সেই সাথে শত শত বছরের কষ্টে সংগৃহীত জ্ঞানও হারিয়ে গিয়েছিল। মুসলিমরা সামলে নিয়েছিল; সুফি অতীন্দ্রিয়বাদীরা এক আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণে নেতৃত্ব দেন, যা লুরিয় কাব্বালাহর মতোই উপশমকারী বলে প্রমণিত হয়েছে; তিনটি নতুন সাম্রাজ্য ছিল সেই পুনরুজ্জীবনেরই নিদর্শন। অটোমান ও সাফাভিয় রাজবংশগুলোর মূল নিহিত ছিল মঙ্গোল যুগের ব্যাপক স্থানচ্যুতির ভেতর, দুটোই জন্ম নিয়েছে উগ্র গাযু রাষ্ট্রে, এগুলো সর্দার যোদ্ধার হাতে পরিচলিত হত ও প্রায়শঃই কোনও সুফি ত্বরিকার সাথে সম্পর্কিত ছিল। প্রলয়ঙ্করী ঘটনার সময় যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এই সাম্রাজ্যগুলোর শক্তি ও সৌন্দর্য ছিল ইসলামি মূল্যবোধের পুনরুত্থান ও মুসলিম ইতিহাসের আবার সঠিক পথে প্রত্যাবর্তনের গর্বিত উচ্চারণ। কিন্তু এমন মাত্রার বিপর্যয়ের পর প্রাক আধুনিক সমাজের স্বাভাবিক রক্ষণশীলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠাটাই ছিল স্বাভাবিক। লোকে সম্পূর্ণ নতুন কিছুর সন্ধান করার বদলে বরং যা কিছু হারিয়ে গেছে তাকেই আবার ধীরে ধীরে কষ্টের সাথে ফিরে পাবার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ,
সুন্নি ইসলামে-ধর্মের অধিকাংশ মুসলিমের অনুসৃত ভাষ্য, অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম-এই মর্মে ঐকমত্য স্থাপিত হয় যে ‘ইজতিহাদের দুয়ার’ (‘স্বাধীন যুক্তি প্রয়োগ’) রুদ্ধ হয়ে গেছে। এতদিন পর্যন্ত মুসলিম জুরিস্টদের কোরান বা কোনও প্রতিষ্ঠিত ট্র্যাডিশনে স্পষ্ট জবাব দেওয়া হয়নি এমনসব আদর্শ ও বিধিবিধান সংক্রান্ত উত্থাপিত প্রশ্নের সমাধান বের করার লক্ষ্যে নিজস্ব বিচার বিবেচনা প্রয়োগের অনুমতি ছিল। কিন্তু আধুনিক কালের গোড়ার দিকে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঐতিহ্য রক্ষার জন্যে সুন্নি মুসলিমরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে স্বাধীন ভাবনার আর প্রয়োজন নেই। সমস্ত উত্তর তৈরি রয়েছে, শরীয়াহই সমাজের স্থায়ী নীল নকশা; ইজতিহাদের প্রয়োজনও নেই, তা কাঙ্ক্ষিতও নয়। মুসলিমদের বরং অবশ্যম্ভাবীভাবে অতীতের অনুসরণ (তাকলিদ) করতে হবে। নতুন সমাধান সন্ধানের পরিবর্তে তাদের উচিত হবে প্রতিষ্ঠিত আইনি সারগ্রন্থে প্রাপ্য বিধির প্রতি নতি স্বীকার করা। আইন ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন (বিদাহ)-কে আধুনিক কালের গোড়ার দিকে সুন্নি ইসলামি জগতে ক্রিশ্চান পাশ্চাত্যের মতবাদগত বিষয়ে ধর্মদ্রোহের মতোই বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ও বিপজ্জনক মনে করা হত।
প্রবল রকম প্রতিমাবিরোধী আধুনিক পাশ্চাত্যের সাথে এরচেয়ে বেশি বেমানান প্রবণতা কল্পনা করা কঠিন। আমাদের যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতার উপর ইচ্ছাকৃত বাধা আরোপ এখন ঘৃণিত। পরের অধ্যায়ে আমরা যেমন দেখব, লোকে কেবল এই ধরনের বাধা ছুঁড়ে ফেলতে প্রস্তুত হলেই আধুনিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারে। পাশ্চাত্য আধুনিকতা লোগোসের ফল হয়ে থাকলে মিথোস কীভাবে প্রাক আধুনিক বিশ্বের ক্ষেত্রে রক্ষণশীল চেতনার সহায়ক ছিল সেটা বোঝা সহজ। পৌরাণিক ধ্যানধারণা অতীতমুখী, সামনে তাকায় না। পবিত্র সূচনা, আদিম ঘটনা, কিংবা মানুষের জীবনের ভিত্তির দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করে। নতুন কিছুর সন্ধান করার বদলে মিথ অটল কোনও কিছুর দিকে দৃষ্টি দেয়। আমাদের জন্যে এটা কোনও ‘সংবাদ’ বয়ে আনে না, বরং সবসময় কী ছিল সেই কথা বলে; গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত কিছুই চিন্তা করা হয়ে গেছে, অর্জিত হয়েছে। আমাদের পূর্ব পুরুষদের কথার উপর, বিশেষ করে পবিত্র টেক্সটের উপর ভিত্তি করে আমরা বেঁচে থাকি, আমাদের যা কিছু জানার তার সবই তা জানিয়ে দিয়েছে। এটাই ছিল রক্ষণশীল কালের চেতনা। কাল্ট, আচরিক অনুশীলন ও পৌরাণিক বিবরণ ব্যক্তিকে কেবল তার গভীরতর অবচেতনে অনুরণন তোলা অর্থই যোগাত না, বরং কৃষি নির্ভর সমাজে টিকে থাকার জন্যে জরুরি প্রবণতা ও এর সহজাত সীমাবদ্ধতাকে শক্তিশালী করে তুলত। শাব্বেতাই যেভি কেলেঙ্কারী যেমন স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, মিথের বাস্তব পরিবর্তন ঘটানোর কথা নয়। এটা মনের একটা অবস্থা তৈরি করে যা চলমান পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয় ও সমরূপতা অর্জন করে। অনিরুদ্ধ উদ্ভাবনকে স্থান দিতে অপারগ সমাজে এটা আবশ্যক ছিল।
পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানকারী পাশ্চাত্য সমাজে বসবাসকারী মানুষের পক্ষে যেমন মিথোলজির ভূমিকা বোঝা কঠিন-এমনকি অসম্ভব; তেমনি গভীর ও জোরালভাবে রক্ষণশীল আধ্যাত্মিকতায় গড়ে ওঠা মানুষের পক্ষেও আধুনিক সংস্কৃতির অগ্রসর গতিশীলতা গ্রহণ করা দারুণভাবে কঠিন—এমনকি অসম্ভবও। আবার, এখনও প্রথাগত পৌরাণিক মূল্যবোধে লালিত জাতিকে বোঝাও আধুনিকতাবাদীর পক্ষে যারপরনাই কঠিন। আমরা যেমন দেখব, বর্তমান ইসলামি বিশ্বে কোনও কোনও মুসলিম দুটো বিষয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। প্রথমত, তারা পাশ্চাত্য সমাজের ধর্মকে রাজনীতি থেকে, চার্চকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্নকারী সেক্যুলারিজমকে ঘৃণা করে; দ্বিতীয়ত, অনেক মুসলিমই তাদের সমাজ ইসলামের পবিত্র আইন শরীয়া আইন অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া দেখতে চায়। এটা আধুনিক চেতনায় গড়ে ওঠা মানুষের চোখে দারুণভাবে বিভ্রান্তিকর; তারা যুক্তিসঙ্গতভাবেই এই ভেবে ভীত যে একটা যাজকীয় প্রতিষ্ঠান তাদের চোখে স্বাস্থ্যকর সমাজের জন্যে আবিশ্যিক অবিরাম প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করবে। এরা চার্চ ও রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নকরণের সুবিধা ভোগ করেছে, তাই ইনকুইজিশনের মতো কোনও প্রতিষ্ঠান ‘ইজতিহাদের দুয়ার বন্ধ করে দিচ্ছে’ ভেবে শিউরে ওঠে। একই ভাবে প্রত্যাদেশ মারফত পাওয়া স্বর্গীয় বিধানের ধারণাও আধুনিক রীতিনীতির সাথে বেমানান। আধুনিক সেক্যুলারিস্টরা কোনও অতিমানবীয় সত্তা কর্তৃক মানবজাতির উপর চাপিয়ে দেওয়া অপরিবর্তনীয় আইনের ধারণা বিতৃষ্ণার উদ্রেককারী মনে করে। তারা মনে করে, আইন মিথোস থেকে নয়, বরং লোগোস থেকে উদ্ভুত। এটা যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক, চলমান অবস্থার মোকাবিলা করার জন্যে একে সময়ে সময়ে পরিবর্তনযোগ্য হতে হবে। সুতরাং, এইসব মূল ইস্যুই আধুনিকতাবাদীদের মুসলিম মৌলবাদীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
