কিন্তু ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করে। উলেমাগণ সাফাভিয় সাম্রাজ্যে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার সাথে সাথে অনেক বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ ও এমনকি গোঁড়া হয়ে উঠতে লাগলেন। শিয়া মতবাদের কিছু অধিকতর আকর্ষণীয় গুণাবলী চাপা পড়ে যায়। এই নতুন কঠোর পন্থা মূর্ত করে তোলেন সর্বকালের অন্যতম ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী উলেমা মুহাম্মদ বাকির মজলিসি (মৃ. ১৭০০)। শত শত বছর ধরে শিয়ারা ঐশীগ্রন্থের এক ধরনের উদ্ভাবনী প্রকৃতির কৌশল অনুসরণ করে এসেছে। কিন্তু অতীন্দ্রিয় ও দার্শনিক আঁচঅনুমানের প্রবল বিরোধী ছিলেন মজলিসি। দুটোই ছিল প্রাচীন নিগূঢ়বাদী শিয়া মতবাদের মূলধারা। তিনি ইরানে অবশিষ্ট সুফিদের উপর নিরলসভাবে নির্যাতনের সূচনা করেন ও ফালসাফাহ নামে পরিচিত দার্শনিক যুক্তিবাদ ও ইস্ফাহানে অতীন্দ্রিয় দর্শন দমন করার প্রয়াস পান। এভাবে অতীন্দ্রিয়বাদ ও দর্শনের প্রতি এক গভীর অবিশ্বাসের সূচনা করেছিলেন তিনি এখনও যা বর্তমান ইরানে টিকে আছে। কোরানের নিগূঢ় পাঠে মগ্ন হওয়ার বদলে শিয়া পণ্ডিতদের ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্স ফিকহর প্রতি মনোনিবেশে উৎসাহিত করা হয়েছে।
হুসেইনের সম্মানে আয়োজিত আচরিক মিছিলের অর্থও পাল্টে দিয়েছিলেন মজলিসি।” আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছিল এসব: এখন সবুজ কাপড়ে ঢাকা উটের পিঠে ইমামের পরিবারের প্রতিনিধি হিসাবে ক্রন্দনরত নারী ও শিশুরা বসে থাকে, সৈনিকরা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে, গভর্নর, গণ্যমান্য লোকজন ও মানুষের জটলা ইমাম ও তাঁর শাহাদৎ বরণকারী সহচরদের প্রতীক কফিন অনুসরণ করে, এরা ছুরি দিয়ে নিজেদের আঘাত হেনে আহত করে।৫ কারবালা কাহিনীর দারুণ আবেগঘন বর্ণনা-রাওদা-খানি (‘রাওদাতের আবৃত্তি’) নামে পরিচিত বিশেষ অনুষ্ঠানে ইরাকি শিয়া ওয়াইজ কাশিফট (মৃ. ১৫০৪) রচিত রাওদাহ আশ-শাহাদা রাওদা-খানি জমায়েতে আবৃত্তি করা হত, জনতা জোরে চিৎকার করে বিলাপ করত, কাঁদত। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জীবন দিয়ে লড়াই করার জনগণের ইচ্ছা তুলে ধরায় এইসব আচারের সবসময়ই এক ধরনের বিপ্লবী সম্ভাবনা ছিল। এখন অবশ্য, জনগণকে হুসেইনকে একটা নজীর হিসাবে দেখার জন্যে উৎসাহিত করার পরিবর্তে মজলিসি ও তাঁর যাজকগোষ্ঠী শিক্ষা দিতে লাগলেন যেন তাঁকে একজন পৃষ্ঠপোষক হিসাবে বিবেচনা করা হয় যিনি তাঁর মৃত্যুর জন্যে শোক প্রকাশ করার মাধ্যমে ভক্তি দেখাতে পারলে তাদের বেহেশতে গমন নিশ্চিত করতে পারবেন। এবার স্থিতাবস্থার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে আচার অনুষ্ঠানগুলো জনগণকে শক্তিমানের পক্ষে আনুকূল্য দেখিয়ে কেবল নিজেদের স্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখার শিক্ষা দিয়েছে। ৬ এটা ছিল পুরোনো শিয়া আদর্শের নপুংসকীকরণ ও অবমূল্যায়ন; এটা রক্ষণশীল রীতিনীতিকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। জনগণকে অস্তিত্বের মৌল বিধিবিধান ও ছন্দের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করার বদলে কাল্টকে কেবল বিপুল জনগোষ্ঠীকে সামাল দিয়ে রাখার কাজে লাগানো হয়েছে। এটা এমন এক পরিবর্তন ছিল যা সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে দেখায় যে, বিধ্বংসী রাজনৈতিক ক্ষমতা ধর্মের কী ক্ষতি করতে পারে।
মজলিসির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইস্ফাহানে মির দামাদ (মৃ. ১৬৩১) ও শিষ্য মোল্লাহ সম্রা (মৃ. ১৬৪০) হাতে বিকশিত অতীন্দ্রিয় দর্শন। সদ্রা এমন একজন চিন্তাবিদ ছিলেন ভবিষ্যৎ ইরানি প্রজন্মের উপর যার গভীর প্রভাব সৃষ্টি হবে।৪৭ মির দামাদ ও মোল্লাহ সদ্রা উলেমাদের কারও কারও নতুন অনমনীয় মনোভাবের দারুণ বিরোধী ছিলেন। একে তাঁরা শিয়া মতবাদ, এমনকি প্রকৃতপক্ষে সকল ধর্মের সামগ্রিক বিকৃতি বলে বিবেচনা করেছেন। প্রাচীন কালে শিয়ারা ঐশীগ্রন্থের গোপন অর্থ সন্ধানের সময় নীরবে মেনে নিয়েছিল যে স্বর্গীয় সত্যি সীমানাহীন, নতুন নতুন ধারণা সব সময়ই সম্ভব; কোরানের কোনও একক ব্যাখ্যা যথেষ্ট হতে পারে না। মির দামাদ ও মোল্লা সদ্রার চোখে সত্যিকারের জ্ঞান কোনওদিনই বুদ্ধিবৃত্তিক সমরূপতার ব্যাপার ছিল না। কোনও সাধু বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষই, তিনি যত মহান বা বিশিষ্টই হোন না কেন, সত্যির উপর একচেটিয়া অধিকার দাবি করতে পারেন না।
তাঁরা স্পষ্টভাবে রক্ষণশীল বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে মিথোলজি ও যুক্তি উভয়ই মানব জীবনের পক্ষে আবশ্যক, একটি দিয়ে সম্পূরক না হলে অপরটি হারিয়ে যায়। মির দামাদ ছিলেন স্বভাব বিজ্ঞানী এবং ধর্মতাত্ত্বিকও। মোল্লা সদ্রা উলেমাদের পৌরাণিক স্বজ্ঞার দর্শনকে খাট করার জন্যে ও যৌক্তিক চিন্তার গুরুত্বকে বিসর্জন দিতে সুফিদের সমালোচনা করেছেন। প্রকৃত দার্শনিককে অ্যারিস্টটলের মতো যুক্তিবাদী হতে হবে, কিন্তু তারপরই তাঁকে নিজেকে অতিক্রম করে সত্যের এক নিগূঢ় কল্পনা নির্ভর উপলব্ধিতে পৌঁছুতে হবে। উভয় চিন্তকই অবচেতনের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন, একে তাঁরা এমন এক পর্যায় হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা ইন্দ্রিয়জ ধারণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিমূর্ততায় অস্তিত্ববান। অতীতে সুফি দার্শনিকগণ এই মনস্তাত্ত্বিক অঞ্চলকে আলম আল-মিথাল বা খাঁটি ইমেজের জগৎ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। দিব্যদৃষ্টির বলয় এটা, আমরা যাকে অবচেতন বলব সেখান থেকে আগত, স্বপ্ন ও সম্মোহনী ইমেজারিতে যা মনের চেতন স্তরে উঠে আসে, কিন্তু অতীন্দ্রিয়দের কোনও কোনও অনুশীলন ও স্বজ্ঞামূলক চর্চার মাধ্যমেও যার নাগাল পাওয়া সম্ভব। মির দামাদ ও মোল্লা সদ্রা দুজনই জোর দিয়ে বলেছেন যে, যৌক্তিক বিশ্লেষণে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেলেও এইসব দিব্য দর্শন কেবল ধারণাগত কল্পনা নয়, বরং এসবের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতা রয়েছে। এগুলোকে ‘কাল্পনিক’ বলে অবাস্তব হিসাবে বাতিল করার বদলে-একজন আধুনিক যুক্তিবাদী যেমনটা করতে পারে-আমাদের উচিত হবে আমাদের অস্তিত্বের এই পার্থক্যের দিকে নজর দেওয়া। সচেতন নির্মাণের পক্ষে এর অবস্থান অনেক গভীরে, কিন্তু আমাদের আচরণ ও ধারণার উপর এর গভীর প্রভাব রয়েছে। আমাদের স্বপ্ন বাস্তব, এগুলো আমাদের একটা কিছু বলে; স্বপ্নে আমরা কাল্পনিক কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করি। মিথোলজি ছিল অবচেতনের অভিজ্ঞতাকে ইমেজারিতে সংগঠিত করার প্রয়াস, নারী-পুরুষকে যা এইসব মৌলিক অঞ্চলকে তাদের নিজস্ব সত্তার সাথে সম্পর্কিত করতে সফল করে তুলত। বর্তমানে লোকে অবচেতন মনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একই ধরনের ধারণা পেতে সাইকোঅ্যানালিস্টের শরণাপন্ন হয়ে থাকে। দামাদ ও মোল্লা সদ্রা জোরের সাথে বলেছেন যে, কেবল যৌক্তিকভাবে, প্রকাশ্যে ও আইনসম্মভাবে ধারণা করা কিছুই একমাত্র সত্যি নয়। এর একটা অন্তস্থঃ মাত্রা রয়েছে যা আমাদের স্বাভাবিক চেতন মনের কর্মকাণ্ড দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
