এছাড়া, রক্ষণশীল সমাজকে সম্পূর্ণ স্থবির কল্পনা করে নেওয়াটা ভ্রান্তি হবে। গোটা মুসলিম ইতিহাস জুড়ে ইসলা (‘সংস্কার’) ও তাজদিদ (‘নবায়ন’)-এর আন্দোলন চলেছে, প্রায়শঃই এগুলো ছিল সম্পূর্ণই বিপ্লবী। উদাহরণ স্বরূপ, দামাস্কাসের আহমাদ ইবন তাঈমিয়াহর (১২৬৩-১৩২৮) মতো একজন সংস্কারক ‘ইজতিহাদের দুয়ার রুদ্ধ করার’ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মঙ্গোল আগ্রাসনের আগে ও পরে জীবন যাপন করেছেন তিনি, মুসলিমরা এই সময় প্রবল আচ্ছন্ন দশা থেকে মুক্ত হয়ে সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়াস পাচ্ছিল। সাধারণভাবে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কালে বা ব্যাপক রাজনৈতিক বিপর্যয়ের অব্যবহিত পরপর সাংস্কৃতিক আন্দোলন সৃষ্টি হয়ে থাকে। এমন সময়ে পুরোনো সমাধান আর কাজে আসে না, সুতরাং সংস্কারকগণ ইজতিহাদের যৌক্তিক ক্ষমতা ব্যবহার করে স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে থাকেন। ইবন তাঈমিয়াহ শরীয়াকে হালনাগাদ করতে চেয়েছিলেন যাতে করে তা এই খোলনলচে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে মুসলিমদের সত্যিকারের প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু তাঁর কর্মসূচি আবিশ্যিকভাবে রক্ষণশীল রূপ ধারণ করেছিল। ইবন তাঈমিয়া বিশ্বাস করতেন যে, সঙ্কট উত্তরণের জন্যে মুসলিমদের অবশ্যই উৎসে, অর্থাৎ কোরান ও পয়গম্বরের সুন্নাহ্য় ফিরে যেতে হবে। পরবর্তীকালের সকল ধর্মীয় সংযোজন বাতিল করে মূলে ফিরে যেতে চেয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, আদিম মুসলিম আদর্শরূপে ফিরে যেতে পবিত্র বিবেচিত হতে শুরু করা অনেক মধ্যযুগীয় জুরিপ্রুডেন্স (ফিকহ) ও দর্শন বাতিল করে দিয়েছিলেন। এই প্রতিমাবিরোধিতা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষিপ্ত করে তোলে এবং ইবন তাঈমিয়া বাকি জীবন কারাগারে কাটান। বলা হয়ে থাকে যে, আটককারী তাঁকে কলম ও কাগজ না দেওয়ায় ভগ্ন হৃদয়ে মারা গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁকে ভালোবেসেছিল, তাঁর আইনি সংস্কার ছিল উদার ও রেডিক্যাল, তারা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের স্বার্থই তিনি মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন।২ তাঁর অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠান জনপ্রিয় স্বীকৃতির প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। ইসলামি ইতিহাসে এমন আরও অনেক সংস্কারক রয়েছেন। আমরা আমাদের বর্তমান কালের কোনও কোনও মুসলিম মৌলবাদীকে ইসলাহ ও তাজদিদের এই ঐতিহ্যে কাজ করতে দেখব।
অন্য মুসলিমরা নিগূঢ় আন্দোলনের মাঝে নতুন ধর্মীয় ধারণা ও অনুশীলনের সন্ধান করতে পেরেছিল। এসব সাধারণ জনগণের কাছে গোপন রেখেছিল তারা, কেননা তাদের ধারণা ছিল এসবকে ভুল বোঝা হতে পারে। অবশ্য, তারা ধর্ম সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধারণার কোনও পার্থক্য দেখতে পায়নি। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাদের আন্দোলনসমূহ কোরানের শিক্ষার সম্পূরক ছিল এবং সেগুলোকে নতুন প্রাসঙ্গিকতা দিয়েছে। ইসলামের তিনটি প্রধান নিগূঢ় ধরন হচ্ছে, সুফিবাদের অতীন্দ্রিয়বাদী অনুশীলন, ফালসাফাহর যুক্তিবাদ ও শিয়া ধর্মমতের কিছুটা রাজনৈতিক ধার্মিকতা। এই অধ্যায়ে আমরা তার বিস্তারিত অনুসন্ধান করব। কিন্তু ইসলামের এই নিগূঢ় ধরনগুলোকে যত উদ্ভাবনীমূলক বা মূলধারার শরীয়া ধার্মিকতা থেকে যতই বিচ্ছিন্ন মনে হোক না কেন, মরমীরা বিশ্বাস করত যে তারা আদ ফন্তেসে ফিরে যাচ্ছে। কোরানের ধর্মে গ্রিক যুক্তিবাদের নীতিমালা প্রয়োগের প্রয়াস লাভকারী ফালসাফাহর প্রচারকরা সময়হীন সত্যির আদিম সর্বজনীন ধর্মবিশ্বাসে ফিরে যেতে চেয়েছে, তাদের ধারণা ছিল ওই ধর্ম বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধর্মের আগেও বিরাজ করত। সুফিরা বিশ্বাস করেছে যে, অতীন্দ্রিয় পরমানন্দ পয়গম্বর কোরান গ্রহণ করার সময় যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তারই পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তারাও মুহাম্মদের (স) আদি আদর্শের সাথে একাত্ম হচ্ছে। শিয়াদের দাবি, কেবল তারাই কোরানে উল্লিখিত সামাজিক ন্যায়বিচারের আবেগের চর্চা করে, কিন্তু দুর্নীতিবাজ মুসলিম শাসকগণ তাকে উপেক্ষা করে গেছেন। নিগূঢ়বাদীদের কেউই আমাদের ধারণা অনুযায়ী ‘মৌলিক’ হতে চায়নি, সবাইই মূলে ফিরে যাওয়ার রক্ষণশীল দিক থেকে মৌলিক, কেবল সেটাই মানুষকে পূর্ণাঙ্গতা ও পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বাস করা হত।[১৩]
এই গ্রন্থে আমরা যেসব দেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব তাদের ভেতর একটি মিশর। ১৫১৭ সালে এই দেশটি অটোমান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। প্রথম সেলিম সেই সময় সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনার সময় দেশটি অধিকার করে নিয়েছিলেন। সুতরাং শরীয়া ধার্মিকতা মিশরে প্রধান ছিল। কায়রোর বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আল আযহার সুন্নি বিশ্বে ফিকহ গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। কিন্তু অটোমান শাসনের শতাব্দীগুলোয় ইস্তাম্বুলের পেছনে পড়ে যায় মিশর, আপেক্ষিকভাবে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে তার অস্তিত্ব। আধুনিক কালের সূচনা লগ্নে এই দেশটির অবস্থা সম্পর্কে খুব কমই জানি আমরা। ১২৫০ সাল থেকে এই অঞ্চল মামলুকদের শাসনাধীন ছিল—এরা ছিল কিশোর বয়সে বন্দি করে ইসলামে ধর্মান্তরিত কর্সিকান দাসদের নিয়ে সংগঠিত একটা ক্র্যাক সামরিক বাহিনী। একই ধরনের দাস-বাহিনী জানেসারিরা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের সামরিক মেরুদণ্ড। তুঙ্গ সময়ে মামলুকরা মিশর ও সিরিয়ায় এক প্রাণবন্ত সমাজে নেতৃত্ব দিয়েছে। মিশর ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অগ্রসর দেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মামলুক সাম্রাজ্য কৃষিভিত্তিক সভ্যতার সহজাত সীমাবদ্ধতার কাছে নতি স্বীকার করে নেয়, এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এর পতন শুরু হয়। মামলুকরা অবশ্য মিশরে সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়নি। অটোমান সুলতান প্রথম সেলিম আলেপ্পোর মামলুক গভর্নর খায়ের বে’র সাথে জোট বেঁধে দেশটি দখল করে নেন। এই রফার অধীনে খায়ের বে-কে অটোমান বাহিনী প্রত্যাহৃত হওয়ার পর ভাইসরয় নিয়োগ করা হয়েছিল।
