ইউরোপের সীমান্তে যেসব জায়গায় অটোমান পতন অনেক বেশি প্রকট ছিল, সেখানকার জনগণ বরাবরের মতোই পরিবর্তন ও অস্থিরতার প্রতি সাড়া দিয়েছিল-ধর্মীয় কায়দায়। আরবীয় পেনিনসুলায় মুহাম্মদ ইবন আব্দ আল- ওয়াহহাব (১৭০৩-৯২) ইস্তাম্বুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মধ্য আরব ও পারসিয়ান গাল্ফ এলাকায় নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হন। আব্দ আল-ওয়াহহাব ছিলেন টিপিক্যাল ইসলামি সংস্কারক। মধ্যযুগীয় জুরেসপ্রুডেন্স, অতীন্দ্রিয়বাদ ও দর্শন প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করে কোরান ও সুন্নাহয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সঙ্কট মোকাবিলার প্রয়াস পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে এসব যেহেতু আদি ইসলাম থেকে বিচ্যুতি, তাই আল-ওয়াহহাব অটোমান সুলতানদের ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাঁদের বিশ্বাসীদের আনুগত্য লাভের অযোগ্য ও মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত ঘোষণা করেছিলেন। তাঁদের শরীয়া রাষ্ট্র সঠিক নয়। তার বদলে আল-ওয়াহহাব সপ্তম শতাব্দীর প্রথম মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে খাঁটি ধর্মের একটা ছিটমহল সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছিলেন। এটা ছিল আক্রমণাত্মক আন্দোলন, বাহুবলে জনগণের উপর চেপে বসেছিল। এইসব সহিংস ও প্রত্যাখ্যানমূলক ওয়াহহাবীয় শিক্ষা আরও ব্যাপক পরিবর্তন ও অস্থিরতার কাল বিংশ শতাব্দীর দিকে কিছু সংখ্যক মৌলবাদী ইসলামি সংস্কারকদের হাতে ব্যবহৃত হবে।২8
মরোক্কোর সুফি সংস্কারক আহমাদ ইবন ইদ্রিসের (১৭৮০-১৮৩৬) সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, আমাদের কালেও যার অনুসারী রয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবনের বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে তাঁর সমাধান ছিল সাধারণ জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা ও তাদের ভালো মুসলিমে পরিণত করা। উত্তর আফ্রিকা ও ইয়েমেনে প্রচুর সফর করেছেন তিনি, সাধারণ জনগণের উদ্দেশে তাদের নিজস্ব ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন, সমবেত প্রার্থনার শিক্ষা দিয়েছেন ও অনৈতিক অনুশীলন থেকে তাদের বের করে আনতে চেয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন ছিল এটা। ওয়াহহাবী পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার অবকাশ ছিল না ইবন ইদ্রিসের। তাঁর চোখে শক্তি নয়, শিক্ষাই ছিল মূল চাবকাঠি। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা অবশ্যই ভ্রান্তি। অন্য সংস্কারকগণ একই পথে কাজ করেছেন। আলজেরিয়ায় আহমাদ আল-তিগরানি (মৃ. ১৮২৪), মদিনায় মুহাম্মদ ইবন আব্দ আল-করিম শামীম (মৃ. ১৭৭৫) এবং লিবিয়ায় মুহাম্মদ ইবন আলি আল-সানুসি (মৃ. ১৮৩২)-এদের প্রত্যেকে উলেমাদের পাশ কাটিয়ে ধর্মকে সরাসরি মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। এটা ছিল জনমুখী সংস্কার, তাঁরা তাঁদের চোখে অভিজাতপন্থী ও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করেছেন; আব্দ আল-ওয়াহহাবের বিপরীতে মতবাদগত পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না তাঁরা। জনগণকে মূল কাল্টে ফিরিয়ে নিয়ে ও তাদের নৈতিকভাবে জীবন যাপনে অনুপ্রাণিত করে জটিল ফিকহের চেয়ে অনেক কার্যকরভাবে সমাজের অসুস্থতাকে দূর করা যাবে।
শত শত বছর ধরে সুফিগণ শিষ্যদের তাদের নিজস্ব জীবনে মুহাম্মদীয় প্যারাডাইম নতুন করে সৃষ্টি করার শিক্ষা দিয়ে এসেছেন; তারাও জোর দিয়ে বলেছেন আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথই হচ্ছে সৃজনশীল ও অতীন্দ্ৰিয় কল্পনা: মানুষের সুফিবাদের ধ্যানমূলক অনুশীলনের সাহায্যে অবশ্যই নিজের মতো থিওফ্যানি সৃষ্টি করার দায়িত্ব রয়েছে। অষ্টম শতাব্দীর শেষে ও উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এইসব সংস্কারকগণ-পণ্ডিতরা যাদের ‘নিও-সুফি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন—আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষকে তাঁরা সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টির উপর নির্ভর করার শিক্ষা দিয়েছেন, তাদের আর পণ্ডিত ও বিদ্বান যাজকের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। ইবন ইদ্রিস এমনকি যত মহানই হোন না কেন, পয়গম্বর বাদে সকল মুসলিম সাধুর কর্তৃত্ব পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করার মতো পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলেন। এভাবে তিনি মুসলিমদের যা কিছু নতুন তাকে মূল্য দিতে ও শ্রদ্ধার আলখেল্লাহ ঝেড়ে ফেলার উৎসাহ দিয়েছেন। অতীন্দ্রিয় অনুসন্ধানের লক্ষ্য আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া নয়, বরং পয়গম্বরের মানবীয় চরিত্রের সাথে গভীরভাবে একীভূত হওয়া-যিনি আল্লাহর কাছে নিজেকে এমনি নিখুঁতভাবে উন্মুক্ত করে তুলেছিলেন। প্রাথমিকভাবে এগুলো আধুনিক প্রবণতা ছিল। নিও-সুফিগণ পয়গম্বরের আদিআদর্শ ব্যক্তিত্বের মুখাপেক্ষী থাকলেও তারা যেন দুর্ভেয়মুখী নয় বরং মানবমুখী ধর্মবিশ্বাসের বিকাশ ঘটাচ্ছিলেন এবং শিষ্যদের যা কিছু নতুন ও উদ্ভাবনী শক্তির তাকে প্রাচীনের মতোই মূল্য দিতে শেখাচ্ছিলেন। পশ্চিমের সাথে ইবন ইদ্রিসের কোনও যোগাযোগ ছিল না, তিনি কখনওই তাঁর লেখায় ইউরোপের কথা উল্লেখ করেননি, পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে জ্ঞান বা তার প্রতি কোনও আগ্রহেরও প্রকাশ ঘটাননি। কিন্তু সুন্নি ইসলামের পৌরাণিক অনুশীলন তাঁকে ইউরোপিয় আলোকনের কিছু কিছু নীতিমালাকে আলিঙ্গন করতে চালিত করেছে।২৫
ইরানের ক্ষেত্রেও একই রকম ছিল ব্যাপারটা। এই দেশের এই সময়ের ইতিহাস মিশরের তুলনায় ভালোভাবে লিখিত আছে। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সাফাভিয়রা ইরান জয় করে শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রের সরকারী ধর্মে পরিণত করে। এর আগে পর্যন্ত শিয়া মতবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অতীন্দ্রিয় নিগূঢ় অভিজাত আন্দোলন ছিল; নীতিগতভাবে শিয়ারা রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণ হতে বিরত ছিল। ইরানে সব সময়ই কিছু প্রধান শিয়া কেন্দ্র ছিল, তবে বেশির ভাগ শিয়াই ছিল আরব, পারসি নয়। সুতরাং, ইরানে সাফাভিয় পরীক্ষা ছিল এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। সুন্নি ও শিয়াদের ভেতর কোনও মতবাদগত বিরোধ নেই, পার্থক্যটা স্পষ্টতই আবেগজাত। সুন্নিরা মূলত মুসলিম ইতিহাসের বেলায় আশাবাদী, অন্যদিকে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি ট্র্যাজিক: পয়গম্বর মুহাম্মদের (স) বংশধরদের পরিণতি শুভ ও অশুভ, ন্যায়বিচার ও স্বৈরাচারের মাঝে মহাজাগতিক যুদ্ধের একটা প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুষ্টই যেন সব সময় জয় লাভ করছে বলে মনে হয়। সুন্নিরা যেখানে মুহাম্মদের (স) জীবনকে মিথে পরিণত করেছে, শিয়ারা তাঁর বংশধরদের জীবনকে পুরাণে পরিণত করেছে। শিয়া বিশ্বাস উপলব্ধির জন্যে-যা না হলে ১৯৭৮-৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের মতো ঘটনাবলী বোধের অতীত-আমাদের অবশ্যই সংক্ষেপে শিয়া বিশ্বাসের বিকাশ বিবেচনা করতে হবে।
