ষষ্ঠ ইমাম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিসর্জন দিয়ে ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর সূচিত অকাল্টেশন শিয়া ইতিহাসের পুরাণে রূপান্তরের কাজটি শেষ করেছিল। মিথ বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে কোনও নীল নকশার যোগান দেয় না, বরং বিশ্বাসীকে তার সমাজের দিকে চোখ ফেরাতে ও অন্তস্থঃ জীবনকে বিকাশ করতে শেখায়। অকাল্টেশনের মিথ শিয়াদের চিরকালের মতো বিরাজনীতি করে দিয়েছিল। জাগতিক শাসকদের শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অর্থহীন ঝুঁকি নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই শিয়াদের। যাকে আত্মগোপনে যেতে হয়, চলমান বিশ্বে বাস করতে অক্ষম ন্যায়বিচারক একজন ইমামের ইমেজ শিয়াদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতাই তুলে ধরে। যুগের প্রকৃত প্রভু গোপন ইমামের কর্তৃত্বকে ছিনিয়ে নিয়েছে বলে এই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনও সরকারকেই অবৈধ বিবেচনা করতে হয়েছে। সুতরাং, পার্থিব শাসকদের কাছ থেকে কিছুই আশা করার ছিল না, যদিও বেঁচে থাকার স্বার্থে শিয়াদের অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করবে তারা, কেবল ‘দীর্ঘ সময় শেষে’ শেষ যুগেই পৃথিবীতে আসন্ন এক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা করবে। তারা কেবল ইমামদের সাবেক ‘প্রতিনিধি’দের স্থান গ্রহণকারী শিয়া উলেমাদের একক কর্তৃত্বই মেনে নেবে। শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা ও স্বর্গীয় আইনে দক্ষতার কারণে উলেমাগণ গোপন ইমামের সহকারীতে পরিণত হয়েছিলেন এবং তাঁর নামে বক্তব্য রাখতেন। কিন্তু সকল সরকারই অবৈধ থাকায় উলেমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল।৩৪
এভাবে শিয়ারা নীরবে রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ সেক্যুলারাজেইশন সমর্থন দিয়েছিল যাকে তাওহিদের গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি নীতির লঙ্ঘন মনে হতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র ও ধর্মের এজাতীয় বিচ্ছিন্নতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এক ধর্মীয় দর্শন থেকে এই বিচ্ছিন্নতার মিথলজির উদ্ভব হয়েছে। প্রায় সকলেই গুপ্তহত্যার শিকার, কারাবন্দি, দেশান্তরী এবং সবশেষে খলিফাদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়েছেন এমন ইমামদের কিংবদন্তী রাজনীতি ও ধর্মের মৌল সমন্বয়হীনতা তুলে ধরে। রাজনৈতিক জীবন লোগোসের এখতিয়ার, একে অবশ্যই ভবিষ্যৎমুখী, বাস্তবভিত্তিক হতে হবে, একে আপোস করতে জানতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে, যৌক্তিক ভিত্তিতে সমাজকে সংগঠিত করতে হবে। একে ধর্মের চরম চাহিদা ও জমিনে জীবনের গম্ভীর বাস্তবতার ভেতর ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। প্রাক আধুনিক কৃষিভিত্তিক সমাজ একটি মৌলিক বৈষম্যের উপর ভিত্তি করে গঠিত ছিল, এটা কৃষকদের শ্রমের উপর নির্ভর করত যারা সভ্যতার ফল ভোগ করতে পারত না। অ্যাক্সিয়াল যুগের (c. ৭০০-২০০ বিসিই) মহান কনফেশনাল ধর্মগুলোর সবকটাই এই টানাপোড়েনে ব্যস্ত ছিল, একে সামাল দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। সম্পদের পরিমাণ যেখানে অপ্রতুল আর যেখানে প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অভাব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কঠিন করে তোলে, সেখানে রাজনীতি অনেক বেশি নিষ্ঠুর ও আগ্রাসীভাবে বাস্তবভিত্তিক হয়ে ওঠে। সুতরাং, যেকোনও সরকারের পক্ষে ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী সরকার পরিচালনা বা এর ঘাটতিসমূহ দুঃখজনকভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া স্বর্গীয় প্রজ্ঞার মূর্ত প্রতীক ইমামদের অস্তিত্ব সহ্য করা ছিল অসম্ভব। ধর্মীয় নেতারা যাচ্ছেতাই অপচয়ের বিরুদ্ধে নিন্দা, সমালোচনা বা প্রতিবাদ জানাতে পারতেন, কিন্তু এক ধরনের করুণ অর্থে পবিত্রকে হয় প্রান্তিকায়িত বা সীমার ভেতর রাখতে হয়েছে, যেমন করে খলিফাগণ সামারার আসকারী দুর্গে ইমামদের আটক করে রেখেছিলেন। কিন্তু এক আদর্শের প্রতি শিয়া ভক্তিতে মাহাত্ম্য ছিল যাকে অবশ্যই টিকিয়ে রাখার দরকার ছিল, যদিও গোপন ইমামের মতো সেটা ছিল সুপ্ত এবং বর্তমানে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিশ্বে কাজ করতে অক্ষম।
শিয়া মতবাদ পৌরাণিক ধর্মবিশ্বাসে পরিণত হলেও তার মানে তা অযৌক্তিক ছিল না। আসলে শিয়াবাদ সুন্নাহর চেয়ে ইসলামের অধিকতর যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিয়ারা আবিষ্কার করেছিল যে, তারা মুতাযিলি নামে পরিচিত সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিকদের সাথে সহমত পোষণ করে। কোরানের বিভিন্ন মতবাদকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এরা। অন্যদিকে মুতাযিলিরাও শিয়া মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। প্যারাডক্সিকালি অকাল্টেশনের অযৌক্তিক মতবাদ শিয়া উলেমাদের সুন্নি উলেমাদের চেয়ে কর্মকাণ্ডের বাস্তব জগতে তাদের অনেক বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা দিয়েছিল। গোপন ইমাম আর নাগালের মধ্যে না থাকায় বৃদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে হত তাদের। সুতরাং, শিয়া মতবাদে সুন্নাহর মতো ‘ইজতিহাদের দুয়ার’ কোনওদিনই রুদ্ধ হয়নি।৩৫ এটা ঠিক, শিয়ারা প্রথমে ইমাম অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দী নাগাদ একজন বিশিষ্ট ও জ্ঞানী শিয়া যাজক ঠিক মুজতাহিদ হিসাবেই পরিচিত ছিলেন, ইজতিহাদের যৌক্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষমতাশালী বলে মনে করা হত তাঁকে।
অবশ্য শিয়া যুক্তিবাদ আমাদের বর্তমান পাশ্চাত্যের সেক্যুলারাইজড যুক্তিবাদ হতে ভিন্ন ছিল। শিয়ারা প্রায়শঃই সমালোচনামুলক চিন্তাবিদ ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, একাদশ শতাব্দীর পণ্ডিত মুহাম্মদ আল-মুইদ ও মুহাম্মদ আল-তুসি পয়গম্বর ও তাঁর কয়েকজন সহচরের হাদিস প্রতিবেদনের সঠিকতা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, তাঁদের মতবাদের সমর্থনে এইসব অবিশ্বস্ত ট্র্যাডিশন উদ্ধৃত করা যথেষ্ট হবে না, বরং তার বদলে যাজকদের উচিত হবে যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা; কিন্তু তারপরেও তাঁদের তুলে ধরা যৌক্তিক বক্তব্য আধুনিক সংশয়বাদীকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। উদাহরণ স্বরূপ, তুসি ইমামতের মতবাদ ‘প্রমাণ’ করতে গিয়ে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যেহেতু আল্লাহ শুভ ও তিনি আমাদের মুক্তি চান, তো এটা বিশ্বাস করাই যুক্তিসঙ্গত যে তিনিই আমাদের অনির্বচনীয় পথ-নির্দেশ যোগাবেন। নারী-পুরুষ সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা আবিষ্কার করতে পারে, কিন্তু স্বর্গীয় বিধি এই বিষয়টিকে আরও জরুরি করে তোলে। এমনকি তুসিও অকাল্টেশনের পক্ষে যুক্তি খুঁজতে গিয়ে দিশাহারা বোধ করেছেন।৩৬ কিন্তু শিয়াদের কাছে এটা অস্বস্তিকর ছিল না। মিথোস ও লোগোস, যুক্তি ও প্রত্যাদেশ, পরস্পর বিরোধী ছিল না, বরং স্রেফ একটি অপরটি থেকে ভিন্ন এবং সম্পূরক। আধুনিক পশ্চিমে আমরা যেখানে সত্যির উৎস হিসাবে মিথোলজি ও অতীন্দ্রিয়বাদকে নাকচ করে কেবল যুক্তির উপর নির্ভর করে থাকি; তুসির মতো একজন চিন্তাবিদ চিন্তার উভয় পথকেই বৈধ ও প্রয়োজনীয় হিসাবে দেখেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, অতীন্দ্রিয় ধ্যানে মগ্ন থাকার সময় নিখুঁত অর্থ প্রকাশকারী মতবাদসমূহ ইসলামি প্রেক্ষিতেও যুক্তিসঙ্গত। ধ্যানের অন্তর্মুখী কৌশলসমূহ এমন অন্তর্দৃষ্টির যোগান দেয় যেগুলো তাদের নিজস্ব বলয়ে সঠিক, কিন্তু সেগুলোকে লোগোসের সৃষ্টি কোনও গাণিতিক সমীকরণের মতো যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রমাণ করা যাবে না।
