এটা অনিবার্যভাবে কোনও কোনও উলেমাকে কট্টরপন্থী শিয়াদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে দিয়েছিল। মোল্লা সদ্রাকে ইস্ফাহান থেকে বিতাড়িত করে তারা। দশ বছর কুমের কাছে এক ছোট গ্রামে বাস করতে বাধ্য হন তিনি। এই নির্জনবাসের সময় বুঝতে পারেন যে, অতীন্দ্রিয় দর্শনের প্রতি ভক্তি সত্ত্বেও ধর্মের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বড় বেশি বৃদ্ধিবৃত্তিক রয়ে গেছে। জুরিসপ্রুডেন্স (ফিকহ) বা বাহ্যিক ধর্মতত্ত্বের পাঠ কেবল ধর্ম সম্পর্কে আমাদের তথ্য যোগাতে পারে, এটা ধর্মীয় অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য আলোকন বা ব্যক্তিগত পরিবর্তন এনে দিতে পারে না। কেবল মনোসংযোগের অতীন্দ্রিয় অনুশীলন গুরুত্বের সাথে চর্চা শুরু ও আপন সত্তার মাঝে গভীরভাবে আলম আল-মিথালে অবতরণের পরই তাঁর হৃদয়ে ‘আগুন জ্বলে উঠেছিল’ এবং ‘স্বর্গীয় জগতের আলোক আমার সামনে জ্বলে ওঠে…আমি আগে বুঝতে পারিনি এমন সব রহস্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়ে উঠি,’ তাঁর মহৎ সৃষ্টি আল-আসফার আল-আরবা’হ-তে (দ্য ফোর জার্নিজ অভ সোউল) পরে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
সদ্রার অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা মানুষের পক্ষে এই জগতেই পূর্ণাঙ্গতা লাভ করা সম্ভব বলে নিশ্চিত করেছিল তাঁকে। কিন্তু রক্ষণশীল চেতনার প্রতি বিশ্বস্ত হওয়ায় তিনি যে সম্পূর্ণতার কথা কল্পনা করেছিলেন সেটা নতুন ও উচ্চতর এক পর্যায়ে উত্তরণ নয় বরং আব্রাহাম ও অন্যান্য পয়গম্বরের আদি খাঁটি দর্শনে প্রত্যাবর্তন ছিল। সকল অস্তিত্বের উৎস আল্লাহয়ও প্রত্যাবর্তন ছিল এটা। কিন্তু তাঁর মানে এই ছিল না যে অতীন্দ্রিয়বাদী এই জগৎকে ত্যাগ করেছেন। দ্য ফোর জার্নিজ অভ দ্য সোউল-এ এক ক্যারিশম্যাটিক রাজনৈতিক নেতার অতীন্দ্রিয় অভিযাত্রার বর্ণনা করেছেন তিনি। প্রথমে তাঁকে অবশ্যই মানুষের কাছ থেকে আল্লাহ’র উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে। এরপর স্বর্গীয় বলয়ে ভ্রমণ করবেন তিনি যতক্ষণ না আল্লাহ’র বিভিন্ন গুণাবলী নিয়ে ধ্যান করে সেগুলোর অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের ব্যাপারে সহজাত চেতনায় পৌঁছেন। এভাবে আল্লাহ’র মুখাবয়বের দিকে চোখ রেখে তিনি বদলে যান ও একশ্বরবাদের আসল অর্থ সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ইমামদের অনুভূত বোধের অনুরূপ এক অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন। তৃতীয় যাত্রায় নেতা আবার মানব জাতির কাছে ফিরে এসে আবিষ্কার করেন যে, এখন তিনি জগৎকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁর চতুর্থ ও চূড়ান্ত অন্বেষণ হচ্ছে এই জগতে আল্লাহ’র বাণী প্রচার করা, স্বৰ্গীয় আইন প্রতিষ্ঠার নতুন পথ বের করা ও আল্লাহ’র ইচ্ছা অনুযায়ী সমাজকে নতুন করে নির্মাণ করা।৫° এটা এমন এক দর্শন যা সমাজের পূর্ণতাকে যুগপৎ আধ্যাত্মিক উন্নতির সাথে সম্পর্কিত করে। অতীন্দ্রিয় ও ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়া এই মর্ত্য জগতে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। ইহজগতে সমাজকে পরিবর্তিত করতে অত্যাবশ্যক যৌক্তিক প্রয়াস একে অর্থ প্রদানকারী পৌরাণিক ও অতীন্দ্রিয় পরিপ্রেক্ষিত হতে অবিচ্ছেদ্য আবিষ্কার করে দ্বাদশবাদী শিয়ামতবাদে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতার সংশ্লেষ ঘটিয়েছে মোল্লা সদ্রার দর্শন। মোল্লাহ সদ্রা এভাবে শিয়া নেতৃত্বের এক নতুন আদর্শের প্রস্তাব রেখেছিলেন আমাদের কালেও ইরানের রাজনীতিতে যার গভীর প্রভাব অব্যাহত থাকবে।
মোল্লা সদ্রার দর্শনের অতীন্দ্রিয় রাজনৈতিক নেতার ঐশী অন্তর্দৃষ্টি থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এই ছিল না যে তিনি শক্তি দিয়ে নিজের মত ও ধর্মীয় অনুশীলন অন্যের উপর চাপিয়ে দেবেন। তেমন কিছু করলে সদ্রার দৃষ্টিতে তিনি ধর্মের সত্যির মুল সত্তাকে অস্বীকার করেছেন। উলেমাদের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রবল বিরোধিতা করেছেন সদ্রা। সপ্তম শতাব্দীতে ইরানে ক্রমশ শেকড় ছড়াতে থাকা এক নতুন ধারণার কারণে বিশেষভাবে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন তিনি। কিছু কিছু উলেমা এই সময় বিশ্বাস করেছিলেন যে, উলেমারাই গোপন ইমামদের একমাত্র আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র হওয়ায় বেশির ভাগ মুসলিমই নিজে থেকে বিশ্বাসের মৌল বিষয়সমূহ (উসুল) ব্যাখ্যা করতে অক্ষম, সাধারণ জনগণকে তাই এমন একজন মুজতাহিদ নির্বাচন করতে হবে যিনি ইজতিহাদের (‘স্বাধীন যুক্তিপ্রয়োগ’) চর্চা করার ক্ষমতা রাখেন বলে প্রতীয়মান এবং তাঁর আইনি শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই নিজেদের আচরণকে গড়ে তোলা উচিত। উসুলিদের-এই মতবাদের অনুসারীদের এই নামেই ডাকা হত—এইসব দাবি শুনে ভীত হয়ে উঠেছিলেন সদ্রা। ১ তাঁর দৃষ্টিতে এমন দাসত্বমূলক অনুকরণের (তাকলিদ) উপর নির্ভরকারী যেকোনও ধর্ম সহজাতভাবে ‘দূষিত’৷৫২ সকল শিয়াই পয়গম্বর ও ইমামদের ট্র্যাডিশন (আকবার) বোঝার ক্ষমতা রাখে এবং প্রার্থনা ও আচারআচরণের ভেতর দিয়ে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি ও যুক্তির উপর ভিত্তি করে নিজেরাই সমাধান বের করার উপযুক্ত।
সপ্তদশ শতাব্দী গড়িয়ে যাবার সাথে সাথে উসুলি ও তাদের বিরোধীদের সংঘাত আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাফাভিয় শক্তির তখন পতন শুরু হয়েছে, সমাজ ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। সাধারণ জনগণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের একমাত্র উপযুক্ত শক্তি উলেমাদের মুখাপেক্ষী হয়ে ছিল, কিন্তু আপন ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে নিজেদের ভেতরই বিরোধে লিপ্ত ছিলেন তাঁরা। এই পর্যায়ে অধিকাংশ ইরানি উসুলিদের বিরোধিতা করেছে, অতীতের ঐতিহ্যের উপর নির্ভরকারী তথাকথিত আকবারিদের অনুসরণ করেছে। আকবারিরা ইজতিহাদের প্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে কোরান ও সুন্নাহর সংকীর্ণ আক্ষরিক অর্থের পৃষ্ঠপোষকতা করত। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, সকল আইনি সিদ্ধান্তকে অবশ্যই কোরান, পয়গম্বর বা ইমামদের সুস্পষ্ট বিবৃতি ভিত্তিক হতে হবে। এমন কোনও ঘটনা যদি ঘটে যার বেলায় কোনও স্পষ্ট বিধি নেই, মুসলিম জুরিস্ট অবশ্যই নিজের বিচার বিবেচনার উপর নির্ভর না করে বরং বিষয়টি সেক্যুলার আদালতে পাঠাবেন।৫৩ উসুলিরা অধিকতর নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করতে চেয়েছিল। ইসলামি ট্র্যাডিশনের অনুসৃত নীতিমালার ভিত্তিতে জুরিস্টগণ নিজস্ব যুক্তির ক্ষমতা প্রয়োগ করে বৈধ সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারতেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যে আকবারিরা এমনভাবে অতীতে জড়িয়ে পড়বে যে ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স আর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। গোপন ইমামের অনুপস্থিতিতে, যুক্তি দেখিয়েছে তারা, কোনও জুরিস্টই শেষকথা বলতে পারবেন না, আর কোনও পূর্ব নজীরই বাধ্যতামূলক হবে না। প্রকৃতপক্ষেই, তাঁরা এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, অতীতের সম্মানিত কর্তৃত্বকে অনুসরণ করার বদলে বিশ্বাসীদের সব সময়ই কোনও একজন জীবিত মুজতাহিদের বিধান মেনে চলা উচিত। উভয় পক্ষই সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটা সময়ে রক্ষণশীল চেতনায় স্থির থাকার প্রয়াস পাচ্ছিল এবং উভয়ই প্রধানত স্বর্গীয় বাণী নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। আকবারি বা উসুলিদের কেউই বুদ্ধিবৃত্তিক সমরূপতার উপর জোর দেয়নি; এটা ছিল স্রেফ আচরণ বা ধর্মীয় অনুশীলনের ক্ষেত্রে বিশ্বাসীকে কার কাছে নতি স্বীকার করতে হবে, ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক অর্থের কাছে নাকি কোনও মুজতাহিদের কাছে সেই প্রশ্ন। তবু দুই পক্ষই একটা কিছু হারিয়েছিল। আকবারিরা আইনে মূৰ্ত আদিম স্বর্গীয় আজ্ঞাকে অতীতের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে, পরিণত হয়েছে অক্ষরবাদীতে; আবিশ্যিকভাবে প্রাচীন শিয়া মতবাদের প্রতীকী ধর্মের সাথে তাদের সম্পর্ক হারিয়ে গিয়েছিল। তাদের চোখে বিশ্বাস পরিণত হয়েছিল বাহ্যিক কিছু নির্দেশনার ধারায়। মানুষের যুক্তির উপর অনেক বেশি আস্থা ছিল উসুলিদের, তাদের ধর্মের মিথোসে এখনও তা প্রোথিত আছে। কিন্তু বিশ্বাসীকে তাদের রায় মেনে নিতে হবে বলে জোর দিয়ে তারা মোল্লা সদ্রার ব্যক্তির পবিত্র স্বাধীনতায় বিশ্বাস খুইয়েছিল।
