শাব্বেতাইয়ের মৃত্যুর পর দুটো রেডিক্যাল শাব্বেতিয় আন্দোলন ইহুদিদের প্রধান ধর্মে গণ ধর্মান্তরের দিকে চালিত করেছিল। ১৬৮১ সালে অটোমান তুরস্কের আনুমানিক ২০০ পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। দোনমেহদের (‘ধর্মান্তরিত’) এই গোষ্ঠীটির নিজেদের সিনাগগ ছিল, তবে মসজিদেও প্রার্থনা করত তারা। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে তুঙ্গ সময়ে গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৫,০০০ জনে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি ভেঙে যেতে শুরু করে, সদস্যরা এই সময় আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষা লাভ করছিল ও ধর্মের প্রয়োজন আছে মনে করছিল না। কিছু সংখ্যক দোনমেহ তরুণ ১৯০৮ সালের সেক্যুলারিস্ট তরুণ তুর্কি বিদ্রোহে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনগুলোর দ্বিতীয়টি ছিল আরও ভয়ঙ্কর ও তা মিথের আক্ষরিক অনুবাদের ফলে গড়ে ওঠা নৈরাজ্যবাদের নজীর দেখিয়েছে। জ্যাকব ফ্রাংক (১৭২৬-৯১) বালকান সফরের সময় শাব্বেতিয়বাদে দীক্ষা লাভ করেন। নিজ দেশ পোল্যান্ডে ফেরার পর এক গোপন গোষ্ঠী গড়ে তোলেন তিনি যার সদস্যরা প্রকাশ্যে ইহুদি বিধান পালন করত, কিন্তু গোপনে নিষিদ্ধ যৌন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকত। ১৭৫৬ সালে তাঁকে সমাজচ্যুত করা হলে ফ্রাংক প্রথমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন (তুরস্কে এক সফরকালে) এবং সদলবলে আবার ক্যাথলিক মতবাদে দীক্ষা নেন।
ফ্রাংক স্রেফ তোরাহর নিষেধাজ্ঞা ঝেড়ে ফেলেননি, বরং ইতিবাচকভাবে অনৈতিকতাকে আলিঙ্গন করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে তোরাহ কেবল সেকেলেই নয়, বরং বিপজ্জনক ও অর্থহীন হয়ে গেছে। কমান্ডমেন্টসমূহ মৃত্যুর আইন, সুতরাং একে অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। পাপ ও লজ্জাহীনতাই মুক্তি লাভ ও ঈশ্বরকে পাওয়ার একমাত্র পথ। নির্মাণ করতে নয়, বরং ‘ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করতেই’৬৪ এসেছেন ফ্রাংক। তাঁর অনুসারীরা সকল ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল: ‘তোমাদের বলে দিচ্ছি, যোদ্ধাদের অবশ্যই ধর্মহীন হতে হবে, যার মানে তোমাদের অবশ্যই নিজের শক্তিতে মুক্তি লাভ করতে হবে। আজকের দিনের অনেক রেডিক্যাল সেক্যুলারিস্টের মতো ফ্রাংক সকল ধর্মকেই ক্ষতিকর হিসাবে দেখেছেন। তাঁর আন্দোলন গড়ে ওঠার সাথে সাথে ফ্রাংকবাদীরা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, এক বিরাট বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল তারা যার ভেতর দিয়ে অতীত ভেসে যাবে, জেগে উঠবে এক নতুন পৃথিবী। ফরাসী বিপ্লবকে তারা তাদের স্বপ্নের সত্যতার আলামত ও তাদের পক্ষে ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ ভেবেছে।৬৬
ইহুদিরা আধুনিক কালের বহু ভঙ্গিমারই আভাস দিয়েছে। ইউরোপের আগ্রাসীমূলক আধুনিকায়নের সমাজের সাথে বেদনাদায়ক সংঘাত তাদের সেক্যুলারিজম, সংশয়বাদ, নাস্তিক্যবাদ, যুক্তিবাদ, নৈরাজ্যবাদ, বহুত্ববাদ ও ধর্মের ব্যক্তিকরণের মতো নানা ধারণার দিকে চালিত করেছে। অধিকাংশ ইহুদির কাছে পশ্চিমে গড়ে উঠতে থাকা উন্নয়নের পথটি ধর্মের ভেতর দিয়েই অগ্রসর হয়েছে, কিন্তু এই ধর্ম বিংশ শতাব্দীতে আমরা যে ধর্মের সাথে অভ্যস্ত তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। অনেক বেশি পৌরাণিক ভিত্তিক ছিল তা; আক্ষরিকভাবে ঐশীগ্রন্থ পাঠ করত না এবং নতুন নতুন সমাধান নিয়ে এগিয়ে আসতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল, যেগুলোর কোনও কোনওটা নতুন কিছুর সন্ধানের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর মনে হয়েছে। প্রাক আধুনিক সমাজে ধর্মের ভূমিকা বোঝার জন্যে আমাদের মুসলিম জগতের দিকে নজর দিতে হবে, আধুনিকতার গোড়ার দিককার নিজস্ব উত্থান-পতনের পর্যায় অতিক্রম করছিল এই ধর্ম এবং ভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিকতা গড়ে তুলছিল যা আধুনিক কালেও মুসলিমদের প্রভাবিত করে চলবে।
০২. মুসলিম: রক্ষণশীল চেতনা (১৪৯২-১৭৯৯)
১৪৯২ সালে পশ্চিমে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হতে চলা নতুন ব্যবস্থার অন্যতম শিকার ছিল ইহুদিরা। ওই গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর অন্য শিকার ছিল স্পেনের মুসলিমরা, ইউরোপে ঘাঁটি হারিয়েছিল তারা। কিন্তু ইসলাম কোনও দিক থেকেই পরাস্ত শক্তি ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে তখনও তা বিশ্ব পরাশক্তি ছিল। যদিও সুঙ রাজবংশ (৯৬০-১২৬০) চীনকে সামাজিক জটিলতা ও শক্তির দিক থেকে ইসলামি জগতের চেয়ে অনেক উঁচু স্তরে নিয়ে গিয়েছিল ও ইতালিয় রেনেসাঁ এক সাংস্কৃতিক আলোকনের সূচনা ঘটিয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত পাশ্চাত্যকে সামনে এগিয়ে যেতে সক্ষম করে তুলবে, তবু মুসলিমরা প্রথম দিকে অনায়াসে এইসব চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে পেরেছে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে। মুসলিমরা গোটা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র এক তৃতীয়াংশ, কিন্তু তারা মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকায় এমন বিস্তৃত ও কৌশলগতভাবে ছড়িয়ে ছিল যে এই সময় ইসলামী জগৎকে আধুনিককালের গোড়ার দিকের সভ্য জগতের অধিকাংশ এলাকার ধ্যানধারণা তুলে ধরা বিশ্ব ইতিহাসের একটি মাইক্রোকোসম হিসাবে দেখা যেতে পারে। মুসলিমদের পক্ষে এটা ছিল এক উত্তেজনাকর ও উদ্ভাবনী কাল: ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তিনটি নতুন ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল: এশিয়া মাইনর, আনাতোলিয়া, ইরাক, সিরিয়া, ও উত্তর আফ্রিকায় অটোমান সাম্রাজ্য; ইরানে সাফাভিয় সাম্রাজ্য; ও ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্য। প্রতিটি সাম্রাজ্য ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ভিন্ন ভিন্ন চেহারা তুলে ধরেছিল। মুঘল সাম্রাজ্য ফালসাফাহ নামে পরিচিত সহিষ্ণু বিশ্বজনীন দার্শনিক যুক্তিবাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে; সাফাভিয় শাহগণ এপর্যন্ত অভিজাত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাস শিয়া ধর্মমতকে রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত করেছিলেন; এবং সুন্নী ইসলামের প্রতি ভীষণভাবে অনুগত রয়ে যাওয়া অটোমান তুর্কিরা পবিত্র মুসলিম বিধান শরীয়াহর ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
