ষষ্ঠ শিয়া ইমাম জাফর আস-সাদিক (মৃ. ৭৬৫) এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে পয়গম্বরের উত্তরাধিকারী হিসাবে তিনিই উম্মাহর একমাত্র বৈধ নেতা (ইমাম) হলেও কোনও অর্থহীন বিরোধে জড়ানো সত্যিকারের কাজ নয়, বরং ঐশীগ্রন্থের অতীন্দ্রিয় ব্যাখ্যায় শিয়াদের পথ নির্দেশ করাই তাঁর দায়িত্ব। আলির বংশের প্রত্যেক ইমাম, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর প্রজন্মের আধ্যাত্মিক নেতা। ইমামদের প্রত্যেকে তাঁর পূবসুরী কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি তাঁকে স্বর্গীয় সত্যের গোপন জ্ঞান (‘ইলম) দিয়ে গেছেন। সুতরাং একজন ইমাম ভ্রান্তির অতীত আধ্যাত্মিক নির্দেশক ও নিখুঁত বিচারক। এভাবে শিয়ারা রাজনীতি ছেড়ে কোরানের প্রতিটি শব্দের পেছনে লুকানো গোপন (বাতিন) প্রজ্ঞা অনুভব করতে ধ্যানের কৌশল চর্চা করার মাধ্যমে অতীন্দ্রিয় গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। শিয়ারা ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক অনুবাদে সন্তুষ্ট ছিল না, নতুন দর্শনের ভিত্তি হিসাবে টেক্সটকে কাজে লাগাত তারা। তাদের ঐশী অনুপ্রাণিত ইমামের প্রতীকীবাদ পবিত্র সত্তার শিয়া অনুভূতি তুলে ধরে যা একজন অতীন্দ্রিয়বাদী এই উত্তাল বিপজ্জনক বিশ্বে সর্বব্যাপী ও সুগম হিসাবে আবিষ্কার করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উপযোগী মতবাদ ছিল না এটা, একে তারা আনাড়ীভাবে ব্যাখ্যা করে বসতে পারত; তো শিয়াদের অবশ্যই তাদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের কাছে রাখতে হবে। জাফর আস-সাদিক কর্তৃক বিকশিত ইমামতির মিথলজি ছিল একটি কল্পনানির্ভর দর্শন যা ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক ও বাস্তব ভিত্তিক অর্থের অতীতে অনুসন্ধান ও ইতিহাসকে অদৃশ্যের (আল-গায়েব ) অটল, আদিম বাস্তবতা হিসাবে দেখে। দীক্ষা হীন যেখানে কেবল একজন মানুষকে দেখেছে, ধ্যানী শিয়া জাফর আস-সাদিকের মাঝে স্বর্গীয় আভাস দেখতে পেয়েছে।২৯
ইমামত দৈনন্দিন জীবনের সখুঁত ও ট্র্যাজিক পরিস্থিতিতে আল্লাহ’র ইচ্ছা বাস্তাবায়নের চরম অসুবিধাও প্রতীকায়িত করেছে। জাফর আস-সাদিক কার্যকরভাবে ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, ধর্মবিশ্বাসকে ব্যক্তি পর্যায়ে এনে একে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলয়ে সীমিত করেছেন। এটা তিনি করেছেন ধর্মকে বাঁচাতে ও এমন বিশ্বে একে বেঁচে থাকতে সক্ষম করে তুলতে যাকে আবিশ্যিকভাবেই এর প্রতি বৈরী মনে হয়। এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণা থেকেই এই সেক্যুলারাইজেশন নীতির উদ্ভব ঘটেছিল। শিয়ারা জানত ধর্মের সাথে রাজনীতির মিশ্রণ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এক শতাব্দী পরে এটা করুণভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৮৩৬ সালে আব্বাসিয় খলিফাগণ বাগদাদের আনুমানিক ষাট মাইল দক্ষিণে সামারায় রাজধানী সরিয়ে নেন। ততদিনে আব্বাসিয়দের শক্তি ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল, খলিফা গোটা মুসলিম বিশ্বের নামমাত্র শাসক থাকলেও সাম্রাজ্য জুড়ে মূল কর্তৃত্ব ছিল স্থানীয় আমির ও সর্দারদের হাতে। খলিফাগণ মনে করলেন এমন একটা অস্থির সময়ে তাঁদের পক্ষে পয়গম্বরের উত্তরাধিকারী ইমামদের এভাবে মুক্ত থাকতে দেওয়া সম্ভব নয়। ৮৪৮ সালে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল দশম ইমাম আলি আল-হাদিকে মদিনা থেকে সামারায় তলব করেন। এখানে তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। তিনি ও তাঁর ছেলে একাদশ ইমাম হাসান আল- আশারি শিয়াদের সাথে কেবল প্রতিনিধি (ওয়াকিল)-র মারফত যোগাযোগ রাখতে পারছিলেন। বাগদাদের বাণিজ্য এলাকা আল-কার্খ-এ থেকে আব্বাসিয় কর্তৃপক্ষের মনোযোগ এড়াতে ব্যবসা করত তারা।
৮৭৪ সালে একাদশ ইমাম পরলোকগমন করেন, সম্ভবত খলিফার ইঙ্গিতে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল তাঁকে। তাঁকে এমন ভীষণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছিল যে শিয়ারা তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না। তাঁর কি কোনও ছেলে ছিল? যদি না থাকে তো কে তাঁর উত্তরাধিকারী হবে? তাঁর বংশধারা কি শেষ হয়ে গেছে? যদি তাই হয়, তার মানে কি তবে শিয়ারা অতিন্দ্রীয় নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে? প্রবল হয়ে উঠেছিল আঁচঅনুমান, তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মতবাদ জোরের সাথে জানাল যে, হাসান আল-আশারির সত্যিই একজন ছেলে ছিল, আবু আল কাসিম মুহাম্মদ, দ্বাদশ ইমাম; জীবন বাঁচাতে আত্মগোপন করেছেন তিনি। আকর্ষণীয় সমাধান ছিল এটা, কারণ এখানে বোঝানো হয়েছে যে কিছুই বদলায়নি। শেষ দুজন ইমাম কার্যত অগম্য ছিলেন। এখন গোপন ইমাম তাঁর ওয়াকিল উসমান আল-আমরির মারফত জনগণের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে পারবেন। এই ওয়াকিল আধ্যাত্মিক পরামর্শ দিতে পারবেন, যাকাতের দান সংগ্রহ করবেন, ঐশীগ্রন্থ ব্যাখ্যা করবেন ও আইনি সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু এই সমাধানের আয়ু ছিল সীমিত। দ্বাদশ ইমামের জীবিত থাকার সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ামাত্র শিয়ারা আবার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে শুরু করল। তারপর ৯৩৪ সালে বর্তমান প্রতিনিধি আলি ইবন মুহাম্মদ আস-সামাররি গোপন ইমামের কাছ থেকে শিয়াদের জন্যে এক বার্তা নিয়ে এলেন। তিনি পরলোকগমন করেননি। বরং আল্লাহ অলৌকিকভাবে তাঁকে আড়াল করেছেন; শেষ বিচারের আগে আগে ন্যায়বিচারের যুগের সুচনা ঘটাতে আবার ফিরে আসবেন তিনি। এখনও তিনি শিয়াদের ভুলের অতীত নির্দেশক ও উম্মাহর একমাত্র বৈধ শাসক রয়েছেন। কিন্তু বিশ্বাসীদের সাথে তিনি আর প্রতিনিধি মারফত প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বজায় রাখতে পারবেন না। শিয়াদের তাঁর দ্রুত প্রত্যাবর্তন আশা করা ঠিক হবে না। তারা তাঁকে কেবল ‘দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাবার পর ও পৃথিবী স্বৈরাচারে পরিপূর্ণ হলেই আবার দেখতে পাবে।’৩১
