সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাষ্ট্রের দুর্বলতা পুষিয়ে দিতে পারবে এমন একটা আইনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল, নেমে আসছিল অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা এবং পরবর্তীকালের শাহদের অযোগ্যতা রাষ্ট্রকে নাজুক করে তুলেছিল। ১৭২২ সালে আফগান গোত্রগুলো ইস্ফাহানে হামলা চালায়, নেহাত অসম্মানের সাথে আত্মসমর্পণ করে শহরটি। এক গোলযোগের যুগে প্রবেশ করে ইরান। কিছুদিনের জন্যে এমনও মনে হয়েছিল যে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে এর অস্তিত্বও বুঝি থাকবে না। উত্তর দিক থেকে আগ্রাসন চালায় রাশানরা, পশ্চিম থেকে অটোমানরা। সুলতান হুসেইন শাহর তৃতীয় ছেলে দ্বিতীয় তাহমাস্প অবশ্য ইস্ফাহানের অবরোধ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। ইরানি আফসার গোত্রের সর্দার নাদির খানের সহায়তায় আগ্রাসীদের বিতাড়নে সফল হন তিনি। ১৭৩৬ সালে নাদির খান তাহমাস্পকে উৎখাত করে নিজেকেই সম্রাট ঘোষণা করেন। ১৭৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত নিষ্ঠুর কিন্তু প্রায়শঃই দক্ষতার সাথে দেশটি শাসন করেছেন তিনি। তুর্কমান কাজার গোত্রের আকা মুহাম্মদ খান নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেওয়ার আগ পর্যন্ত এক অন্ধকার অরাজক অন্তবর্তীকালীন সময় উপস্থিত হয়েছিল। ১৭৯৪ সালে শাসন সংহত করতে সক্ষম হন তিনি।৪ বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ক্ষমতায় অবস্থান করে নতুন কাজার রাজবংশ।
এই বিষণ্ন বছরগুলোয় আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পরিবর্তন ঘটে। নাদির খান ইরানে আবার সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন, ফলে নেতৃস্থানীয় উলেমারা ইস্ফাহান ছেড়ে ইরাকে অটোমান সাম্রাজ্যের মাজার শহর নাজাফ ও কারবালায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। একে প্রথমে বিপর্যয় মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা উলেমাদের পক্ষে উপহার প্রমাণিত হয়েছে। কারবালা ও নাজাফে আরও বড় ধরনের স্বায়ত্তশাসনের অধিকারী হয়ে ওঠেন তাঁরা। তাঁরা রাজনৈতিক শাহদের নাগালের বাইরে ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন ছিলেন। ক্রমে দরবারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অনন্য অবস্থানে পৌঁছে বিকল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন। এই সময়ের দ্বিতীয় প্রধান পরিবর্তন ছিল বিশিষ্ট পণ্ডিত ওয়াহিদ বিহবেহানি (১৭০৫-৯২)-এর কিছুটা সহিংস পদ্ধতিতে অর্জিত উসুলিদের বিজয়। ইজতিহাদের ভূমিকা অনেক স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তিনি, জুরিস্টদের পক্ষে এর প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। উসুলি অবস্থান মেনে নিতে অস্বীকারকারী যেকোনও শিয়াকে বিধর্মী হিসাবে নিষিদ্ধ করা হত, বিরোধিতাকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছে। কারবালা ও নাজাফে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘাতে কিছু সংখ্যক আকবারি প্রাণ হারায়। ইস্ফাহানের অতীন্দ্রিয় দর্শনও বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। সুফিবাদকে এমন বর্বরভাবে দমন করা হয়েছিল যে, বিহবেহানির ছেলে আলি সুফি-ঘাতক নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু, আমরা যেমন দেখেছি, ধর্মীয় বিষয়ে জোরজবরদস্তি সাধারণত উল্টো ফল দেয়, অতীন্দ্রিয়বাদ আত্মগোপনে চলে যায় এবং স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে সংঘর্ষ চালিয়ে যাওয়া ভিন্নমতাবলম্বী ও বুদ্ধিজীবীদের ধ্যানধারণাকে আকার দিতে থাকে। বিহবেহানির বিজয় ইরানি উলেমাদের পক্ষে রাজনৈতিক বিজয় ছিল। অরাজকতার উত্তাল সময়ে উসুলি অবস্থান জনপ্রিয় ছিল, কেননা এটা কিছু পরিমাণ শৃঙ্খলা নিয়ে আসার ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্বের যোগান দিয়েছিল তাদের। মুজতাহিদগণ রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসতে সক্ষম ছিলেন, জনগণের মাঝে কখনওই ক্ষমতা হারাননি। কিন্তু ইমামদের আচরণ ও আদর্শ থেকে দূরবর্তী হওয়ায় স্বৈরাচারী উপায়ে অর্জিত বিহবেহানির বিজয় এক ধরনের ধর্মীয় পরাজয় ছিল।৫৬
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ অটোমান ও ইরানি সাম্রাজ্য উভয়ই বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। কৃষি নির্ভর সভ্যতার সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার অনিবার্য নিয়তি বরণ করে নিচ্ছিল এরা। অ্যাক্সিয়াল যুগের সময় থেকেই রক্ষণশীল চেতনা নারী-পুরুষকে গভীর স্তরে এই ধরনের সভ্যতার সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে সাহায্য করে এসেছে। এর মানে এই ছিল না যে, রক্ষণশীল সমাজগুলো স্থবির ও অদৃষ্টবাদী ছিল। এই আধ্যাত্মিকতা ইসলামি বিশ্বে ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সাফল্য বয়ে এনেছিল। কিন্তু এই রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক প্রয়াস এক ধরনের পৌরাণিক পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদিত হয়েছিল, যা ইউরোপে বিকাশ লাভ করতে থাকা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ম্যল্যবোধের কাছে অচেনা হয়ে দাঁড়াবে। আধুনিক ইউরোপের বহু আদর্শ মুসলিমদের পক্ষে অনুকূল হবে। আমরা দেখেছি, তাদের ধর্মবিশ্বাস এমন প্রবণতার বিকাশ ঘটাতে উৎসাহিত করেছিল যা আধুনিক পাশ্চাত্যের পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী প্রবণতার অনুরূপ: সামাজিক ন্যায় বিচার, সাম্যবাদ, ব্যক্তির স্বাধীনতা, মানবীয় ভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা, সেক্যুলার রাজনীতি, ব্যক্তিমুখী বিশ্বাস ও যৌক্তিক ধারণার চর্চা। কিন্তু নব্য ইউরোপের অন্যান্য বৈশিষ্টগুলো রক্ষণশীল রেওয়াজে গড়ে ওঠা মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ইউরোপিয়দের পেছনে পড়ে গিয়েছিল, এই সময় ইসলামি সাম্রাজ্যগুলো ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, সেগুলো ইউরোপিয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে নাজুক হয়ে দাঁড়ায়; এসব রাষ্ট্র বিশ্ব আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে প্রয়াস চালানোর প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে ভারতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে ব্রিটিশরা; এক নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল ফ্রান্স। ১৯শে মে, ১৭৯৮, নেপোলিয়ন বোনাপার্তে প্রাচ্যে ব্রিটিশ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্যে তুলন থেকে ৩৮,০০০ লোক ও ৪০০ জাহাজ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করল ফরাসী নৌবহর। ১লা জুলাই আলেকজান্দ্রিয়ার সৈকতে ৪,৩০০ সেনা অবতরণ করালেন নেপোলিয়ন, পরদিন ভোরের অল্প পরেই দখল করে নিলেন গোটা শহর।৫৭ এভাবে মিশরে একটা ঘাঁটি পেয়ে যান তিনি। সাথে করে পণ্ডিত, আধুনিক ইউরোপিয় সাহিত্যের একটা লাইব্রেরি, একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ও আরবী হরফঅলা একটা ছাপাখানা নিয়ে এসেছিলেন নেপোলিয়ন। পশ্চিমের নতুন বৈজ্ঞানিক, সেক্যুলারিস্ট সংস্কৃতি আক্রমণ হানল মুসলিম বিশ্বে, কোনও কিছুই আর আগের মতো থাকবে না।
০৩. ক্রিশ্চান: সাহসী নতুন জগৎ (১৪৯২–১৮৭০)
ইহুদিরা যখন স্পেন থেকে তাদের বহিষ্কারের বেদনাদায়ক পরিণতি নিয়ে সংগ্রাম করছে এবং মুসলিমরা তিনটি মহান সাম্রাজ্য গড়ে তুলছিল সেই একই সময়ে পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা এমন এক পথে পা রাখতে যাচ্ছিল যা তাদের প্রাচীন বিশ্বের পবিত্রতা ও নিশ্চয়তা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে। এটা ছিল এক উজেনাময় কাল, আবার অস্বস্তিকরও বটে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ক্রিশ্চান জগতের এক তৃতীয়াংশ অধিবাসীর প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল প্লেগের মহা মড়ক এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ভেতরকার শত বর্ষের যুদ্ধ ও ইতালিয় গৃহযুদ্ধের মতো অব্যাহত সংগ্রামে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল ইউরোপের দেশগুলো। ইউরোপিয়রা ১৪৫৩ সালে অটোমানদের হাতে ক্রিশ্চান বাইযান্তিয়ামের অধিকার, আভিগনন ক্যাপ্টিভিটির পাপাল কেলেঙ্কারী ও মহাবিবাদ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল—এই সময় অন্তত তিনজন পন্টিফ একই সময়ে নিজেদের সেইন্ট পিটারের উত্তরাধিকারী দাবি করে বসেছিলেন-অনেককেই যা প্রাতিষ্ঠানিক চার্চের উপর বিশ্বাস হারাতে প্ররোচিত করেছিল। সাধারণ মানুষ অস্পষ্টভাবে নিজেদের আর নিরাপদ ভাবতে পারছিল না, এখন আর আগের মতো করে ধার্মিক হতে পারছে না বলে আবিষ্কার করেছিল তারা। কিন্তু তারপরেও এটা আবার মুক্তি ও ক্ষমতায়নেরও একটা কাল ছিল। ইবারিয় অভিযাত্রীরা এক নতুন জগৎ আবিষ্কার করেছিল: জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা স্বর্গ উন্মুক্ত করছিলেন এবং এক নতুন কারিগরি দক্ষতা পরিবেশের উপর ইউরোপিয়দের হাতে বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ তুলে দিচ্ছিল এর আগে যা কেউই অর্জন করতে পারেনি। রক্ষণশীল চেতনা যেখানে নারী-পুরুষকে সতর্কতার সাথে নির্ধারিত সীমানার ভেতর অবস্থান করার শিক্ষা দিয়েছিল, পাশ্চাত্য ক্রিশ্চান জগতের নতুন সংস্কৃতি সেখানে দেখিয়ে দিয়েছিল, পরিচিত জগতের বাইরে পা রাখা সম্ভব, সেটা কেবল বেঁচে থাকার জন্যে নয়, বরং সমৃদ্ধি অর্জনের জন্যেও। শেষ পর্যন্ত প্রাচীন পৌরাণিক ধর্মকে অসম্ভব করে তুলবে তারা এবং পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে আসলে উৎসগতভাবে ধর্মবিশ্বাসের প্রতি বৈরী ছিল মনে হবে।
