পঞ্চদশ শতকের শেষ নাগাদ, আমরা যেমন দেখেছি, বেশিরভাগ শিয়াই আরব ছিল এবং শিয়াবাদ বিশেষত ইরাকে দুটি উপাসনালয়ের শহর যথাক্রমে ইমাম আলি ও ইমাম হুসেইনের প্রতি নিবেদিত নাজাফ ও কারবালায় শক্তিশালী ছিল। বেশিরভাগ ইরানিই ছিল সুন্নি, যদিও ইরানি শহর কুম সব সময়ই শিয়াদের কেন্দ্র ছিল। রাঈ, কাশা ও খোরাশানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়ার বাস ছিল। তো সুফিবাদের সাফাভিয় ধরনের নেতা উনিশ বছর বয়স্ক শাহ ইসমাইলকে স্বাগত জানানোর মতো ইরানি ছিল। ১৫০১ সালে তাব্রিয দখল করেন তিনি ও পরের এক দশকের মধ্যেই ইরানের বাকি অংশ অধিকার করে নেন। তিনি ঘোষণা করেন, শিয়া মতবাদই নতুন সাফাভিয় সাম্রাজ্যের রাষ্ট্র ধর্ম হবে। নিজেকে সপ্তম ইমামের বংশধর দাবি করেছিলেন ইসমাইল, যা তাঁকে অন্য মুসলিম শাসকদের যা ছিল না সেই বৈধতা দিয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন। ৩৭
কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই শিয়া ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতি ছিল। ‘দ্বাদশবাদী’ (দ্বাদশ ইমামের প্রতি তাদের শ্রদ্ধার কারণে) অধিকাংশ শিয়া বিশ্বাস করত যে, গোপন ইমামের অনুপস্থিতিতে কোনও সরকারই বৈধ হতে পারে না।৩৮ তাহলে কেমন করে ‘রাষ্ট্রীয় শিয়াবাদ’ থাকতে পারে? এতে অবশ্য ইসমাইলের কোনও সমস্যা হয়নি। দ্বাদশবাদী অর্থডক্সি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিল না তাঁর। মঙ্গোল আগ্রাসনের অব্যবহতি পরে প্রতিষ্ঠিত অতীন্দ্রিয় ভ্রাতৃসংঘ সাফাভিয় গোষ্ঠী মূলত সুফি সংস্থা ছিল কিন্তু প্রাচীন শিয়া মতবাদের বহু ‘চরম’ (গুলুউ) ধারণা গ্রহণ করেছিল। ইসমাইল বিশ্বাস করতেন যে, ইমাম আলি স্বর্গীয় ছিলেন, এবং স্বর্ণযুগের উদ্বোধন ঘটাতে অচিরেই ফিরে আসবেন শিয়া মেসায়াহ। তিনি হয়তো শিষ্যদের এও বলে থাকতে পারেন যে, তিনিই সেই গোপন ইমাম, অড়াল ছেড়ে বের হয়ে এসেছেন। সাফাভিয় ব্যবস্থা ছিল প্রান্তিক, জনপ্রিয়তামুখী বিপ্লবী দল, শিয়া বিশেষ নিগূঢ় ধারা থেকে অনেক ভিন্ন।৩৯ শিয়া রষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইসমাইলের কোনও রকম দ্বিধা ছিল না, জাফর আস-সাদিকের আমল থেকেই শিয়ারা যেমন করে আসছিল, সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠের সাথে একটা সভ্য মোদাস ভিভেন্দি’র খোঁজ করার বদলে ধর্মান্ধভাবে সুন্নি বিরোধী ছিলেন তিনি। অটোমান ও সাফাভিয় সাম্রাজ্যে এক নতুন উপদলীয় অসহিষ্ণুতা দেখা দিয়েছিল; একই সময়ে ইউরোপে প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের ভেতর দেখা দেওয়া বিবাদের চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না সেটা। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অটোমানরা তাদের এলাকায় শিয়াদের প্রান্তিকায়িত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। ইসমাইল যখন ইরানে আবির্ভূত হন, তিনিও সমানভাবে সেখানকার সুন্নাহকে নিশ্চিহ্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
অবশ্য সাফাভিয়দের এটা আবিষ্কার করতে বেশি সময় লাগেনি যে, বিরোধী অবস্থানে থাকার সময় মেসিয়ানিক ‘চরমপন্থী’ আদর্শ কাজে এলেও এখন ক্ষমতায় আসার পর সেটা জুৎসই ঠেকছে না। প্রাচীন গুলুউ ধর্মতত্ত্ব মুছে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শাহ প্রথম আব্বাস (১৫৮৮-১৬২০) আমলাতন্ত্র থেকে চরমপন্থীদের বরখাস্ত করেন। দ্বাদশবাদী অর্থডক্সি প্রচারের জন্যে আরব থেকে শিয়া উলেমাদের আমদানি করেন তিনি। নতুন রাজধানী ইস্পাহান ও হিল্লায় তাঁদের জন্যে মাদ্রাসা নির্মাণ করেন, তাঁদের পক্ষে সম্পত্তি অর্পণ করেন (ওয়াকফ) ও উদার হাতে তাঁদের উপহার দেন। গোড়ার দিকে এই পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন ছিল, কারণ নতুন অভিবাসী হিসাবে উলেমারা শাহর উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু অনিবার্যভাবে শিয়া মতবাদের প্রকৃতি পাল্টে দিয়েছিলেন। শিয়ারা সব সময়ই সংখ্যালঘু দল ছিল। তাদের নিজস্ব মাদ্রাসা ছিল না, সব সময়ই একে অন্যের বাড়িতে পড়াশোনা করেছেন, বিতর্ক করেছেন। এখন শিয়ারা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছিল। ইস্পাহান শিয়া মতবাদের সরকারী বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।৪১ শিয়ারা সব সময়ই এর আগে সরকার থেকে দূরে অবস্থান করেছে, কিন্তু এখন উলেমাগণ ইরানের শিক্ষা ও আইনি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং আরও নির্দিষ্টভাবে সরকারের ধর্মীয় দায়িত্বও হাতে তুলে নিয়েছিলেন। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র ছিল ইরানিদের সমন্বয়ে গঠিত, তখনও সুন্নাহর প্রতি অনুগত ছিল তারা, সুতরাং, তাদের আরও বেশি সেক্যুলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ইরানি সরকারে সেক্যুলার ও ধর্মীয় বলয়ে একটা চলমান বিভাজন দেখা দিয়েছিল।৪২
উলেমগণ অবশ্য সাফাভিয় রাষ্ট্র সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। তখনও তাঁরা সরকারী পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলেন, নিজেদের প্রজা হিসাবে দেখতেই পছন্দ করতেন। সুতরাং, তাদের অবস্থান ছিল অটোমান উলেমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কিন্তু সহজাতভাবে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। শাহদের উদারতা ও পৃষ্ঠপোষকতা উলেমাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন করে দিয়েছিল। অটোমান ও তাদের উত্তরাধিকারীরা যেখানে সব সময়ই ভর্তুকী প্রত্যাহার বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়ে উলেমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, সেখানে শিয়া উলেমাদের এভাবে ভয় দেখানোর উপায় ছিল না। ইরানি জনগণের মাঝে শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে তাঁরা এই বাস্তবতা থেকে লাভবান হচ্ছিলেন যে শাহগণ নন, বরং তাঁরাই গোপন ইমামের একমাত্র প্রকৃত মুখপাত্র। অবশ্য গোড়ার দিকের সাফাভিয়রা উলেমাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইরানের জনগণ পুরোপুরি শিয়া মতবাদে দীক্ষিত হওয়ার আগে যাজকগোষ্ঠী সম্পূর্ণ নিজেদের মতো হয়ে উঠতে পারেনি।
