কিন্তু তাসত্ত্বেও পাশ্চাত্য সমাজের পরিবর্তনের এই প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাপারটা এমন ছিল না। ক্রান্তিকালের অভিযাত্রী, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যে ধর্মকে সম্পূর্ণ উৎখাত করার বদলে তাঁরা আসলে ধার্মিক হওয়ার নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করছেন। এই অধ্যায়ে আমরা তাঁদের কিছু সমাধান পর্যালোচনা করে সেগুলোর গভীরতর তাৎপর্য বিবেচনা করব। তবে স্পষ্ট করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে আধুনিক চেতনার যাঁরা মুখপাত্রে পরিণত হয়েছিলেন তাঁরা নিজেরা এটা সৃষ্টি করেননি। ষোড়শ শতাব্দী নাগাদ ইউরোপে এবং পরে এর আমেরিকান উপনিবেশসমূহে একটি জটিল প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল যা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা ও জগৎকে দেখার দৃষ্টিকে বদলে দিচ্ছিল। প্রায়শঃই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ও অলক্ষে ঘটেছে। অসংখ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঠিক সেই মুহূর্তে চূড়ান্ত পরিবর্তনকারী মনে হয়নি এমন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ঘটনা ঘটছিল, কিন্তু সেগুলোর সম্মিলিত প্রভাব হয়ে দাঁড়াবে চূড়ান্ত। এসব আবিষ্কারই একটা বাস্তবভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক চেতনায় বৈশিষ্ট্যায়িত ছিল, যা ক্রমশঃ রক্ষণশীল পৌরাণিক রীতিনীতি অচল করে দিয়েছে এবং বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে ঈশ্বর, ধর্ম, রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও সমাজ সম্পর্কে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা গ্রহণে প্ররোচিত করেছে। ইউরোপ ও আমেরিকান উপনিবেশসমূহকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এইসব পরিবর্তনকে স্থান করে দিতে হয়েছে। সুদূরপ্রসারী অন্য যেকোনও সামাজিক পরিবর্তনের কালের মতো সহিংস সময় ছিল এটা। চলছিল বিধ্বংসী যুদ্ধ এবং বিপ্লব, সহিংস উচ্ছেদ, প্রত্যন্ত এলাকায় বিরাজনীতিকরণ ও জঘন্য ধর্মীয় সংঘাত। তিন বছরের পরিক্রমায় ইউারোপিয় ও আমেরিকানদের তাদের সমাজ আধুনিকায়িত করতে নিষ্ঠুর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়েছে। রক্তপাত, নির্যাতন, ইনকুইজিশন, বিতাড়ন, দাসত্বে বন্দি এবং নিষ্ঠুরতার ঘটনা ঘটেছে। যেসব দেশ বর্তমানে আধুনিকায়নের বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেই একই রক্তাক্ত উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করছি আমরা।
কৃষির যৌক্তিকীকরণ ছিল এই প্রক্রিয়ার একটা ছোট্ট অংশ মাত্র, কিন্তু বর্ধিত ফসল ও স্বাস্থ্যবান গবাদিপশুর দল প্রত্যেকের জীবনের উপর প্রভাব ফেলেছে। অন্য আরও বিশেষায়িত উন্নয়নও ছিল। সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি বানাতে শুরু করেছিল মানুষ: কম্পাস, টেলিস্কোপ, ম্যাগনিফাইং লেন্স, ইত্যাদি এক নতুন জগৎকে তুলে ধরেছে এবং আরও উন্নত ম্যাপ, চার্ট ও নৌপরিচালনার কৌশল তৈরির কাজে লাগানো হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ওলন্দাজ মাইক্রোস্কোপিস্ট আন্তনি ভ্যান লিভেনহোক প্রথমবারের মতো ব্যাক্টেরিয়া, স্পারমাতোযা এবং অন্যান্য অণুজীব প্রত্যক্ষ করেন; তাঁর পর্যবেক্ষণ একদিন প্রজনন ও বিকৃতির প্রক্রিয়ার উপর নতুন আলো ফেলবে। কেবল রোগ দুরীকরণেই এর বাস্তবভিত্তিক প্রভাব পড়বে না, বরং জীবন-মৃত্যুর মৌলিক এলাকাগুলোকেও পৌরাণিক উপাদান হতে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। ওষুধ বিজ্ঞান সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে শুরু করেছিল; উনবিংশ শতাব্দীর বেশ অনেকটা সময় পর্যন্ত অন্ধের মতো থেরাপি প্রয়োগ অব্যাহত থাকলেও সপ্তদশ শতাব্দীতে পয়ঃনিষ্কাষণের ব্যাপারে সচেতনতা বেড়ে উঠছিল এবং প্রথমবারের মতো বেশ কিছু রোগ শানাক্ত করা হয়েছিল। ভূ-বিজ্ঞানের বিকাশ সূচিত হয়েছিল, ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির মতো বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আলোচনা এইসব ঘটনা সংক্রান্ত পৌরাণিক বিবেচনাকে পিছনের কাতারে ঠেলে দেবে। যান্ত্রিক সরঞ্জামের উন্নতি ঘটে। ঘড়ি ও হাতঘড়ি আরও বেশি মাত্রায় নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে। এই উন্নয়ন সময়ের সেক্যুলারাইজেশনের দিকে নিয়ে যাবে। গাণিতিক ও পরিসংখ্যানিক কৌশলের প্রয়োগ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ধারণা যোগাচ্ছিল: ১৬৫০ ও ১৬৬০ এর দশকে ‘সম্ভাব্য’ শব্দটির অর্থ বদলে যেতে শুরু করে। এটা আর রক্ষণশীল কালের মতো ‘কর্তৃপক্ষের সমর্থনপুষ্ট’ বোঝানোর বদলে ‘সব আলামতের ভিত্তিতে সম্ভাব্য’ হয়ে দাঁড়াল। ভবিষ্যত সম্পর্কে এই স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি ও আস্থা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও আমলাতান্ত্রিক যৌক্তিকীকরণের এক নতুন যাত্রায় প্ররোচিত করবে। ব্রিটিশ পরিসংখ্যানবিদ উইলিয়াম পেরি এবং জন গ্রান্ট বিশেষ করে জীবায়ুর ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইউরোপের লোকজন জীবন বীমা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল।’ এসবই উৎসগতভাবে রক্ষণশীল চেতনার পরিপন্থী।
এসব উন্নয়নের কোনওটিকেই আলাদাভাবে চূড়ান্ত মনে হয়নি, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এসবের প্রভাব ছিল আমূল পরিবর্তন সুলভ। ১৬০০ সাল নাগাদ ইউরোপে এমন ব্যাপক মাত্রায় উদ্ভাবন ঘটছিল যে প্রগতিকে অপরিবর্তনীয় মনে হয়েছে। কোনও একটি ক্ষেত্রে আবিষ্কার প্রায়শঃই অন্য ক্ষেত্রে আবিষ্কার উস্কে দিত। প্রগতি অপ্রতিরোধ্য গতিবেগ অর্জন করেছিল। জগতকে অপরিবর্তনীয় ও মৌলিক বিধির অধীন ভাবার বদলে ইউরোপিয়রা আবিষ্কার করছিল যে প্রকৃতিকে বিস্ময়করভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে তারা। পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, এমনভাবে তাদের বস্তুগত প্রয়োজন মেটাচ্ছে যেমনটা আগে কখনও পারেনি। কিন্তু জনগণ জীবনের যৌক্তিকীরণের সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার সাথে সাথে লোগোস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল ও মিথোস হয়ে গেল তুচ্ছ। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল মানুষ। ভীতিকর পরিণাম ছাড়াই পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারছিল তারা। উদাহরণ স্বরূপ, অব্যাহত উদ্ভাবনের উপর ভিত্তি করে এবং বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবার দৃঢ় আশাবাদ নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে পুনর্বিনিয়োগে প্রস্তুত ছিল ধনীকশ্রেণী। পুঁজিবাদী অর্থনীতি পাশ্চাত্যকে অনির্দিষ্টভাবে এর সম্পদ প্রতিস্থাপিত করতে সক্ষম করে তুলেছে, ফলে কৃষি ভিত্তিক প্রাচীন সমাজগুলোর সীমাবদ্ধতা হতে মুক্ত হয়ে গেছে। সমাজের এই যৌক্তিকীকরণ ও প্রযুক্তিকরণ শিল্প বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে যখন, সেই সময় নাগাদ পশ্চিমারা অব্যাহত প্রগতি সম্পর্কে এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল যে অনুপ্রেরণার জন্যে তারা অতীতের দিকে তাকানোর বদলে জীবনকে বরং ভবিষ্যতের আরও বৃহত্তর সাফল্যের দিকে ভীতিহীন অগ্রযাত্রা হিসাবে দেখেছে।
