এই তিনটি সাম্রাজ্য ছিল এক বিচ্যুতি। তিনটিই প্রাথমিক আধুনিক প্রতিষ্ঠান ছিল, পদ্ধতিগতভাবে আমলাতান্ত্রিক ও যৌক্তিক নির্ভুলতার সাথে এগুলো পরিচালিত হত। গোড়ার দিকের বছরগুলোতে অটোমান রাষ্ট্র ইউরোপের অন্য যেকোনও রাজ্যেও চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী ছিল। সুলতান দ্য ম্যাগনিফিশেন্টের (১৫২০- ৬৬) শাসনামলে তা শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছায়। গ্রিস, বালকান্স ও হাঙেরি হয়ে পশ্চিমে রাজ্য বিস্তৃত করেন সুলাইমান। ইউরোপের অভ্যন্তরে তাঁর অগ্রযাত্রা কেবল ১৫২৯ সালে ভিয়েনা অধিকারে ব্যর্থতার কারণেই প্রতিহত হয়েছিল। সাফাভিয় ইরানে শাহগণ অনেক সড়ক ও কারাভানসরাই নির্মাণ করেন ও অর্থনীতিকে সংহত রূপ দেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশকে সামনের কাতারে নিয়ে আসেন তাঁরা। সবগুলো সাম্রাজ্যই ইতালিয় রেনেসাঁর সমমানের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ উপভোগ করেছে। অটোমান স্থাপত্যকলা, সাফাভিয় শিল্পকলা ও তাজমহলের জন্যে এক মহান সময় ছিল ষোড়শ শতাব্দী।
কিন্তু তাসত্ত্বেও এসবই ছিল আধুনিকায়নের পথে চলা সমাজ, এরা কোনও রেডিক্যাল পরিবর্তন বাস্তবায়ন করেনি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া বিপ্লবী রীতিনীতির অংশীদার ছিল না তারা। বরং এই সাম্রাজ্যগুলো যা প্রকাশ করেছে তাকে আমেরিকান পণ্ডিত মার্শাল জি.এস. হজসন বলেছেন ইউরোপসহ সকল প্রাক আধুনিক সমাজেরই বৈশিষ্ট্য ‘রক্ষণশীল চেতনা’। প্রকৃতপক্ষেই এই সাম্রাজ্যগুলো ছিল রক্ষণশীল মানসিকতার শেষ রাজনৈতিক প্রকাশ; প্রাক আধুনিক কালের সবচেয়ে অগ্রসর রাষ্ট্র ছিল বলে বলা যেতে পারে এগুলো তার সমগ্রকে তুলে ধরেছে। আজ রক্ষণশীল সমাজ বিপদে রয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য রীতি কার্যকরভাবে অধিকার করে নিয়েছে তাকে কিংবা রক্ষণশীল থেকে আধুনিক চেতনায় উত্তরণের কঠিন পথে অগ্রসর হচ্ছে। অধিকাংশ মৌলবাদই এই বেদনাদায়ক উত্তরণের প্রতি সাড়া। সুতরাং, এই মুসলিম সাম্রাজ্যের তুঙ্গ অবস্থায় রক্ষণশীল চেতনাকে পরখ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আমরা এর আবেদন ও শক্তি এবং সেই সাথে সহজাত সীমাবদ্ধতাগুলোও উপলব্ধি করতে পারি।
পাশ্চাত্য (পুঁজি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে) সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সভ্যতা নিয়ে আসার আগে, উনবিংশ শতাব্দীর আগে যার অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়নি, সকল সংস্কৃতিই অর্থনৈতিকভাবে উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল ছিল। এর মানে, যেকোনও কৃষি নির্ভর সমাজের বিস্তার ও সাফল্যের একটা সীমাবদ্ধতা ছিল, কেননা শেষ পর্যন্ত তার সম্পদ ও দায়িত্ব ফুরিয়ে ফেলবে। বিনিয়োগের জন্যে প্রাপ্য পুঁজির সীমাবদ্ধতা ছিল। বিরাট পুঁজির প্রয়োজন হতে পারে এমন যেকোনও উদ্ভাবনকে নাকচ করে দেওয়া হত, কারণ লোকের সমস্ত কিছু ভেঙে ফেলে, কর্মচারীদের বহাল রেখে আবার নতুন করে শুরু করার কোনও উপায় ছিল না। পশ্চিমে আজ যাকে আমরা নিশ্চিত ধরে নিই, আমাদের সংস্কৃতির আগের কোনও সংস্কৃতিই অব্যাহত উদ্ভাবনকে সামাল দিতে পারেনি। এখন আমরা আমাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম থেকে বেশি জানবার প্রত্যাশা করি, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, আমাদের প্রজন্ম ক্রমেই আরও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর হয়ে উঠবে। আমরা ভবিষ্যৎমুখী, আমাদের সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আগামীর দিকে তাকাতে হয় ও আগামী প্রজন্মকে প্রভাবিত করবে এমন বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। এটা স্পষ্ট হবে যে, আমাদের এই সমাজ স্থিতিশীল একরোখা যুক্তিবাদী ভাবনার ফল। এটা লোগোসের সন্তান, যা সবসময়ই সামনে তাকায়, আরও জানতে চায় ও আমাদের ক্ষমতার সীমানা বাড়াতে চায়। কিন্তু কোনও যৌক্তিক ভাবনাই একটি আধুনিক অর্থনীতি ব্যতীত এই আগ্রাসীভাবে উদ্ভাবনী সমাজ গড়ে তুলতে পারত না। নতুন নতুন আবিষ্কার সম্ভব করে তোলার জন্যে পাশ্চাত্য সমাজগুলোর পক্ষে অবকাঠামো বদলে ফেলা অসম্ভব নয়, কেননা পুঁজির অবিরাম পুনর্বিনিয়োগের ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের মৌল সম্পদ বাড়িয়ে তুলতে পারি যাতে তারা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে তাল মেলাতে পারে। কিন্তু কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এটা সম্ভব ছিল না, এখানে লোকে ইতিমধ্যে যা কিছু অর্জিত হয়েছে তাকেই টিকিয়ে রাখতে শক্তি ব্যয় করত। একারণে প্রাক আধুনিক কালের ‘রক্ষণশীল’ প্রবণতা কোনও মৌল ভীরুতা থেকে উৎপন্ন হয়নি, বরং এই ধরনের সংস্কৃতির বাস্তবসম্মত মূল্যায়নই তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষা মূলত পালাক্রমিক জানার ব্যাপার ছিল, এখানে কোনওরকম মৌলিকত্বকে উৎসাহিত করা হত না। কারণ সমাজ সাধারণভাবে ধারণ করতে পারত না বলে ছাত্রদের কোনও রেডিক্যাল নতুন ধারণা ভাবতে উৎসাহিত করা হত না; সুতরাং, এই ধরনের ভাবনা সামাজিকভাবে বিধ্বংসী হয়ে গোটা সম্প্রদায়কে বিপদাপন্ন করে তুলতে পারত। রক্ষণশীল সমাজে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বাক স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হত।
আধুনিকদের মতো ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর বদলে প্রাক আধুনিক সমাজগুলো অনুপ্রেরণার জন্যে অতীতের দিকে মুখ ফেরাত। অবিরাম উন্নয়নের প্রত্যাশার বদলে ধরে নেওয়া হত যে পরবর্তী প্রজন্ম অনায়াসে অতীতে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে। সাফল্যের নতুন চূড়ায় আরোহণের বদলে সমাজগুলো আদিম নিখুঁত অবস্থা থেকে অবনত হয়েছে বলে মনে করা হত। এই কল্পিত সোনালি যুগকে সরকার ও ব্যক্তি বিশেষের জন্যে আদর্শ মনে করা হত। অতীতের এই আদর্শের কাছাকাছি যাওয়ার ভেতর দিয়েই কেবল কোনও সমাজ তার সম্ভাবনাকে পূর্ণ করতে পারত। সভ্যতাকে সহজাতভাবে নাজুক মনে করা হত। সবাই জানত, পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিম ইউরোপের মতো যেকোনও দেশই বর্বর কালে পতিত হতে পারে। ইসলামি বিশ্বে আধুনিক কালের গোড়ার দিকে ত্রয়োদশ শতকের মঙ্গোল আগ্রাসনের স্মৃতি তখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। গণহত্যা, আগুয়ান দস্যু দলের হাত থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষের পলায়ন, ব্যাপক দেশান্তর, একের পর এক মহান ইসলামি শহরের ধ্বংসলীলা তখনও সত্রাসে স্মরণ করা হচ্ছিল। লাইব্রেরি ও শিক্ষার বিভিন্ন কেন্দ্রও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল।
