আমরা আগাগোড়া দেখেছি যে ধর্ম প্রায়শঃই মানুষকে আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছে। শাব্বেতিয়বাদ, মেথডিজম ও ইসলামি অতীন্দ্রিয়বাদ ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের ব্যাপক পরিবর্তনের জন্যে প্রস্তুত করেছে ও তাদের নতুন ধারণার প্রতি অগ্রসর হতে সক্ষম করে তুলতে একটা পরিপ্রেক্ষিত দিয়েছে। যেসব আমেরিকানের প্রজাতন্ত্রের ফাউন্ডিং ফাদারদের ডেইজমের প্রতি কোনও ফুরসত ছিল না, তারা মহাজাগরণের মহান সংগ্রামে তৈরি হয়েছিল। মুসলিমরাও তাদের নিজস্ব আধ্যাত্মিকতার গতিময়তা দিয়ে ধর্ম ও রাজনীতির বিচ্ছিন্নতার মতো আদর্শের উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষেই, ইউরোপেও সেক্যুলারিজম ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে ধার্মিক হওয়ার নতুন উপায় হিসাবেই প্ৰথমে দেখা হয়েছিল। আমাদের বিবেচিত অতি সাম্প্রতিক বেশ কিছু আন্দোলনও আধুনিকায়নসুলভ ছিল। হাসান আল-বান্না, শরিয়তি, এবং এমনকি খোমেনিসহ প্রত্যেকে মুসলিমদের পশ্চিম থেকে আমদনি করা বিভিন্ন আদর্শ থেকে তাদের অনেক বেশি পরিচিত ইসলামিক প্রেক্ষিতে আধুনিক করে তুলতে চেয়েছিলেন। কেবল এভাবেই তারা ‘নিজেদের কাছে ফিরে যেতে পারত’ এবং যারা বাধ্য হয়ে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে গিয়েছিল তাদের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও গণতান্ত্রিক শাসনের মতো প্রতিষ্ঠানসমূহকে উপলব্ধিতে সাহায্য করতে পারত। এটা পবিত্র প্রেক্ষিতে আধুনিকতাকে নতুন করে স্থাপন করারও প্রয়াস ছিল। প্রাক আধুনিক ধর্ম সব সময়ই মিথোস ও লোগোসকে সম্পূরক হিসাবে দেখেছে। ইসলামি সংস্কারকগণ সরকারের বাস্তবভিত্তিক কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় ও অতীন্দ্রিয়বাদী কাঠামোর ভেতর প্রত্যক্ষ করবেন।
এটা সেক্যুলারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের বিদ্রোহেরও অংশ বটে। এটা ঈশ্বরকে ফের রাজনৈতিক বলয়ে ফিরিয়ে আনার একটা উপায় যেখানে থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্নভাবে মৌলবাদীরা আধুনিকতার বিচ্ছিন্নতা প্রত্যাখ্যান করেছে (চার্চ ও রাষ্ট্রের, সেক্যুলার ও জাগতিক) এবং নতুন করে হারানো সামগ্রিকতা সৃষ্টি করতে চেয়েছে। ধার্মিক যায়নবাদীরা ধর্ম থেকে স্বাধীনতা ঘোষণাকারী সেক্যুলারিস্ট যায়নবাদীদের ‘বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’ করেছিল। তারা ডায়াসপোরায় যতটা সম্ভব ছিল পবিত্র ভূমিতে তারচেয়ে আরও বেশি করে ঈশ্বর ও তোরাহ পেতে চেয়েছে। খোমেনি ও শরিয়তি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, রাজনীতি থেকে পবিত্রকে বাদ দেওয়া অসম্ভব; কুতব মিশরে জাহিলি হিসাবে আখ্যায়িত সেক্যুলারিস্ট শাসকগোষ্ঠীর খোদাহীনতার নিন্দা করেছেন। এখনও যারা আধুনিকতার সেক্যুলার যুক্তিবাদকে আলিঙ্গন করে উঠতে পারেনি তারা অস্তিত্বের অদৃশ্য মাত্রা সম্পর্কে সজাগ, এবং রাজনীতিতে তার প্রতিফলন দেখতে ইচ্ছুক। সেজন্যে তারা কম আধুনিক হবে কেন সেটা তারা বুঝতে পারে না, যদিও তারা আভাসে স্বীকার করে যে, এর মানে হবে প্রাক আধুনিক ধর্মের কিছু সংখ্যক রক্ষণশীল বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কচ্যুতি। ধর্মের মৌলবাদী সংস্কারের মানে দাঁড়ায় এমন এক অ্যাক্টিভিজম যাকে এতদিন অবধি অধর্মসুলভ মনে করা হলেও এখন তা গুরুত্বপূর্ণ। ধার্মিক যায়নবাদী এবং মৌলবাদী ক্রিশ্চান ও মুসলিমরা সবাই গতিশীলতা ও বিপ্লবী পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলেছে যাতে আধুনিক সমাজের অগ্রযাত্রা ও বাস্তবভিত্তিক গতির সাথে তাল মেলানো যায়।
স্রষ্টার পক্ষে এই লড়াই বৈজ্ঞনিক যুক্তিবাদের কেন্দ্রে অবস্থান করা শূন্যতাকে ভরে তোলার একটি প্রয়াস। মৌলবাদীদের পরিহাস না করে সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠান অনেক সময় তাদের প্রতি-সংস্কৃতির প্রতি তীক্ষ্ণ ও নিবিড় দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। শুকরি মুস্তাফার কমিউনসমূহ সাদাতের খোলা দুয়ার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল; মুসলিম ব্রাদারদের প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সাম্রাজ্যসমূহ এবং জামাত আল-ইসলামিয়াহর সদস্যদের গৃহীত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বর্তমান সরকারের ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতিহীনতাকে তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছে। এই আন্দোলনগুলোর জনপ্রিয়তা ও শক্তি দেখায় যে, সেক্যুলারিস্ট প্রবণতা সত্ত্বেও মিশরের জনগণ এখনও ধার্মিক হতে চায়। ইরানের খোমেনির কাল্টও তাই: সরকারের সাথে বিরোধ জোরাল হয়ে ওঠার সাথে সাথে খোমেনি ক্রমেই আরও অধিকহারে ইমামদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করছিলেন, শাহর স্বৈরাচারী ব্যক্তিত্বের বিপরীতে নিজেকে বহু ইরানির কাছে স্পষ্টতই আকর্ষণীয় শিয়া বিকল্প হিসাবে তুলে ধরছিলেন। একইভাবে ইহুদি ইয়েশিভোত সেক্যুলারিস্ট শিক্ষার বাস্তববাদী প্রকৃতির বিপরীত রূপ ধারণ করেছে; ঈশ্বর ও তাঁর আইনকে বাতিল করে দিয়েছে বলে মনে হওয়া এক সমাজে ইয়েশিভা ছাত্ররা ঐশী সত্তার সাথে সাক্ষাৎ লাভের লক্ষ্যে পড়াশোনা করেছে, কেবল প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্যে নয়, এবং তোরাহ পাঠকে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে তাদের জীবনের মৌল বিষয়ে পরিণত করেছে। এইসব বিকল্প সমাজ গড়ে তোলার সময় মৌলবাদীরা তাদের এমন সংস্কৃতির প্রতি মোহমুক্তি দেখিয়েছে যা আর সহজে আধ্যাত্মিকতাকে স্থান দিতে পারছিল না।
