অবশ্য তুঙ্গ অবস্থায় শরীয়া আইনের ধারণা দারুণভাবে সন্তোষজনক ছিল। এটা ছিল ইসলামি আইনের প্রতি আনুগত্য থেকে বৈধতা লাভ করা অটোমান সাম্রাজ্যের সাফল্য। সুলতানকে শরীয়াহ আইনের রক্ষক হিসাবে শ্রদ্ধা করা হত। এমনকি সুলতান ও বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের নিজ দিওয়ান-খাস মহল-যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হত—থাকলেও শরীয়াহ আদালতের (অটোমানরাই প্রথম একে পদ্ধতিগতভাবে সংগঠিত করেছিল) সভাপতিত্বকারী কাজিরাই বিচারকের সীলমোহর হিসাবে বিবেচিত হতেন। কাজি, তাদের পরামর্শক মুফতি ও মাদ্রাসায় ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্সের শিক্ষাদানকারী পণ্ডিতগণ (ফিকহ) সবাই ছিলেন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা। তাঁরা সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতোই সরকারের পক্ষে আবশ্যক ছিলেন। সুলতানের কর্তৃত্ব ধর্মীয় পণ্ডিত উলেমাদের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করা হত বলে বিভিন্ন আরব প্রদেশের বাসিন্দারা তুর্কিদের আধিপত্য মিনে নিতে পেরেছিল, এদের পেছনে ইসলামি আইনের পবিত্র কর্তৃত্ব ছিল। সুতরাং সেই হিসাবে ইস্তাম্বুল ও বিভিন্ন প্রদেশের ভেতর উলেমাগণ সুলতান ও প্রজাদের ভেতর সম্পর্কের একটা উপায় ছিলেন। তাঁরা ক্ষোভের কথা সুলতানের কানে তুলতে পারতেন ও এমনকি ইসলামি বিধিবিধানের লঙ্ঘন হলে তাঁকেও ঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারতেন। সুতরাং, উলেমারা অটোমান রাষ্ট্রকে নিজেদের রাষ্ট্র মনে করতে পারতেন; আর সুলতানগণ অংশীদারি তাঁদের ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল বলে তাঁদের উপর যাজকদের আরোপিত বাধা মেনে নিতেন। অটোমান সাম্রাজ্যের মতো আর কখনওই শরীয়া আইন রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে এভাবে প্রধান ভুমিকা রাখতে পারেনি। ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের সাফল্য দেখিয়েছে যে, ইসলামি আইনের প্রতি আনুগত্য সত্যিই তাঁদের সঠিক পথে নিয়ে এসেছিল। অস্তিত্বের মৌল নীতিমালার সাথে একই ছন্দে অবস্থান করছিলেন তাঁরা।
সকল রক্ষণশীল সমাজ (যেমন ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে) এক সোনালি যুগের মুখাপেক্ষী থাকে; অটোমান সাম্রাজ্যের সুন্নি মুসলিমদের জন্যে সেটা ছিল পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) (c. ৫৭০-৬৩২সিই) ও তাঁর অব্যবহিত পরের প্রথম চার রাশিদুন (‘সঠিকপথে পরিচালিত’) খলিফা। তাঁরা ইসলামি আইন অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা করেছিলেন। ধর্ম ও রাষ্ট্রের কোনও বিচ্ছিন্নতা ছিল না। মুহাম্মদ (স) ছিলেন একাধারে ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রধান। সপ্তম শতাব্দীর আরবাসীদের জন্যে তাঁর নিয়ে আসা প্রত্যাদিষ্ট ঐশীগ্রন্থ কোরান জোর দিয়েছে যে, একজন মুসলিমের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায়বিচার ভিত্তিক সাম্যবাদী সমাজ গঠন করা যেখানে দরিদ্র ও দুস্থ জনগণের প্রতি সম্মানের সাথে আচরণ করা হবে। এর জন্যে প্রয়োজন সকল ক্ষেত্রে জিহাদের (একটি শব্দ ‘পবিত্র যুদ্ধে’র পরিবর্তে-যেমনটা পাশ্চাত্যবাসীরা প্রায়ই ধরে নেয়-যার অনুবাদ হওয়া উচিত ‘প্রয়াস’ বা ‘সংগ্ৰাম’।): আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত, সামরিক ও অর্থনৈতিক। আল্লাহকে প্রাধান্য দিয়ে সমাজ গঠনের মাধ্যমে ও মানবজাতির জন্যে তাঁর পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করে মুসলিমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংহতি অর্জন করবে যা তাদের আল্লাহর একত্বের বোধ জাগাবে। জীবনের কোনও একটি দিককে ঝেড়ে ফেলে তাকে এই ধর্মীয় ‘প্রয়াসে’র আওতার বাইরে ঘোষণা করা হবে প্রধান ইসলামি গুণ এই একীভূতকরণের (তাওহিদ) নীতির মারাত্মক লঙ্ঘন। এটা স্বয়ং আল্লাহকেই অস্বীকার করার শামিল হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং, ধর্মপ্রাণ কোনও মুসলিমের পক্ষে রাজনীতি হচ্ছে ক্রিশ্চানরা যাকে বলবে অপসুদীক্ষা। এটা এমন এক কর্মকাণ্ড যাকে পবিত্রায়িত করতেই হবে যাতে তা আল্লাহকে পাওয়ার একটি উপায়ে পরিণত হয়।
মুসলিম সম্প্রদায় অর্থাৎ উম্মাহর বিভিন্ন উদ্বেগ শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলিমের জন্যে বাধ্যতামূলক ইসলামের পাঁচটি আবশ্যকীয় অনুশীলন স্তম্ভে’ (রুকন) স্পষ্ট করা হয়েছে। ক্রিশ্চানরা যেখানে অর্থডক্সিকে সঠিক বিশ্বাস মনে করে, মুসলিমদের সেখানে ইহুদিদের মতো অর্থপ্র্যাক্সির, ধর্মীয় অনুশীলনের সর্বজনীনতা এবং বিশ্বাসকে গৌণ বিষয় হিসাবে দেখা প্রয়োজন। পাঁচটি স্তম্ভ অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিমকে শাহাদাহ (আল্লাহ’র একত্বে বিশ্বাস ও মুহাম্মদের (স) পয়গম্বরত্বের পক্ষে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি) উচ্চারণ করতে হয়, দৈনিক পাঁচবার প্রার্থনা করা, সমাজে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার জন্যে কর প্রদান (যাকাত) করা, দরিদ্রদের উপবাসে থাকার কষ্টের স্মরণে রমযান মাসে উপবাস পালন এবং পরিস্থিতি অনুকূল হলে মক্কায় হাজ্জ তীর্থযাত্রা পালন। উম্মাহর রাজনৈতিক স্বাস্থ্য স্পষ্টত যাকাত ও রমযানের উপবাসের মূখ্য বিষয়। কিন্তু আবিশ্যিকভাবেই সাম্প্রদায়িক ঘটনা হাজ্জে এটা জোরালভাবে উপস্থিত, এই সময় উম্মাহর ঐক্যকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্যে ও ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য মুছে ফেলার জন্যে তীর্থযাত্রী সর্বজনীন শাদা পোশাক পরে।
আরবীয় হিজাজের কেন্দ্রে মক্কায় অবস্থিত চৌকো আকৃতির উপাসনাগৃহ কাবাহ হাজ্জের মুল মনোযোগের বিষয়। কাবাহ এমনকি মুহাম্মদের (স) আমলেও বহু প্রাচীন ছিল, সম্ভবত আদিতে আরবীয় প্যাগান দেবনিচয়ের পরম ঈশ্বর আল্লাহ’র প্রতি নিবেদিত ছিল। মুহাম্মদ (স) কাবাহয় বার্ষিক তীর্থযাত্রার আনুষ্ঠানিকতাকে ইসলামিকরণ করেছেন, একেশ্বরবাদী তাৎপর্য দান করেছেন। এখন পর্যন্ত হাজ্জ মুসলিম সমাজের এক জোরাল অভিজ্ঞতা দান করে। কাবাহর কাঠামো মনস্তাত্ত্বিক জি.সি. জাঙ (১৮৭৫-১৯৫১) কর্তৃক আবিষ্কৃত আর্কিটাইপাল তাৎপর্যমণ্ডিত জ্যামিতিক প্যাটার্নের সাথে খাপ খায়। অধিকাংশ প্রাচীন শহরের কেন্দ্ৰে উপাসনালয় পবিত্রের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে, তাদের অস্তিত্বের পক্ষে যাকে আবশ্যক মনে করা হত। এটা মরণশীল নারী-পুরুষের নাজুক ও অরক্ষিত শহুরে সমাজে অধিকতর সক্ষম আদিম বাস্তবতাকে বয়ে আনত। পুতার্ক, ওভিদ, দিওনিসাস অভ হেলিকারনাসাসের মতো ধ্রুপদি লেখকগণ বৃত্তাকার বা চৌকো হিসাবে উপাসনাগৃহের বর্ণনা দিয়েছেন, এটা মহাবিশ্বের অত্যাবশ্যক কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলে বলে বিশ্বাস করা হত। এটা সেই প্যারাডাইম যা তুমুল বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে এবং একে টেকসই করে বাস্তবতা দান করেছে। জাঙ বিশ্বাস করতেন যে, চৌকো বা বৃত্তের ভেতর যেকোনও একটিকে বেছে নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই, বাস্তবতার ভিত্তি মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে তুলে ধরা জ্যামিতিক চিত্র, তিনি বিশ্বাস করতেন, বৃত্তের ভেতর প্রবেশ করানো একটা চতুর্ভুজ। উপাসনাগৃহে পালিত আচারগুলো উপাসককে মহাবিশ্বের মৌল নীতিমালা ও আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করে সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে ও একে বিভ্রান্তি বা কুহকের ফাঁদে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের সহজাত বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় ভরা জগতে স্বর্গীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। মক্কার কাবাহ ঠিক আর্কিওটাইপের সাথে মিলে যায়। গ্রানিটের চৌকো কাঠামো ঘিরে তীর্থযাত্রীরা সাতবার আচরিক প্রদক্ষিণে দৌড়ে বেড়ায়। এর চারটে কোণ পৃথিবীর কোণের প্রতিনিধিত্ব করে, পৃথিবীকে ঘিরে সূর্যের ঘূর্ণনের ধরনকে অনুসরণ করে তারা। নারী বা পুরুষ তার সম্পূর্ণ সত্তার জীবনের মৌল ভিত্তির কাছে কেবল অস্তিত্বগত আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়েই (ইসলাম) একজন মুসলিম (যিনি আত্মসমর্পণ করেছেন) সমাজে প্রকৃত মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকতে পারে।
