গোড়ার দিকে অটোমানরা মামলুকদের সামাল দিতে পেরেছিল, দুটি মামলুক বিদ্রোহকে দমন করেছিল তারা।[১৪] তবে ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে অটোমানরা তাদের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ফেলতে যাচ্ছিল। ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি প্রশাসনে পতন ডেকে আনে এবং ক্রমশঃ বেশ কয়েকটা বিদ্রোহের পর মামলুক অধিনায়করা (বে) মিশরের আসল শাসক হিসাবে আবির্ভূত হন, যদিও সরকারীভাবে ইস্তাম্বুলের অধীন ছিলেন তাঁরা। বে-গণ উচ্চ পদমর্যাদা সম্পন্ন সামরিক ক্যাডার গড়ে তুলেছিলেন, এই বাহিনী তুর্কি গভর্নরের বিরুদ্ধে অটোমান সেনাবাহিনীতে মামলুক বাহিনীর একটা বিদ্রোহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় ও তার জায়গায় নিজেদের একজনকে ক্ষমতায় বসায়। সুলতান এই নিয়োগের বৈধতা দান করেন। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে সংক্ষিপ্ত একটা পর্যায় বাদে মামলুকরা দেশের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পেরেছিল। ওই সময় জানেসারিদের একজন ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিলেন। তবে মামলুক শাসন ছিল অস্থিতিশীল। বে-তন্ত্ৰ দুটো উপদলে বিভক্ত ছিল, ফলে সারাক্ষণ অস্থিরতা ও অন্তর্দলীয় কোন্দল লেগেই থাকত।[১৫] এই গোটা উত্তাল সময় জুড়ে প্রধান শিকার ছিল মিশরের সাধারণ জনগণ। বিদ্রোহ ও উপদলীয় সহিংসতার সময় তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, করের ভারে পঙ্গু হয়ে গেছে তারা। তুর্কি বা সারকাসিয়ান, যাই হোক না কেন, শাসকদের সাথে তারা কোনওরকম ঐক্য বোধ করতে পারেনি, এরা ছিল বিদেশী ও জনগণের কল্যাণে কোনও আগ্রহ ছিল না তাদের। জনগণ ক্রমবর্ধমানহারে উলেমাদের শরনাপন্ন হচ্ছিল: মিশরিয় ছিলেন তাঁরা, শরীয়ার পবিত্র শৃঙ্খলার প্রতিনিধিত্ব করতেন। তাঁরাই মিশরিয় জনগণের প্রকৃত নেতায় পরিণত হন। অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে বে-দের ভেতরকার বিরোধ আরও প্রকট আকার ধারণ করলে মামলুক নেতৃবৃন্দ আবিষ্কার করেন যে, জনগণকে তাদের শাসন মেনে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্যে উলেমাদের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গতি নেই।১৬
উলেমারা ছিলেন মিশরিয় সমাজের শিক্ষক, পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী। প্রতিটি শহরে এক থেকে সাতটি মাদ্রাসা (ইসলামি আইন ও ধর্মতত্ত্ব পাঠের বিশ্ববিদ্যালয়) ছিল, এগুলোই ছিল দেশের শিক্ষকের যোগানদার। বুদ্ধিবৃত্তির মান খুব উন্নত ছিল না। প্রথম সেলিম মিশর দখল করে নেওয়ার পর প্রচুর মূল্যবান পাণ্ডুলিপিসহ বহু নেতৃস্থানীয় উলেমাকে সাথে করে ইস্তাম্বুলে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অটোমান সাম্রাজ্যের একটা পশ্চাদপদ প্রদেশে পরিণত হয়েছিল মিশর। অটোমানরা আরব পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়নি। মিশরিয়দের বাইরের পৃথিবীর সাথে কোনও যোগাযোগ ছিল না। মামলুক শাসনের সময় সমৃদ্ধি লাভ করা মিশরিয় দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ওষুধবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল।১৭
কিন্তু শাসক ও সাধারণ জনগণের ভেতর যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম থাকায় উলেমাগণ যাপরনাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। এদের বেশিরভাগই এসেছিলেন ফেলাহীন কৃষক শ্রেণী থেকে, তাই পল্লী অঞ্চলে তাদের প্রভাব ছিল উল্লেখ করার মতো। কোরান স্কুল ও মাদ্রাসায় গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁরা; শরীয়া আদালতসমূহ বিচার ব্যবস্থার মুল কেন্দ্র থাকায় উলেমাগণ আইনি ব্যবস্থায়ও একচেটিয়া অধিকার ভোগ করতেন। এছাড়া, দিওয়ানে” গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদের অধিকারী ছিলেন তাঁরা এবং শরীয়াহর অভিভাবক হিসাবে সরকারের বিরুদ্ধে মূল বিরোধিতারও নেতৃত্ব দিতে পারতেন। বিখ্যাত মাদ্রাসা আল-আযহারের অবস্থান ছিল বাজারের পাশে, উলেমাদের সাথে বণিক শ্রেণীর শক্তিশালী সম্পর্ক ছিল। সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চাইলে তারা আযহারের মিনার থেকে বাজানো ঢাকের আওয়াজেই বাজার বন্ধ করে দিতে পারত ও লোকজনকে রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারত। উদাহরণ স্বরূপ, ১৭৯৪ সালে আযহারের রেক্টর শেখ আল-শারকাভি এক নতুন করারোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, একে নির্যাতনমূলক ও অনৈসলামিক ঘোষণা করেছিলেন তিনি। তিন দিন পরে বে-গণ কর প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।১৯ কিন্তু সরকার উৎখাত করে উলেমাদের সরকার গঠনের লক্ষ্যে অভ্যুত্থান পরিচালনার কোনও বাস্তব হুমকি ছিল না। বে-গণ সাধারণত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন। মব ভায়োলেন্স প্রায়শঃই মামলুক সেনাবাহিনীর পক্ষে তেমন কোনও চলমান চ্যালেঞ্জ ছিল না। তা সত্ত্বেও উলেমাদের প্রাধান্য মিশরিয় সমাজকে একটা লক্ষযোগ্য ধর্মীয় চরিত্র দান করেছিল, ইসলামই মিশরের জনগণকে একমাত্র নিরাপত্তার যোগান দিয়েছিল।২১
অষ্টম শতাব্দীর শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ছিল যারপরনাই মূল্যবান। এই সময় নাগাদ অটোমান সাম্রাজ্য মারাত্মক অবনতির শিকারে পরিণত হয়। এর ষোড়শ শতকীয় সরকারের অসাধারণ দক্ষতা বিশেষ করে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় অযোগ্যতার জন্ম দেয়। বিস্ময়করভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করেছিল পাশ্চাত্য জগৎ। অটোমানরা আবিষ্কার করে যে তারা এখন আর আগের মতো ইউরোপের সাথে সমান তালে লড়তে পারছে না। পাশ্চাত্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল, সেটা রাজনৈতিক দুর্বলতার কালে ঘটছিল বলে নয়, বরং ইউরোপে গড়ে উঠতে থাকা এক নতুন সমাজের কোনও পূর্ব নজীর না থাকায়।২২ সুলতানগণ মানিয়ে নেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন, কিন্তু তাঁদের প্রয়াস ছিল বাহ্যিক। উদাহরণ স্বরূপ, সুলতান তৃতীয় সেলিম (১৭৮৯-১৮০৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেন) পাশ্চাত্য হুমকিকে কেবল সামরিক ভিত্তিতে বিবেচনা করেছেন। ১৭৩০-এর দশকে ইউরোপিয় ধাঁচে সেনাবাহিনীকে গড়ো তোলার ব্যর্থ প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ১৭৮৯ সালে সিংহাসনে আরোহণ করার পর সেলিম ফরাসী নির্দেশকসহ বেশ কয়েকটি সামরিক স্কুল খোলেন: ছাত্ররা এখানে ইউরোপিয় ভাষা ও গণিত, নৌচলাচল, ভূগোল ও ইতিহাসের বইয়ের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠে।২৩ অল্প কিছু সামরিক কৌশল শিক্ষা ও আধুনিক বিজ্ঞানের ভাসা ভাসা জ্ঞান অবশ্য পাশ্চাত্য হুমকিকে সামাল দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। কারণ ইউরোপিয়রা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জীবন ও চিন্তা ধারার বিকাশ ঘটিয়েছিল; ফলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কেতায় কাজ করছিল তারা। তাদের নিজস্ব কৌশলে তাদের মোকাবিলা করার লক্ষ্যে অটোমানদের প্রয়োজন ছিল সমাজের ইসলামি কাঠামো ভেঙে একেবারে নতুন ধরনের যৌক্তিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো ও অতীতের সাথে সমস্ত পবিত্র সম্পর্ক ছেদ করতে প্রস্তুত থাকা। অভিজাত গোষ্ঠীর অল্প কিছু মানুষের পক্ষে হয়তো এই পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব ছিল, ইউরোপিয়দের যার জন্যে প্রায় তিনশো বছর লেগেছিল; কিন্তু সাধারণ জনগণকে কীভাবে তাঁরা এমন রেডিক্যাল পরিবর্তন মেনে নিতে ও উপলব্ধি করতে সম্মত করাতেন, যাদের মনমানসিকতা রক্ষণশীল রীতিনীতিতে পরিপূর্ণ?
