কেমন করে নাথানের মতো একজন মেধাবী মানুষ এই বিষণ্ন, বিপর্যস্ত মানুষটিকে নিজের ত্রাতা ভাবতে পেরেছিলেন? লুরিয় কাব্বালাহ মোতাবেক একেবারে সূচনাতেই মেসায়াহ যিমযুমের আদি প্রক্রিয়ার সময় সৃষ্ট ঈশ্বরহীন বলয়ে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন। সুতরাং ‘অন্য পক্ষের’ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য হয়েছিলেন মেসায়াহ। কিন্তু এখন, কাব্বালিস্টদের প্রায়শ্চিত্তমূলক অনুশীলনের কল্যাণে নাথান বিশ্বাস করেছিলেন, এই দানবীয় শক্তিগুলো মেসায়াহর উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছে। সময়ে সময়ে তাঁর আত্মা নিজেকে মুক্ত করে শূন্যে ভেসে যায় এবং মেসিয়ানিক যুগের নতুন বিধান অবতীর্ণ করে। কিন্তু এখনও বিজয় সম্পূর্ণ হয়নি। সময়ে সময়ে মেসায়াহ আবারও অন্ধকারের শিকারে পরিণত হন। এসবই শাব্বেতাইয়ের ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতার সাথে যেন নিখুঁতভাবে মিলে গিয়েছিল বলে মনে হয়েছে। তিনি পৌঁছানোর পর নাথান তাঁকে বললেন, সমাপ্তি আসন্ন। অচিরেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর বিজয় পূর্ণাঙ্গ রূপ নেবে, ইহুদি জনগণের পক্ষে মুক্তি নিয়ে আসবেন তিনি। পুরোনো আইন রদ হয়ে যাবে, এক সময়ের নিষিদ্ধ কাজ ও পাপ পবিত্র হয়ে যাবে।
প্রথমে নাথানের এই কল্পনা-বিলাসের সাথে তাল মেলাতে রাজি হননি শাব্বেতাই, কিন্তু ক্রমে তরুণ র্যাবাইয়ের বাগ্মীতার কাছে পরাস্ত হন তিনি, এসব অন্তত তাঁর বিচিত্র আচরণের একটা ব্যাখ্যা যুগিয়েছিল তাঁকে। ২৮শে মে, ১৬৬৫ নিজেকে মেসায়াহ ঘোষণা করেন শাব্বেতাই। আর নাথানও সাথে সাথে অচিরেই ত্রাণকর্তা অটোমান সুলতানকে পরাস্ত করবেন, ইহুদিদের নির্বাসনের অবসান ঘটাবেন ও তাদের আবার পবিত্র ভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন, সকল জেন্টাইল জাতি তাঁর কাছে নতি স্বীকার করবে ঘোষণা দিয়ে মিশর, আলেপ্পো ও স্মিরনায় চিঠি পাঠান।৫১ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই খবর। ১৬৬৬ সাল নাগাদ ইউরোপের প্রায় সমস্ত বসতি, অটোমান সাম্রাজ্য ও ইরানে শেকড় গেড়ে বসে মেসিয়ানিক উন্মাদনা। উন্মত্ত সব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল: ইহুদিরা সহায়সম্পদ বিক্রি করে প্যালেস্তাইনে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। সময়ে সময়ে মেসায়াহ কোনও উপবাস দিনের প্রথা বাতিল করেছেন বলে শুনতে পেত তারা, তখন মিছিল করে নেমে আসত রাস্তায়, নাচত। নাথান এই বলে নির্দেশ জারি করেছিলেন যে, ইহুদিদের সাফেদের প্রায়শ্চিত্তমূলক আচার পালন করে সমাপ্তিকে ত্বরান্বিত করতে হবে। ইউরোপ, মিশর, ইরান, বালকান, ইতালি, আমস্টারডাম, পোল্যান্ড ও ফ্রান্সে ইহুদিরা উপবাস পালন করে, রাত্রি জাগরণ করে, বরফ শীতল পানিতে ডুবে থাকে, বিছুটি পাতায় গড়াগড়ি খায় এবং গরীবদের ভিক্ষা দিতে থাকে। এটা ছিল আধুনিকতার গোড়ার দিকে সূচিত অনেকগুলো মহাজাগরণের (গ্রেট অ্যাওয়াকেনিং) অন্যতম। এই সময় লোকে সহজাত প্রবৃত্তির বশেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসার কথা জানতে পারে। খোদ শাব্বেতাই সম্পর্কে খুব অল্প লোকই বিস্তারিত জানত। আর নাথানের দুর্বোধ্য কাব্বালিস্টিক দিব্যদর্শন সম্পর্কে ওয়াকিবহালের সংখ্যা ছিল আরও কম; মেসায়াহ এসেছেন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আশা পূরণ হতে চলেছে, এটা জানাই যথেষ্ট ছিল। এইসব আনন্দমুখর মাসে ইহুদিরা এতটাই আশা ও প্রাণশক্তিতে জেগে উঠেছিল যে ঘেটোর কর্কশ, সীমিত জীবন মিলিয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুর স্বাদ লাভ করেছিল তারা, অনেকের জীবনই আর কখনও আগের মতো হবে না। নতুন সম্ভাবনার আভাস পেয়েছিল ওরা, একেবারে নাগালের ভেতর মনে হয়েছে সেটা। নিজেদের মুক্ত ভেবে অনেক ইহুদিই ধরে নিয়েছিল পুরোনো জীবন চিরকালের জন্যে বিদায় নিয়েছে।৫৩
শাব্বেতাই বা নাথানের প্রত্যক্ষ প্রভাবের অধীনে আগত ইহুদিরা পরিচিত জীবনধারার পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাখ্যান বোঝানো সত্ত্বেও তোরাহকে বাতিল করতে প্রস্তুত আছে বলে দেখিয়েছে। মেসায়াহর রাজকীয় জোব্বা গায়ে সিনাগগে গিয়ে শ্যাব্বেতাই যখন কোনও উপবাস প্রথা বাতিল করেছেন, ঈশ্বরের নিষিদ্ধ নাম উচ্চারণ করেছেন, অকোশার খাবার খেয়ছেন বা সিনাগগে ঐশীগ্রন্থ পাঠ করার জন্যে মহিলাকে আহ্বান জানিয়েছেন, লোকে পরমানন্দে মেতে উঠেছে। তবে সবাই গ্রস্ত হয়নি অবশ্যই-প্রত্যেক মহল্লাতেই র্যাবাই ও সাধারণ মানুষ ছিলেন যাঁরা এইসব পরিবর্তনে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ধনী-গরীব সকল শ্রেণীর মানুষ শাব্বেতাইকে গ্রহণ করে নিয়েছিল ও তাঁর নৈতিকতা বিরোধিতাকে স্বাগত জানিয়েছে। আইন ইহুদিদের রক্ষা করতে পারেনি, এখনও তাতে অক্ষম বলেই মনে হচ্ছে। ইহুদিরা এখনও নির্যাতিত। এখনও নির্বাসিত; জাতি নতুন মুক্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে ছিল।৫৪
অবশ্য, খুবই বিপজ্জনক ছিল ব্যাপারটা। লুরিয় কাব্বালাহ ছিল মিথ, বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এইভাবে এর রূপায়নের কথা ছিল না, বরং আত্মার অন্তস্থঃ জীবন আলোকিত করে তোলার কথা ছিল। মিথোস ও লোগোস সম্পূরক কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের উপাদান, এদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ছিল। রাজনীতি ছিল যুক্তি ও যৌক্তিকতার এখতিয়ার। মিথ একে অর্থ যুগিয়েছে। কিন্তু নাথান যেভাবে ইসাক লুরিয়ার অতীন্দ্রিয়বাদী দিব্যদৃষ্টিকে তরজমা করেছেন, সেভাবে আক্ষরিকভাবে অনূদিত হবে বলে মনে করা হয়নি। ইহুদিরা নিজেদের শক্তিশালী, মুক্ত ও নিয়তির নিয়ন্তা ভেবে থাকতে পারে, কিন্তু তাদের পরিপার্শ্ব বদলায়নি। তখনও দুর্বল, নাজুক ও শাসকদের সুনামের উপর নির্ভরশীল ছিল তারা। অন্ধকারের শক্তির সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত মেসায়াহর লুরিয়ানিক ইমেজ ছিল অশুভের বিরুদ্ধে সর্বজনীন সংগ্রামের শক্তিশালী প্রতীক, কিন্তু যখন এই ইমেজকে বাস্তব, আবেগের দিক থেকে অপ্রকৃতিস্থ কোনও ব্যক্তিতে কঠিন চেহারা দেওয়ার প্রয়াস পাওয়া হয়, তার ফল কেবল বিপর্যয়করই হতে পারে।
