৬৩২ সালে পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) পরলোকগমন করার সময় উত্তরাধিকারী মনোনয়নের জন্যে কোনও ব্যবস্থা রেখে যাননি। তাঁর বন্ধু আবু বকর উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মাধ্যমে খেলাফতে অধিষ্ঠিত হন। অবশ্য কেউ কেউ বিশ্বাস করত যে, মুহাম্মদ (স) হয়তো তাঁর নিকটতম পুরুষ আত্মীয় আলি ইবন আবি তালিবই তাঁর উত্তরাধিকারী হোক, এটাই চাইতেন, তিনি ছিলেন তাঁর পোষ্য, চাচাত ভাই ও মেয়ে জামাই। কিন্তু ৬৩৬ সালে চতুর্থ খলিফা হওয়ার আগ পর্যন্ত আলিকে বিভিন্ন নির্বাচনে ক্রমাগত বাদ দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শিয়ারা অবশ্য প্রথম তিন খলিফার শাসনকে স্বীকার করে না। আলিকেই তারা প্রথম ইমাম (‘নেতা’) আখ্যায়িত করে থাকে। আলির ধার্মিকতা ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি তাঁর অফিসারদের উদ্দেশে ন্যায়বিচার ভিত্তিক বিচারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে চিঠি লিখেছেন। অবশ্য ৬৩৬ সালে দুঃখজনকভাবে এক মুসলিম চরমপন্থীর হাতে নিহত হন তিনি। শিয়া- সুন্নি নির্বিশেষে এই ঘটনা শোকের সাথে স্মরণ করে থাকে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মুয়াবিয়াহ খেলাফতের সিংহাসন দখল করে নেন এবং দামাস্কাস ভিত্তিক অধিকতর ইহজাগতিক উমাঈয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। আলির বড় ছেলে হাসান, শিয়ারা যাঁকে দ্বিতীয় ইমাম বলে থাকে, রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং ৬৬৯ সালে মদিনায় পরলোকগমন করেন। কিন্তু ৬৮০ সালে খলিফা মুয়াবিয়াহ মারা গেলে ইরাকের কুফায় আলির দ্বিতীয় ছেলে হুসেইনের পক্ষে বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। উমাঈয়াদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ এড়াতে হুসেইন মক্কায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করেন, কিন্তু নতুন উমাঈয়া খলিফা ইয়াযিদ তাঁকে হত্যা করাতে মক্কার পবিত্রতা লঙ্ঘন করে পবিত্র নগরে দূত পাঠায়। তৃতীয় শিয়া ইমাম হুসেইন এই অন্যায় ও অপবিত্র শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দায়িত্ব মনে করেন। স্ত্রী ও সন্তানসহ পঞ্চাশ জনের একটা দল নিয়ে কুফার পথে রওয়ানা হন তিনি, ভেবেছিলেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পয়গম্বরের উত্তরাধিকারীদের এই করুণ মিছিলের দৃশ্য উম্মাহকে আবার ইসলামের সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু আরব দশম মাস মুহররমের আশুরার পবিত্র উপবাসের দিনে উমাঈয়া বাহিনী কুফার বাইরে কারবালার প্রান্তরে হুসেইনের ক্ষুদ্র বাহিনীকে ঘেরাও করে সবাইকে হত্যা করে। সবার শেষে নিহত হন হুসেইন, তখন তাঁর কোলে ছিল তাঁর শিশু পুত্র।২৬
কারবালা ট্র্যাজিডি নিজস্ব কাল্ট গড়ে তুলবে এবং প্রত্যেক শিয়ার ব্যক্তিগত জীবনের এক সময়হীন ঘটনা, মিথে পরিণত হবে। ইয়াযিদ পরিণত হয়েছে স্বৈরাচার ও অন্যায়ের মূর্ত প্রতীকে। দশম শতাব্দী নাগাদ সাধারণভাবে শিয়ারা আশুরার উপবাসের দিন হুসেইনের শাহাদাৎ বরণের বার্ষিকী পালন করে থাকে, তারা কাঁদে, নিজেদের শরীরে আঘাত করে মুসলিম রাজনৈতিক জীবনের দূষণের চিরন্তন বিরোধিতা ঘোষণা করে। কবিগণ শহীদ আলি ও হুসেইনের সম্মানে মহাকাব্যিক শোকগীতি আবৃত্তি করে থাকেন। এভাবে শিয়ারা কারবালার মিথোসের উপর ভিত্তি করে প্রতিবাদের ধার্মিকতা গড়ে তুলেছে। এই কাল্ট শিয়া দৃষ্টিভঙ্গির মূল বিষয় সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি আবেগঘন আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে রেখেছে। আশুরা আচারের সময় শিয়ারা যখন ভাবগম্ভীর মিছিলে হেঁটে যায়, তখন তারা হুসেইনকে অনুসরণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এমনকি মৃত্যু বরণ করার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা দেয়। ২৭
এই মিথ ও কাল্ট গড়ে উঠতে কিছুদিন সময় লেগেছিল। কারবালার পরের প্রথম কয়েক বছর হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পাওয়া হুসেইনের ছেলে আলি এবং তাঁর ছেলে মুহাম্মদ (যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম ইমাম নামে পরিচিত) মদিনায় চলে যান, তাঁরা কোনও রকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। কিন্তু ইতিমধ্যে প্রথম ইমাম আলি উমাঈয়া শাসনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠা অনেকের কাছেই ন্যায়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। আব্বাসিয় উপদল যখন শেষ পর্যন্ত ৭৫০ সালে উমাঈয়া খেলাফত উৎখাত করে তাদের নিজেদের রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে (৭৫০-১২৬০), প্রথমে নিজেদের তারা শিয়া-ই আলি (আলির দল) বলে দাবি করেছিল। শিয়ারা আবার কিছু অদ্ভূত আঁচঅনুমানের সাথেও সম্পর্কিত ছিল, বেশির ভাগ মুসলিমই যাকে ‘চরম’ (গুলুউ) মনে করে। ইরাকে মুসলিমরা এক প্রাচীন ও আরও জটিল ধর্মীয় জগতের সংস্পর্শে এসেছিল এবং কেউ কেউ ক্রিশ্চান, ইহুদি বা যোরোস্ত্রিয় মিথলজিতে আকৃষ্ট হয়। কোনও কোনও শিয়া বলয়ে আলিকে জেসাসের মতো ঈশ্বরের অবতার হিসাবে দেখা হত; শিয়া বিদ্রোহীরা মনে করত তাদের নেতারা মারা যাননি বরং আত্মগোপনে (বা ‘অকাল্টেশন’) আছেন; একদিন তাঁরা ফিরে আসবেন, অনুসারীদের বিজয়ের পথে নিয়ে যাবেন। অন্যরা স্বর্গীয় আত্মার মানুষের সত্তায় অবতরণ ও তাকে স্বর্গীয় জ্ঞান দেওয়ার ধারণায় অভিভূত হয়ে গিয়েছিল।২৮ এইসব মিথ এক পরিবর্তিত রূপে শিয়া নিগূঢ় দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
হুসেইনের সম্মানে সৃষ্ট কাল্ট এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজিডিকে শিয়া মুসলিমদের ধর্মীয় দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা মিথে পরিণত করেছে। এটা মানুষের খোদ অস্তিত্বে অব্যাহত কিন্তু অদৃশ্য শুভ ও অশুভের ভেতরকার সংগ্রামের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে থাকে; আচার অনুষ্ঠান হুসেইনকে তাঁর সময়ের বিশেষ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে তাঁকে এক জীবিত সত্তায় পরিণত করে; তিনি পরিণত হন গভীর সত্যের প্রতীকে। কিন্তু শিয়াবাদের পুরাণকে বাস্তব বিশ্বে বাস্তবিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। এমনকি আব্বাসিয় শাসকদের মতো শিয়ারা ক্ষমতা দখল করতে পারলেও রাজনৈতিক জীবনের কর্কশ বাস্তবতা বোঝায় যে তারা ওইসব উচ্চমার্গীয় আদর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করতে পারছিলেন না। আব্বাসিয় খলিফাগণ ইহজাগতিক দিক থেকে অত্যন্ত সফল ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় আরোহণের পর অল্প সময়ের ভেতরই শিয়া রেডিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি বিসর্জন দিয়ে সাধারণ সুন্নিতে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁদের শাসন উমাঈয়াদের তুলনায় খুব বেশি ন্যায়সঙ্গত বলে মনে হয়নি; কিন্তু প্রকৃত শিয়াদের পক্ষে বিদ্রোহ করা ছিল অর্থহীন, কারণ প্রয়োজনের খাতিরেই যেকোনও বিদ্রোহকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হত। প্রকৃতপক্ষেই হুসেইনের মিথ যেন বোঝাতে চেয়েছে স্বৈরাচারী শাসকের বিরোধিতা করার যেকোনও প্রয়াসই ব্যর্থ হতে বাধ্য, সেটা ন্যায়বিচারের পক্ষে যত ধার্মিক ও উৎসাহী হোক না কেন।
