সত্যিই তাই প্রমাণিত হয়েছিল। ১৬৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাথানের আশীর্বাদ নিয়ে সুলতানের মুখোমুখি হতে রওয়ান হন শাব্বেতাই। বোধগম্যভাবেই বুনো ইহুদি উৎসাহের ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন সুলতান, যৌক্তিকভাবেই বিদ্রোহের আশঙ্কা করছিলেন তিনি। গ্যালিপোলির কাছে শাব্বেতাই অবতরণ করার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে ইস্তাম্বুলে নিয়ে যাওয়া হয়, হাজির করা হয় সুলতানের সামনে। মৃত্যুদণ্ড বা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ভেতর যেকোনও একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাঁকে। সারা পৃথিবীর ইহুদিদের সন্ত্রস্ত করে ইসলাম বেছে নেন শাব্বেতাই। ধর্মদ্রোহীতে পরিণত হন মেসায়াহ।
এখানেই ব্যাপারটার সমাপ্তি ঘটা উচিত ছিল। বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শাব্বেতাইয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, প্রবল গ্লানি নিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবন ও তোরাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণে ফিরে যায় তারা; পুরো দুঃখজনক ব্যাপারটাকে ভুলে যাওয়া প্রয়াস পায়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু একটা দল মুক্তির স্বপ্ন বিসর্জন দিতে পারেনি। ওরা বিশ্বাস করতে পারেনি যে, ওই উত্তেজনাকর মাসগুলোয় ওদের মুক্তির অভিজ্ঞতা স্রেফ কুহক ছিল, এক ধর্মদ্রোহী মেসায়াহর সাথে মানিয়ে নিতে পেরেছিল তারা, ঠিক আদি ক্রিশ্চানরা যেভাবে সাধারণ অপরাধীর মতো মৃত্যুবরণকারী একজন মেসায়াহর একই রকম কেলেঙ্কারীজনক ধারণাকে মেনে নিয়েছিল।
প্রবল বিষণ্নতার একটা সময় পার করে নিজস্ব ধর্মতত্ত্বে পরিবর্তন আনেন নাথান। মুক্তির সূচনা ঘটেছে, ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, কিন্তু একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে। অপবিত্রতার আরও গভীর বলয়ে অবতরণে বাধ্য হয়েছেন শাব্বেতাই, স্বয়ং তিনি অশুভের রূপ ধারণ করেছেন। এটাই ছিল ‘চূড়ান্ত পবিত্র পাপ,’ তিক্কুনের শেষ কাজ।৫ শাব্বেতাইয়ের প্রতি বিশ্বস্ত রয়ে যাওয়া শাব্বেতিয়রা ভিন্ন ভিন্নভাবে এই পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দেয়। আমস্টারডামে খুবই জনপ্রিয় ছিল নাথানের ধর্মতত্ত্বঃ এবার মেসায়াহ ইহুদিবাদের মূলকে আঁকড়ে থেকে মারানোতে পরিণত হয়েছেন, বাইরে বাইরে ইসলামের অনুসারী হওয়ার ভান করছেন।৫৬ অনেক আগে থেকেই তোরাহ নিয়ে সমস্যায় আক্রান্ত মারানোরা মুক্তি সম্পূর্ণ হওয়ামাত্র এর অবসান কামনা করেছে। অন্য ইহুদিরা বিশ্বাস করেছে যে, মোসায়াহ সম্পূর্ণ মুক্তি না আনা পর্যন্ত তাদের তোরাহ অনুসরণ করতে হবে; তবে এরপর এক নতুন আইনের প্রবর্তন করবেন তিনি, যা সবদিক থেকেই পুরোনো আইনের বিরোধিতা করবে। রেডিক্যাল শাব্বেতিয়দের একটা ছোট গোষ্ঠী আরও সামনে অগ্রসর হয়েছিল। সাময়িক ভিত্তিতেও আর পুরোনো আইনে প্রত্যাবর্তন করতে পারছিল না তারা, তাদের বিশ্বাস ছিল ইহুদিদেরও মেসায়াহকে অনুসরণ করে অশুভের বলয়ে গিয়ে ধর্মদ্রোহীতে পরিণত হতে হবে। মুলধারার ধর্ম বিশ্বাস বেছে নেয় তারা—ইউরোপে ক্রিশ্চান ধর্ম এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম-কিন্তু আপন ঘরের সীমানায় ইহুদিই রয়ে গেছে।৫৭ এই রেডিক্যাল ইহুদিরা একটা আধুনিক সমাধানও দেখতে পেয়েছিল: অনেক ক্ষেত্রেই বহু ইহুদি জেন্টাইল সংস্কৃতির সাথে মিশে যাবে, কিন্তু ভিন্ন স্তরে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজেদের বিশ্বাস ব্যক্তিকরণ করেছে।
শাব্বেতিয়রা ভেবেছিল শাব্বেতাই বুঝি মহাকষ্টে তাঁর দ্বৈত জীবন যাপন করছেন, কিন্তু আসলে মুসলিম পরিচয়ে দারুণ সন্তুষ্ট ছিলেন তিনি। ইসলামের পবিত্র আইন শরীয়াহ পাঠ করে দিন কাটাচ্ছিলেন আর সুলতানের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টাদের ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। অতিথিদের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে, দরবার বসাতেন তিনি, সারা দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ইহুদি প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। শাব্বেতাইয়ের অনন্য ধার্মিকতার কথা বলত তারা। অনেক সময় শাব্বেতাইকে নিজের বাড়িতে তোরাহ স্ক্রোল হাতে হাইম গাইতে দেখা যেত; লোকে তাঁর ভক্তি ও অন্য লোকের অনুভূতিতে তাঁর সহানুভূতির সাথে প্রবেশের ক্ষমতায় বিস্ময়ে অভিভূত হত।৫৮ শাব্বেতাই গোষ্ঠীর ধারণা আর নাথান গোষ্ঠীর ধারণা একেবারেই ভিন্ন ছিল এবং জেন্টাইলদের প্রতি ঢের বেশি ইতিবাচক। শাব্বেতাই যেন সকল ধর্মবিশ্বাসকেই বৈধ বিবেচনা করেছিলেন। নিজেকে ইসলাম ও ইহুদিবাদের ভেতর সেতুবন্ধ হিসাবে কল্পনা করেছেন তিনি; আবার খৃস্টধর্ম ও জেসাসকে নিয়েও অভিভূত ছিলেন। অতিথিরা জানিয়েছেন যে, অনেক সময় তিনি মুসলিমের মতো আচরণ করতেন, অবার অনেক সময় র্যাবাইয়ের মতো। অটোমানরা ইহুদি উৎসব পালনের অনুমতি দিয়েছিল তাঁকে। শাব্বেতইকে প্রায়ই এক হাতে কোরান ও অন্য হাতে তোরাহ স্ক্রোল নিতে দেখা যেত।৫৯ সিনাগগে শাব্বেতাই ইহুদিদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করতেন; কেবল তাহলেই, বলতেন তিনি, পবিত্র ভূমিতে ফিরে যেতে পারবে তারা। ১৬৬৯ সালে লেখা এক চিঠিতে বাধ্য হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারটি জোরের সাথে অস্বীকার করেন শ্যাব্বতাই, তিনি মন্তব্য করেন, ইসলাম ধর্ম ‘প্রকৃতই সত্যি,’ তাঁকে জেন্টাইল ও ইহুদি উভয় পক্ষের জন্যে মেসায়াহ হিসাবে পাঠানো হয়েছে।
১৬৭৬ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর শাব্বেতেইয়ের মৃত্যু ছিল শাব্বেতিয়দের জন্যে এক প্রবল আঘাত, কারণ এতে মুক্তির সমস্ত আশাই তিরোহিত হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। তাসত্ত্বেও গোষ্ঠীটি গোপনে অস্তিত্ব বজায় রাখে; তারা দেখিয়ে দেয় যে মেসিয়ানিক বিস্ফোরণ কোনও হুজুগে ঘটনা ছিল না; বরং ইহুদি অভিজ্ঞতার কোনও মৌলিক জায়গা স্পর্শ করেছে। অনেকের কাছে এই ধর্মীয় আন্দোলন একটা সেতুবন্ধ ছিল যা তাদের পরে যৌক্তিক আধুনিকতায় উত্তরণের কঠিন পর্ব পার হতে সাহায্য করবে। অনেকেই যেমন দ্রুততার সাথে তোরাহকে বিসর্জন দিতে প্ৰস্তুত ছিল, এবং এক নতুন বিধানের স্বপ্ন দেখার বেলায় শাব্বেতিয়দের অটলতা দেখায় যে পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্যে তৈরি ছিল তারা।৬১ শাব্বেতাই ও শাব্বেতিয় মতবাদের উপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থের লেখক গারশোম শোলেম যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এই ক্ষুদ্র শাব্বেতিয় গোষ্ঠীই ইহুদি আলোকন বা সংস্কার আন্দোলনের অগ্রপথিকে পরিণত হবে। প্রাগের জোসেফ হোয়াইটের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তিনি। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তিনিই প্রথম পূর্ব ইউরোপে আলোকনের ধারণার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। শাব্বেতিয় ছিলেন তিনি। হাঙেরিতে সংস্কার আন্দোলন সূচিতকারী আরন শোভিনও তরুণ বয়সে শাব্বেতিয় ছিলেন।৬২ শোলেমের তত্ত্বের বিরোধিতা করা হয়েছে; একে প্রত্যক্ষভাবে সত্যি বা মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তবে সাধারণভাবে এটা মেনে নেওয়া হয় যে, শাব্বেতিয়বাদ প্রচলিত রাব্বিনিক কর্তৃত্বকে খাট করার বেলায় ভালো ভুমিকা রেখেছে এবং ইহুদিদের টাবু ও অসম্ভব মনে করা পরিবর্তনের কথা ভাবতে শিখিয়েছে।
