে। সাধারণ লোক প্রিন্টার, মেশিনিস্ট ও ফ্যাক্টরির শ্রমিকে পরিণত হয়েছিল, তাদেরও কিছু মাত্রায় দক্ষতার আধুনিক মানদণ্ড অর্জন করতে হয়েছিল। অধিক সংখ্যক লোকের কিছু পরিমাণ শিক্ষার প্রয়োজন ছিল। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক সাক্ষরতা অর্জন করে, আর এটা ঘটার পর তারা অনিবার্যভাবেই সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর ভূমিকা দাবি করতে থাকে। আরও অধিকতর গণতান্ত্রিক ধারার সরকার আবশ্যক হয়ে উঠবে। কোনও জাতি তার সকল জনশক্তিকে আধুনিকায়িত করে এর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চাইলে তাকে ইহুদিদের মতো এ যাবৎ বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিকায়িত গোষ্ঠীসমুহকে মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে আসতে হবে। নব্য শিক্ষিত শ্রমিক শ্রেণী আর কখনওই প্রাচীন ক্ষমতা পরম্পরার কাছে নতি স্বীকার করবে না। পাশ্চাত্য সেক্যুলার সংস্কৃতিতে পবিত্র মূল্যবোধে পরিণত হওয়া গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা ও সর্বজনীন মানবাধিকারের আদর্শসমূহ জটিল আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল। এসব স্রেফ রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদদের স্বপ্নের চমৎকার আদর্শ ছিল না, বরং অন্তত অংশত হলেও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রয়োজনের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছিল। প্রাথমিক আধুনিক ইউরোপে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন ছিল আন্তসম্পর্কযুক্ত প্রক্রিয়ারই অংশ, প্রতিটি উপাদান অন্যটির উপর নির্ভরশীল ছিল। কোনও আধুনিক সমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রই সবচেয়ে দক্ষ ও ফলপ্রসু উপায় বলে প্রতীয়মান হয়েছিল, যেসব পূর্ব ইউরোপিয় দেশ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি গ্রহণ না করে বাইরের গোষ্ঠীসমূহকে মূলধারায় আনতে অধিকতর নির্মম কৌশল বেছে নিয়েছিল প্রগতির মিছিলে তাদের অনেক পেছনে পড়ে যাওয়া থেকেই এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।
সুতরাং, এটা ছিল একটা মুগ্ধকারী কাল, আবার কষ্টকর রাজনৈতিক পরিবর্তনের কালও ছিল তা, লোকে ধার্মিকতার সাথে একে আত্মস্থ করার প্রয়াস পেয়েছিল। এমনি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্পষ্টভাবে কাজ করছিল না বলে ধর্মবিশ্বাসের প্রাচীন মধ্যযুগীয় ধরনগুলো আর স্বস্তি যোগাতে পারছিল না। ষোড়শ শতাব্দীর ক্যাথলিক সংস্কারের মতো ধর্মকে আরও দক্ষ ও সংহত করে তোলারও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রাথমিক আধুনিক কালের সংস্কার দেখিয়েছে যে, ষোড়শ শতাব্দীতে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া বেশ ভালোভাবে ক্রিয়াশীল থাকলেও ইউরোপিয়রা তখনও রক্ষনশীল চেতনা ধারণ করছিল। আমাদের বিবেচিত মহান মুসলিম সংস্কারকদের মতো প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারকগণও অতীতে ফিরে যাবার মাধ্যমেই পরিবর্তনের কালে নতুন সমাধান খোঁজার প্রয়াস পাচ্ছিলেন। মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৩৬), জন কালভিন (১৫০৯-৬৪) ও হালদ্রিচ যিইংউলি (১৪৮৪- ১৫৩১), এঁরা প্রত্যেকেই ক্রিশ্চান ট্র্যাডিশনের ঝর্নাধারা আদ ফন্তাসের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছেন। ইবন তাঈমিয়াহ কোরান ও সুন্নাহর খাঁটি ইসলামে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে যেখানে মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্ব ও ফিকহ প্রত্যাখ্যান করেছেন, মার্টিন লুথার সেখানে একইভাবে মধ্যযুগীয় স্কলাস্টিক ধর্মতাত্ত্বিকদের আক্রমণ করে বাইবেল ও ফাদারস অভ চার্চের খাঁটি ক্রিশ্চান ধর্মে ফিরে যেতে চেয়েছেন। সুতরাং, রক্ষণশীল মুসলিম সংস্কারকদের মতো প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারকগণ ছিলেন একাধারে বিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীল। তখনও তাঁরা আসন্ন নতুন বিশ্বের অধীনে ছিলেন না, বরং বেশ ভালোভাবেই প্রাচীন কালে প্রোথিত ছিলেন।
কিন্তু তাসত্ত্বেও নিজ কালেরই মানুষ ছিলেন তাঁরা, এটা ছিল পরিবর্তনের সময়। গোটা এই গ্রন্থ জুড়ে আমরা দেখব, আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া নিদারুণ উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে। জগৎ বদলে যাবার সাথে সাথে মানুষ নিজেদের দিশাহারা ও পরাস্ত আবিষ্কার করে। ইন মিদিয়াস রেস-এ বসবাস করে সমাজ কোন দিকে এগোচ্ছে বুঝে উঠতে পারে না তারা, বরং সামঞ্জস্যহীনভাবে পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। পরিবর্তনের ব্যাপক চাপে তাদের জীবনকে কাঠামো ও তাৎপর্য প্রদানকারী প্রাচীন মিথোলজি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবার সাথে সাথে তারা আত্মপরিচয় হারানো ও বিবষকারী হতাশার অভিজ্ঞতা লাভ করে। আমরা যেমন দেখব, সবচেয়ে সাধারণ আবেগসমূহ হচ্ছে অসহায়ত্ব, নিশ্চিহ্নতার আতঙ্ক চরম পরিস্থিতিতে যা সহিংসতায় বিস্ফোরিত হতে পারে। লুথারের মাঝে আমরা এর খানিকটা দেখতে পাই। জীবনের গোড়ার দিকে যন্ত্রণাকর হতাশার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। মধ্যযুগীয় কোনও ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান ও অনুশীলনই তাঁকে মৃত্যুভয়ে সন্ত্রন্ত করে তোলা, তাঁর ভাষায়, ত্রিস্তিশিয়া (‘বিষাদ’)-কে স্পর্শ করতে পারছিল না, মৃত্যুকে তিনি সামগ্রিক নিশ্চিহ্নকরণ মনে করতেন। যখনই তাঁর উপর এই কালো ত্রাস নেমে আসত, তিনি আর ৯০ নম্বর শ্লোক পাঠ করতে পারতেন না, যেখানে মানব জীবনের বিস্তৃতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ও মানুষকে ঈশ্বরের ক্রোধ ও ক্ষোভ দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। গোটা জীবন মৃত্যুকে ঈশ্বরের ক্রোধের প্রকাশ হিসাবে দেখে এসেছেন লুথার। তাঁর বিশ্বাসে প্রতিপন্ন করার ধর্মতত্ত্বে মানবজাতিকে নিজ নিষ্কৃতি লাভে সম্পূর্ণ অক্ষম ও ঈশ্বরের দয়ার উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল বলে বর্ণনা করেছেন। কেবল নিজেদের অক্ষমতা উপলব্ধি করেই তারা রক্ষা পেতে পারে। বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পেতে পৃথিবীতেই যতবেশি ভালো কাজ করা সম্ভব সেটা করতে ভয়ঙ্কর এক কর্মযজ্ঞে মেতে উঠেছিলেন লুথার, কিন্তু ঘৃণায়ওo আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। তাঁর ঘৃণা পোপ, তুর্কি, ইহুদি, নারী ও বিদ্রোহী কৃষকদের উপরও চালিত হয়েছে-ধর্মতাত্ত্বিক সকল প্রতিপক্ষের কথা না বললেও চলে-লুথারের ক্রোধ আমাদের কালের অন্য সংস্কারকদের অনুরূপ হয়ে দাঁড়াবে, যাঁরা এক নতুন বিশ্বের বেদনার সাথে সংগ্রাম করেছেন এবং যাঁরা এমন এক ধর্ম বিকশিত করেছেন যেখানে ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা প্রায়শঃই অন্য মানুষের প্রতি ঘৃণা দিয়ে ভারসাম্য লাভ করে।
