গোপন ইমামের ‘অকাল্টেশনে’র মিথ যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কেবল অতীন্দ্রিয়বাদ ও আচরিক অনুশীলনের প্রেক্ষাপটেই এটা অর্থ প্রকাশ করে। আমরা যদি গল্পটি লোগোস হিসাবে বুঝে থাকি, বাস্তব ঘটনার মামুলি বিবরণ হিসাবে যদি আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, সবরকম প্রশ্ন উঠে আসে। ইমাম গেছেন কোথায়? তিনি পৃথিবীতেই আছেন নাকি কোনও ধরনের মধ্যবর্তী বলয়ে? সেখানে তাঁর জীবন কেমন হতে পারে? তিনি কি ক্রমেই বুড়িয়ে যাচ্ছেন? বিশ্বাসীরা তাঁকে দেখতে বা তাঁর কথা শুনতে না পেলে কেমন করে তিনি তাদের পথ দেখাবেন? যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে মনের অধিকতর স্বজ্ঞামূলক শক্তির উপর নির্ভরশীল বাতিন বা ঐশীগ্রন্থের গোপন অর্থের সুশৃঙ্খল অনুশীলনে সংশ্লিষ্ট এমন কোনও শিয়ার কাছে এইসব প্রশ্ন ভোঁতা মনে হবে। শিয়ারা তাদের ঐশীগ্রন্থ ও মতবাদ আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করেনি। তাদের সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিকতা অদৃশ্যের (আল-গায়েব) প্রতীকী অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছিল যা বাইরের যাহির) ঘটনাপ্রবাহের আড়ালে থাকে। শিয়ারা এক অদৃশ্য, দুর্বোধ্য আল্লাহর উপাসনা করে থাকে, কোরানের গুপ্ত অর্থের সন্ধান করে, এক গোপন ইমামের আকাঙ্ক্ষায় ছিল তারা, ন্যায় বিচারের জন্যে অন্তহীন কিন্তু অদৃশ্য লড়াইতে অংশ নিয়েছে এবং ইসলামের এক নিগূঢ় ভাষ্য চর্চ্চা করেছে যাকে পার্থিব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয়েছে।২ এই ব্যাপক ধ্যানমুখী জীবনই ছিল অকাল্টেশনের মানে তুলে ধরা পটভূমি। গোপন ইমাম মিথে পরিণত হয়েছিলেন, স্বাভাবিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে সময় ও কালের সীমা থেকে মুক্ত করা হয়েছে; প্যারাডক্সিকালি তিনি ও অন্যান্য ইমাম মদিনা বা সামারায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করার সময় যতখানি ছিলেন তারচেয়ে ঢের বেশি উজ্জ্বল সত্তায় পরিণত হয়েছিলেন। অকাল্টেশন এমন এক মিথ যা আমাদের পবিত্রের বোধকে অধরা ও হতবুদ্ধিকরভাবে অনুপস্থিত রূপে তুলে ধরে। জগতে উপস্থিত থাকলেও এটা এর অংশ নয়; স্বর্গীয় প্রজ্ঞা মানুষ থেকে অবিচ্ছেদ্য (কারণ মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা কেবল ঈশ্বরসহ কোনও কিছু সম্পর্কে ধারণা করতে পারি), কিন্তু আমাদের তা সাধারণ নারী-পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্বে নিয়ে যায়। অন্য যেকোনও মিথের মতো অগোছাল যুক্তি দিয়ে অকাল্টেশন বোঝা যাবে না, যেন বা তা স্বয়ংপ্রকাশিত সত্যি বা যৌক্তিক প্রদর্শনীর উপযুক্ত। বরং তা মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতায় একটি মিথকে তুলে ধরে।
যেকোনও নিগূঢ় আধ্যাত্মিকতার মতো শিয়া মতবাদ এই পর্যায় পর্যন্ত কেবল অভিজাত গোষ্ঠীর ব্যাপার ছিল। অতীন্দ্রিয় ধ্যনের মেধা ও চাহিদা সম্পন্ন অধিকতর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুঃসাহসী মুসলিমরাই এতে আকৃষ্ট হচ্ছিল বেশি। কিন্তু শিয়াদের অন্য মুসলিমদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। সুন্নি ইসলামের আচার ও অনুশীলন যেখানে সুন্নি মুসলিমদের জীবন যেমন সেভাবেই মেনে নিয়ে আদর্শ জগতের রীতিনীতি মোতাবেক চলতে সাহায্য করেছে সেখানে শিয়া অতীন্দ্রিয়বাদ স্বর্গীয় অসন্তোষ তুলে ধরেছে। অকাল্টেশনের মতবাদ প্রচারিত হওয়ার অল্প পরেই বিকাশ লাভ করা প্রথম দিকের ট্র্যাডিশনসমূহ দশম শতাব্দীতে বহু শিয়ার অনুভূত হতাশা ও অক্ষমতা তুলে ধরেছে। একে বলা হত “শিয়া শতাব্দী’, কারণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বহু অধিনায়ক যারা কোনও এক বিশেষ এলাকায় কার্যকর ক্ষমতা ভোগ করতেন তাদের প্রায় সবারই শিয়া মতবাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। কিন্তু সেকারণে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। কোরানের পরিষ্কার শিক্ষা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে জীবন তখনও ছিল অন্যায় ও সমতাহীন। প্রকৃতপক্ষেই, সকল ইমামই শিয়াদের চোখে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। ট্র্যাডিশন আছে যে, উমাঈয়া ও আব্বাসিয় খলিফারা হুসেইনের পরের প্রত্যেক ইমামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছেন। আরও ন্যায়বিচার ভিত্তিক ও উদার সামাজিক ব্যবস্থার পক্ষে তাদের আকাঙ্ক্ষা থেকে শিয়ারা শেষ যুগে গোপন ইমামের চূড়ান্ত আবির্ভাব (যুহুর)-এর উপর ভিত্তি করে পরকালতত্ত্বের বিকাশ ঘটায়, যখন তিনি ফিরে এসে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন ও চূড়ান্ত বিচারের আগে ন্যায়বিচার ও শান্তির এক সোনালি যুগের প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু সমাপ্তির জন্যে এই আকাঙ্ক্ষার মানে শিয়ারা রক্ষণশীল রীতি ত্যাগ করে ভবিষ্যৎমুখী হয়ে গেছে, এমন ছিল না। তারা আদি আদর্শ জগতের প্রতি এত প্রবলভাবে সজাগ ছিল, পরিস্থিতির যেমনটা হওয়া উচিত ছিল, তাদের চোখে সাধারণ রাজনৈতিক জীবন অসহনীয় ঠেকেছে। গোপন ইমাম এই বিশ্বে নতুন কিছু নিয়ে আসবেন না, তিনি স্রেফ মানুষের ইতিহাসকে পরিশুদ্ধ করবেন যাতে মানুষের কর্মকাণ্ড অস্তিত্বের মৌলিক নীতিমালার অনুগামী হয়। একইভাবে ইমামদের ‘আবির্ভাব’ গভীরতর অর্থে সব সময় অস্তিত্ব ছিল এমন কিছুকে প্রকাশ করবে মাত্র, কারণ গোপন ইমাম শিয়ার জীবনে এক ধ্রুব অস্তিত্ব, তিনি আল্লাহর অধরা আলোকে এক অন্ধকার স্বৈরাচারী পৃথিবীতে তুলে ধরেন এবং তিনিই আশার একমাত্র উৎস।
