তীর্থযাত্রায় গেছে এমন একজন মুসলিমের কাছে এখনও সর্বোচ্চ ধর্মীয় অভিজ্ঞতা হজ্জ এভাবে গভীরভাবে রক্ষণশীল চেতনায় পরিপূর্ণ। সকল প্রকৃত মিথোই-এর মতো পৌরাণিক আদর্শজগতের অবচেতন বিশ্বে প্রোথিত হাজ্জ মুসলিমদের সেই মৌল উপাদানের কথা মনে করিয়ে দেয় যা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে কারও পক্ষে এর বাইরে যাওয়া অসম্ভব। এটা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের চেয়ে গভীরে যেতে, বস্তুনিচয়ের আবিশ্যিকভাবে স্বাভাবিক ধর্মে আত্মসমর্পণ ও নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে অগ্রসর না হতে সাহায্য করে। সম্প্রদায়ের সমস্ত যৌক্তিক কর্মকাণ্ড-রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য বা সামাজিক সম্পর্ক-পৌরাণিক প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত ও পরে মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে অবস্থিত কাবাহ এইসব যৌক্তিক কর্মকাণ্ডকে অর্থ ও পরিপ্রেক্ষিত দান করেছে। কোরানও এই রক্ষণশীল মনোভাব তুলে ধরেছে। এটা বারবার জোরের সাথে বলেছে যে, মানুষের কাছে এটা কোনও নতুন সত্যি বয়ে আনছে না, বরং মানবজীবনের অত্যাবশ্যক বিধিবিধানকেই প্রকাশ করছে। এটা এরই মধ্যে জানা সত্যিরই ‘স্মারক’। মুহাম্মদ (স) মনে করেননি যে তিনি একটি নতুন ধর্ম তৈরি করছেন, বরং বিশ্বাস করেছেন যে, এই আরবীয় গোত্রের কাছে মানবজাতির আদিমতম ধর্মকেই নিয়ে আসছেন; এর আগে কখনও এদের কাছে কোনও পয়গম্বর প্রেরণ করা হয়নি, তাদের নিজস্ব ভাষায় কোনও ঐশীগ্রন্থও ছিল না। কোরানের দৃষ্টিতে প্রথম পয়গম্বর আদমের কাল থেকেই কীভাবে জীবন যাপন করতে হবে তার শিক্ষা দিতে আল্লাহ পৃথিবীর বুকে প্রত্যেক জাতির কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করেছেন।’ সহজাতভাবে স্বর্গীয় বিধির কাছে আত্মসমর্পণ করায় প্রকৃতিগতভাবেই মুসলিম পশু-পাখি, মাছ বা গাছের বিপরীতে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে, ইচ্ছে করলে সে এই বিধানকে অমান্য করতে পারে।” তারা যখন এইসব মৌল বিধানকে অমান্য করে দরিদ্রের উপর নির্যাতনকারী সুষ্ঠুভাবে সম্পদ বণ্টনে অস্বীকারকারী স্বেচ্ছাচারী সমাজ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখনই তারা তাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে। কোরান আমাদের জানাচ্ছে অতীতের মহান সব পয়গম্বর-আদম, নোয়াহ, মোজেস, জেসাস এবং আরও অনেকে—কীভাবে আল্লাহ’র সেই একই বাণী উচ্চারণ করেছেন। এখন কোরান আরবদের কাছে সেই একই স্বর্গীয় বাণী এনে দিয়েছে, তাদের সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার চর্চা করার নির্দেশ দিচ্ছে যা তাদের অস্তিত্বের মৌল বিধির সাথে সমন্বিত করবে। মুসলিমরা যখন আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী চলে, সবকিছু যেমন হওয়া উচিত ছিল সেইভাবে বস্তুনিচয়ের ধারার সাথে চলার বোধ জাগে তাদের ভেতর। আল্লাহ’র বিধান অমান্য করাকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ বিবেচনা করা হয়েছে: এ যেন কোনও মাছ জমিনে বাস করার প্রয়াস পাচ্ছে।
ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমানদের বিস্ময়কর সাফল্যকে নিশ্চয়ই তাদের প্রজাদের চোখে তারা যে এই মৌল নীতিমালার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ হিসাবে ফুটে উঠেছিল। একারণেই তাদের সমাজ এমন দর্শনীয়ভাবে কাজ করেছে। অটোমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় শরীয়াহ আইনকে দেওয়া নজীরবিহীন প্রাধ্যান্যকেও এই রক্ষণশীল চেতনায় দেখা হয়েছিল। আধুনিকতার সূচনায় মুসলিমরা স্বর্গীয় আইনকে তাদের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্নকারী বিষয় মনে করেনি, এটা ছিল পৌরাণিক আদর্শজগতের আচরিক ও কাল্টিক বাস্তবায়ন, যা তাদের পবিত্রের সংস্পর্শে নিয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করেছে। মুহাম্মদের (স) পরলোকগমনের পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় ধীরে ধীরে মুসলিম আইনের বিকাশ ঘটেছে। কোরানে খুব কমই বিধানের অস্তিত্ব রয়েছে আর পয়গম্বরের পরলোকগমনের এক শো বছরের ভেতর মুসলিমরা হিমালয় থেকে পিরেনীজ পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করছিল বলে অন্য যেকোনও সমাজের মতোই এর জটিল আইনি ব্যবস্থার প্রয়োজন থাকায় এটা ছিল একটা সৃজনশীল উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্সের চারটি ধারা গড়ে ওঠে। সবগুলোই প্রায় একই ধরনের, এদের সমানভাবে বৈধ মনে করা হয়। পয়গম্বর মুহাম্মদের (স) ব্যক্তিত্বের উপর ভিত্তি করে এই বিধানব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। স্বর্গীয় প্রত্যাদেশ গ্রহণের সময় ইসলামের নিখুঁত ভঙ্গিমা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। নবম শতাব্দীতে খুব সতর্কতার সাথে পয়গম্বরের শিক্ষা ও আচরণ সংক্রান্ত প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতিবেদন (হাদিস) সংগ্রহ করা হয়, মুসলিমরা তাঁর বাণী ও ধর্মীয় অনুশীলনের (সুন্নাহ) একটা নির্ভুল রেকর্ড লাভ করে সেটা নিশ্চিত করতে যত্নের সাথে বাছাই করা হয়েছে। আইনি মতবাদগুলো মুহাম্মদীয় এই প্যারাডাইমগুলোকে তাদের আইনি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করে যাতে সারা বিশ্বের মুসলিমরা পয়গম্বর যেভাবে কথা বলতেন, খেতেন, হাতমুখ ধুতেন, ভালোবাসতেন ও প্রার্থনা করতেন তার অনুকরণ করতে পারে। এইসব বাহ্যিক বিষয়ে পয়গম্বরের অনুকরণের ভেতর দিয়ে তারা আল্লাহর কাছে তাঁর অন্তস্থঃ আত্মসমর্পণের নাগাল পাবার আশা করেছিল।” প্রকৃত রক্ষণশীল চেতনায় মুসলিমরা অতীতের এক নিখুঁত বিষয়ের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছিল।
মুসলিম বিধানের অনুশীলন ঐতিহাসিক চরিত্র মুহাম্মদকে (স) মিথে পরিণত করে তাঁকে তিনি যে কালে বেঁচেছিলেন সেই কাল থেকে মুক্ত করে প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলিমের ব্যক্তি জীবনে তুলে এনেছে। একইভাবে এই কাল্টিক পুনারাবৃত্তি মুসলিম সমাজকে আল্লাহর কাছে নিখুঁত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে একজন মানুষের কেমন হওয়া উচিত তার নজীরে পরিণত হওয়া ব্যক্তি মুহাম্মদের (স) নৈকট্য লাভের ভেতর দিয়ে প্রকৃত ইসলামি করে তুলেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোল আগ্রাসনের সময় নাগাদ শরীয়াহ আধ্যাত্মিকতা শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সারা মুসলিম বিশ্বে শেকড় বিস্তার করেছিল, সেটা খলিফা ও উলেমাগণ এটা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কারণে নয়, বরং এটা নারী-পুরুষকে নুমিনাসের অনুভূতি দিয়েছিল ও তাদের জীবনকে অর্থ দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলেছিল বলে। অতীতের প্রতি এই কাল্টিক উল্লেখ অবশ্য সপ্তম শতাব্দীর জীবনধারার প্রতি প্রাচীন আনুগত্যের কাছে বন্দি করেনি। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অটোমান সাম্রাজ্য তর্কসাপেক্ষে সবচেয়ে আধুনিক রাষ্ট্র ছিল। সময়ের হিসাবে এটা অসাধারণ দক্ষ ছিল, এক নতুন ধরনের আমলাতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে ও প্রাণবন্ত জীবনধারাকে উৎসাহিত করেছে। অটোমানরা অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি উদার ছিল। পাশ্চাত্য নৌচলাচল বিজ্ঞান তাদের সত্যিই উত্তেজিত করে তুলেছিল, অভিযাত্রীদের বিভিন্ন আবিষ্কারে রীতিমতো আলোড়িত হয়েছে; এবং গানপাউডার ও আগ্নেয়াস্ত্রের মতো পাশ্চাত্য সামরিক আবিষ্কার আয়ত্ত করতে তারা উদগ্রীব ছিল।” উলেমাদের দায়িত্ব ছিল এইসব উদ্ভাবনকে মুসলিম আইনে মুহাম্মদীয় প্যারাডাইমের অন্তর্ভুক্ত করার পদ্ধতির অনুসন্ধান করা। জুরিপ্রুডেন্সের গবেষণা (ফিকহ) মানে কেবল প্রাচীন টেক্সট পাঠের ব্যাপার ছিল না, বরং এর চ্যালেঞ্জিং একটা মাত্রা ছিল। এবং এই সময় পর্যন্ত ইসলাম ও পশ্চিমের ভেতর কোনও পার্থক্য ছিল না। ইউরোপও রক্ষণশীল চেতনায় ডুবে ছিল। রেনেসাঁ মানবতাবাদীরা আদ ফন্তেসে, উৎসে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। আমরা দেখেছি, সাধারণ মরণশীলের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে ধর্ম থেকে বের হয়ে আসা কার্যত অসম্ভব। নতুন নতুন আবিষ্কার সত্ত্বেও ইউরোপিয়রা অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত রক্ষণশীল রীতিনীতিতেই শাসিত হয়েছে। পাশ্চাত্য আধুনিকতা ভবিষ্যৎমুখী যুক্তিবাদ দিয়ে জীবনের পশ্চাদমুখী পৌরাণিক ধারাকে প্রতিস্থাপিত করার পরেই কেবল কোনও কোনও মুসলিম ইউরোপকে অচেনা ভাবতে শুরু করবে।
